বরুণার আত্মশুদ্ধির পয়গাম
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:৩৩ রাত
নিউজ ডেস্ক

|| মাসউদুল কাদির ||

রাজধানীকে নাড়া দিয়ে গেল বরুণার আত্মশুদ্ধির পয়গাম। রাজনৈতিক কোনো বার্তা নয় বরং নিজেকে সাজানোর জন্য, আমলে উন্নতি করবার জন্য, ব্যক্তিগঠনের প্রকৃত চর্চার মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী (বরুণার পীর) মানুষের কাছে নতুন বার্তা দিয়ে গেছেন। অন্য রকম দেশ গঠনের বার্তা। মানুষ ভালো হয়ে গেলে, মানুষের চরিত্র ভালো হলে এ মানুষকে কেউ আর ফেরাতে পারবে না। তারা যেখানেই চাকুরি করবেন, যেখানেই দায়িত্ব পালন করবেন-মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন। মুজাদ্দেদে আলফেসানি রহ.ও এ মিশন নিয়েই কাজ করেছেন। রাষ্ট্রের মাথা পরিবর্তন করতে চাননি।  বরং রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিদের দ্বীনের পথে আনার চেষ্টা করেছেন। 

মুফতি রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী কে? ঢাকার কিংবা দেশের অসংখ্য মানুষের এমন প্রশ্ন শুনেছি। তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের সন্তান। শাইখুল আরব ওয়াল আজম সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর শিষ্য আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী (১৯১৬-১৯৭৭) এর সন্তান। লুৎফুর রহমান রহ. ছিলেন একজন বাংলাদেশি দেওবন্দি ইসলামি পণ্ডিত, লেখক, সম্পাদক ও দার্শনিক আলেমেদ্বীন। তিনি অরাজনৈতিক ইসলামি সংঘটন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও জামিয়া লুৎফিয়া আনওয়ারুল উলুম হামিদনগর বরুণা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। সিলেটের মৌলভীবাজারের ইতিহাস কোনো দিনই পরিপূর্ণ হবে না তাকে বাদ দিলে। 

সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সুনামগঞ্জের মানুষের ভিড় বেশি বরুণায়। অনেকে বলছেন, হঠাৎ করেই রাজধানীতে ইসলাহের ডাক কেন দিলেন আল্লামা ফারুক সাহেব। এটা কোনো কথাই নয়। যেকোনো সংশোধনমূলক আহ্বান রাজধানী থেকেই দেওয়া উচিত। রাজধানীতে আগে বলতে পারলে মানুষের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়। এটা চিরন্তন সত্য। আজকাল আকাল পড়েছে ভালো মানুষের। মানুষ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়া কিংবা আলেম-মুফতি হয় মানুষ হয় খুব কমই। তাই ইসলাহ সবার জন্য জরুরি। সে বার্তাই দিতে এসেছিলেন শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী। তিনি বলেছেন, আত্মশুদ্ধির মেহনত ছাড়া সমাজ সংস্কার সম্ভব নয়। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের অনাচার, দুর্নীতি, হত্যা ও অরাজকতা দূর করতে হলে মানুষের ভেতর থেকে পরিবর্তন আনতে হবে। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরিপূর্ণ গোলামি সম্ভব। সাহাবায়ে কেরাম ইসলাম গ্রহণের আগে নানা গোনাহে লিপ্ত থাকলেও আত্মশুদ্ধির মেহনতে তারাই পরিণত হয়েছিলেন সোনার মানুষে। তাই সমাজের সার্বিক পরিবর্তনে আত্মশুদ্ধির বিকল্প নেই।   

(৩০ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার ) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অরাজনৈতিক ইসলাহি সংগঠন আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ৮২ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আজিমুশান ইসলাহি ইজতেমায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি মানুষ যেনো নিজের আত্মশুদ্ধি নিয়ে কাজ করে সে আহ্বানই জানিয়েছেন। 

