মাদরাসার স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ মেনে নেব না: মুফতি তাকি উসমানী
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:২২ সকাল
নিউজ ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

পাকিস্তানের মাদরাসাগুলোর স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বকীয়তা রক্ষায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির শীর্ষ আলেম ও ওয়াফাকুল মাদারিস আল-আরাবিয়া পাকিস্তানের সভাপতি মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী। তিনি বলেছেন, মাদরাসা স্বাধীন ছিল, স্বাধীন আছে এবং ইনশাআল্লাহ স্বাধীন থাকবে। সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিগুলো বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) করাচির জামিয়া দারুল উলুম করাচিতে বেফাকুল মাদারিস আল-আরাবিয়া পাকিস্তানের উদ্যোগে সিন্ধু প্রদেশের মাদরাসা প্রধানদের সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে প্রদেশটির পাঁচ হাজারের বেশি মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান অংশ নেন।

সম্মেলনে মূল বক্তব্যে মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী বলেন, মাদরাসার দায়িত্বশীল, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে, তাঁদের সম্পর্ক এমন সব মনীষীর সঙ্গে, যাঁরা উপমহাদেশে দ্বীনের পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ব্রিটিশ শাসনামলে নিজেদের জীবন, প্রতিষ্ঠান ও পূর্বসূরিদের ত্যাগের বিনিময়ে তাঁরা দ্বীনের আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সময় ধৈর্যের। শক্তি ও সামর্থ্য না থাকলে মুমিনের পথ হলো ধৈর্য ধারণ করা। মাদরাসার জন্য বড় ভবন কিংবা বিপুল সম্পদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক সম্পর্ক, ইখলাস ও আল্লাহর সঙ্গে গভীর সংযোগ। উদ্দেশ্য যদি দ্বীনের খেদমত হয়, তাহলে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসে।

আধুনিক শিক্ষা ও ইংরেজি শিক্ষার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মাদরাসায় আধুনিক বিষয় কিংবা ইংরেজি পড়ানোর ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য হলো নিয়ত ও শিক্ষার পরিবেশ। দ্বীনি মানসিকতা ও আকাবিরদের পদ্ধতি অনুসরণ করে এসব বিষয় পড়ানো হলে তাতেও দ্বীনি শিক্ষার মতো বরকত ও সওয়াব পাওয়া যাবে।

মাদরাসা প্রধানদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, নিজেদের আকাবিরদের জীবনাচার, রচনাবলি, জীবনী ও অবদান নিয়মিত অধ্যয়ন করতে হবে। তাঁদের আদর্শের আলোকে নিজেদের জীবন ও দৈনন্দিন কার্যক্রম সাজাতে হবে, যাতে পূর্বসূরিদের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক অটুট থাকে।

সম্মেলনে বেফাকুল মাদারিসের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ হানিফ জালন্ধরি তাঁর বক্তব্যে সংগঠনটির ঐতিহাসিক ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বছরের পর বছর বিভিন্নভাবে চিন্তাগত পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাদরাসার স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বকীয়তার প্রশ্নে কোনো চাপ মেনে নেওয়া হয়নি।

মাদরাসার মানোন্নয়নে দায়িত্বশীলদের করণীয় তুলে ধরে তিনি ১১টি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এর মধ্যে রয়েছে যোগ্য, সৎ ও দ্বীনি শিক্ষাকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন—এমন শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও দ্বীনি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের আকিদা-আদর্শ মজবুত করা এবং কোরআন শিক্ষায় তাজবিদের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।

তিনি বলেন, মাদরাসা কেবল পড়াশোনার প্রতিষ্ঠান নয়; বরং দ্বীন শেখা, শেখানো ও সে অনুযায়ী জীবন গঠনের প্রশিক্ষণকেন্দ্র। তাই শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও আত্মিক উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।

আধুনিক শিক্ষার পাঠ্যক্রম নিয়েও ওয়াফাকুল মাদারিস কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, সময়ের প্রয়োজন বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পাশাপাশি মাদরাসার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, আইনি কার্যক্রম ও আর্থিক শৃঙ্খলা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের আইনি জটিলতায় পড়তে না হয়।

জনসংখ্যার অনুপাতে দ্বীনি শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনি শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য সংক্ষিপ্ত দ্বীনি ডিপ্লোমা কোর্স চালুর উদ্যোগও জোরদার করতে বলেন।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও দেশের নিরাপত্তা রক্ষার চেতনা জাগ্রত করার ওপরও গুরুত্ব দেন মাওলানা হানিফ জালন্ধরি। তিনি বলেন, আকাবিরদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই দেশের সুরক্ষায় তাঁদের মতোই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। মাদরাসাগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ, ঐক্য ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনাও জরুরি।

সম্মেলনে অন্যান্য বক্তারা বলেন, বেফাকুল মাদারিস দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছে। সরকার দ্বীন ও দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আন্তরিক হলে এসব দাবি মেনে নেওয়া উচিত। সংগঠনটির আওতাধীন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি এবং এর সঙ্গে আড়াই লাখের বেশি আলেম যুক্ত রয়েছেন। তাঁরা সব সময় সংবিধান ও আইনের আলোকে নিজেদের দাবি তুলে ধরেছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সরকার সমস্যার সমাধানে আন্তরিক উদ্যোগ না নিয়ে বিভিন্নভাবে মাদরাসাগুলোকে হয়রানি করছে।

বক্তারা বলেন, বেফাকুল মাদারিস সব সময় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নে কাজ করেছে। এটি আকাবিরদের আমানত। তাঁরা সব সময় এ আমানতের যথাযথ হেফাজত করবেন। এ সময় সম্মেলনে উপস্থিত হাজারো মাদরাসা প্রধান দাঁড়িয়ে সংগঠনটির নেতৃত্বের প্রতি তাঁদের আস্থা ও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

সম্মেলনে বেফাকুল মাদারিসের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মাওলানা সৈয়দ সুলাইমান বনুরি, সিন্ধু প্রদেশের নাজিম মাওলানা ইমদাদুল্লাহ ইউসুফজাই, সহকারী প্রাদেশিক নাজিম মাওলানা কারি আবদুর রশিদ, মাওলানা নাসের মাহমুদ সোমরু, কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য মাওলানা আবদুস সাত্তার, মাওলানা হাকিম মুহাম্মদ মুজাহির, মাওলানা আবদুর রাজ্জাক জাহিদ, মাওলানা যুবায়ের আশরাফ উসমানি ও মাওলানা ওরঙ্গজেব ফারুকিসহ কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নেতারা বক্তব্য দেন।

সূত্র: পাকিস্তান বেফাকের ফেসবুক পেইজ

আইও/