তিনি বলেন, মানুষের প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার প্রাচুর্য কিংবা বাহ্যিক উন্নতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঈমানের দৃঢ়তা, আমলের বিশুদ্ধতা, চরিত্রের সৌন্দর্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যেই প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। দুনিয়ার ব্যস্ততা ও প্রবৃত্তির টানে মানুষ অনেক সময় নিজের সংশোধনের কথা ভুলে যায়। ইবাদতে শৈথিল্য, আমল-আখলাকের দুর্বলতা এবং পারস্পরিক অধিকার আদায়ে অবহেলা দীনি জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, উপকারী নসিহত গ্রহণ, দীনি পরিবেশের সাহচর্য ও আত্মশুদ্ধির নিয়মিত মেহনত।

আল্লামা রশীদুর রহমান বলেন, ১৯৪৪ সালে শায়খুল ইসলাম আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী (রহ.) আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে দীনি ও ইসলাহি মেহনতের সূচনা করেছিলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষকে কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা, সুন্নতের অনুশীলন, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রতি আহ্বান জানানো। তাঁর রেখে যাওয়া এ ইসলাহি ধারার পরিচর্যা ও অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। এ মেহনত কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক নয়; বরং ব্যক্তি ও সমাজের সংশোধনে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার নাম।

অনুষ্ঠানে প্রত্যেক মুমিনকে প্রতিদিনের আমলের বিবরণ পেশ করা হয়েছে। আমরা মুসলমান, নামে হলে চলবে না। কাজে-বাস্তবে রূপ দিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট কোরআন তেলাওয়াত, দীনি বই পাঠ কিংবা প্রয়োজনীয় মাসয়ালা-মাসায়েল শেখার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সন্তানদের বয়স অনুযায়ী কোরআন, সালাত, ঈমান-আকিদা, মৌলিক ইবাদত ও ইসলামি আদব শেখানোর প্রতি জোর দিতে হবে। তাদের মক্তব বা উপযুক্ত দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। 

আঞ্জুমানের সাংগঠনিক অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, এ সংগঠন কারও ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি নয়, কাউকে ক্ষমতা থেকে নামানোর এজেন্ডাও এর নেই। দলমত-নির্বিশেষে সব মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান জানানো এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ পালনে উদ্বুদ্ধ করাই এ সংগঠনের কাজ।

বরুণার পীর মনে করেন, আমরা জুমায় একত্র হই। কথা শুনি। সালাত আদায় করি। এতেই চলবে না। জুমার সালাত হতে পারে একটি ক্লাস। দারস। জুমার খুতবার আগে মুসল্লিদের একটি করে ছোট সূরা শেখানোর মশক আয়োজন থাকতে পারে। সুরা ফাতেহা দিয়ে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে ৫২ সপ্তাহে অন্তত ১০টি সুরা সহিহভাবে শেখানোর চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি প্রতি জুমায় একটি করে জরুরি মাসয়ালা সহজ ভাষায় আলোচনা এবং প্রয়োজনে হাতে-কলমে তার সঠিক প্রয়োগ দেখিয়ে দিতে হবে।

আজ যেনো ইসলাম কঠিন হয়ে গেছে। ইসলাম পরিপালন আদতে কঠিন নয়। টাকায় ইলম বিক্রি হয় না। এ দেশের পীর মাশায়েখই সত্যিকার অর্থে দ্বীন শিখিয়েছেন বিনা পয়সায়।  বরুণা মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা লুৎফুর রহমান একজন দেওবন্দী আলেম হয়ে, শীর্ষ পীর হয়ে মানুষের কাছে কাছে গিয়েছেন। দ্বীন পৌঁছে দেবার জন্য। পথ নেই, ঘাট নেই, অথচ সেসব এলাকায় পড়ে আছে হযরতের পদচিহ্ন। 

আমার বাবা হাজি আমির হুসাইন বরুণার মুরিদ। আমাদের এলাকায় পাল্কিতে চরে আল্লামা লুৎফুর রহমান রহ. সফর করেছেন। মানুষকে দ্বীনের টেনে আনার পেছনে তার অনেক অবদান। বাবা বরুণার শায়খদের প্রতি গুণমুগ্ধ ছিলেন। রমজানে ইতিকাফ করেছেন। বরুণার হযরত উলামায়ে কেরামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আছে এখনও। হবিগঞ্জ শহর-গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ বরুণাার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। 

আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্ণভী ১৯১৬ সালে সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল থানাধীন বরুণা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মুহাম্মদ হামিদউল্লাহ ও মাতা আমিনা খাতুন। তার প্রাথমিক লেখাপড়ার হাতেখড়ি নিজ বাড়িতেই।  বাবা-মার তাকে পড়ালেখার যাত্রা শুরু করিয়েছেন। অতঃপর তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী গাছবাড়ি জামিউল উলুম কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন। দীর্ঘ ৯ বছর লেখাপড়া করার পর ১৯৩৪ সালে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ চলে যান। সেখানের ৬ বছর লেখাপড়ার পর ১৯৪১ সালে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। দেওবন্দে তিনি সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ.-এর কাছে বুখারি শরীফের সবক গ্রহণ করেন। লেখাপড়া শেষ করে ১৯৪১ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু নিজের দেশে ফেরার আগেই বড় একটি দৌলত গিফট করেন সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ.। খিলাফত। আধ্যাত্মিক এজাজত।  নিজের পড়াশোনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুলূকের পথে অবদানের জন্য তাকে খেলাফত দিয়ে ধন্য করেন সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ.। 

আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম মৌলভীবাজারে প্রথম শিক্ষকতা শুরু করেন। একদিন দুই দিন নয়। তিনি দশ বছর শিক্ষকতায় কাটান। যথেষ্ট অভিজ্ঞতার পর তিনি নিজ গ্রাম বরুণায় জামিয়া লুৎফিয়া আনওয়ারুল উলুম নামে একটি দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪০ এর দশকে তিনি তখনকার ভারতের মুসলমানদের ঐক্য ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের জন্মনিয়ন্ত্রণ আইনের প্রতিবাদে পল্টন ময়দানে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি সভাপতিত্ব করেন। 

সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ.-এর শিষ্য ১৯৭১ সালে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি সাহস জুগিয়েছেন। ১৯৭৭ সালের ১৭ মে (মঙ্গলবার) ভোর পাঁচটায় নিজ বাড়িতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। 

শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভীর বড় ভাই আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ.-এর শিষ্য আল্লামা খলীলুর রহমান রহ. কিছু দিন আগে গত হয়েছেন। বরুণার পীর বলতে এখন শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি রশীদুর রহমান ফারুকই। তিনি আধ্যাত্মিক আলো ছড়াচ্ছেন। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলাহি সভা করে আলেমদের হৃদয়ে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছেন। কারো বিরুদ্ধে নয়, কোনো একপক্ষে নয়- সব শ্রেণি পেশার মানুষদের ইসলাহী আয়োজনে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন তিনি। জীবনের পড়ন্ত বেলায় দেশের আলেমদের কী বার্তা দিয়েছেন তিনি। ফিরে যেতে হবে মহান আল্লাহর দরবারে। দুই দিনের দুনিয়ায় বাড়াবাড়ি আর কাড়াকাড়ি নয়। নিজের আত্মাকে শেকলে বন্দী করে নিজের সংশোধনে সফল হতে হবে সবার আগে। তাহলেই ইহ ও পরকালীন কল্যাণ। বরুণার পীরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদেরকে ইসলাহ তথা সংশোধনের এ পথে এগিয়ে যাবার কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের কবুল করুন। আমিন

লেখক : কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও শিক্ষক

আইও/