রাহাতের মুফতি হওয়ার স্বপ্নের পাশে গাজীপুর জেলা পরিষদ
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:১৫ সকাল
নিউজ ডেস্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

জন্মের মাত্র ১০ মাস বয়সে অসুস্থতার কারণে অবশ হয়ে যায় ডান হাত ও পা। দীর্ঘদিন চিকিৎসা করিয়েও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি শরীর। তবু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থামাতে পারেনি জ্ঞান অর্জনের অদম্য ইচ্ছা। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে কওমি মাদরাসা থেকে মাওলানা পাস করেছেন গাজীপুরের লিমন হাসান রাহাত। এবার তাঁর স্বপ্ন মুফতি হওয়া। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকটে সেই স্বপ্ন পূরণ নিয়ে দেখা দিয়েছিল অনিশ্চয়তা। অবশেষে গাজীপুর জেলা পরিষদের ২০ হাজার টাকার অনুদান তাঁর স্বপ্নের পথে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।

রাহাত এক বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে মেজ। তাঁর বাবা আবুল কালাম আজাদ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কাজ করেন। মা তাছলিমা খানম লাকি গৃহিণী। বাবার সীমিত আয়ে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি ছেলের পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে দীর্ঘদিন ধরেই সংগ্রাম করছেন তাঁরা।

ছোটবেলা থেকেই মেধাবী রাহাতের ইচ্ছা ছিল ধর্মীয় শিক্ষায় উচ্চতর যোগ্যতা অর্জন করা। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পরিবারের সহযোগিতায় কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। গত বছর মাওলানা পাস করার পর ভর্তি হন মুফতি শ্রেণিতে। কিন্তু নতুন ধাপে এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থসংকট। প্রয়োজনীয় বই ও কিতাব কেনার সামর্থ্য না থাকায় তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে পরিবার।

ছেলের স্বপ্ন পূরণে বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম যেন থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সংসারের খরচ মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে উচ্চতর পড়াশোনার ব্যয় জোগানো ছিল কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মাধ্যমে অনুদানের খবর পেয়ে জেলা পরিষদে আবেদন করেন রাহাতের মা।

সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গাজীপুর জেলা পরিষদ থেকে ২০ হাজার টাকার অনুদান পান তাঁরা। রোববার সকালে জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাহাতের মায়ের হাতে এ অনুদানের চেক তুলে দেওয়া হয়।

তাছলিমা খানম লাকি বলেন, ‘ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়া নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। পরিবারের খরচ চালিয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনুদানের জন্য আবেদন করেছিলাম। জেলা পরিষদের এই সহায়তা আমাদের দুশ্চিন্তা অনেকটাই দূর করেছে।’

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও রাহাতের এগিয়ে চলা যেন হার না মানার এক গল্প। যে বয়সে অনেকের পড়াশোনা নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা থাকে না, সে বয়সেই তাঁকে প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও পরিবারের আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে। তবু থেমে যেতে চান না তিনি। মুফতি হয়ে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পথ আরও এগিয়ে নেওয়াই তাঁর লক্ষ্য।

রাহাতের মতো শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ব্যারিস্টার ড. চৌধুরী ইশরাক আহমদ সিদ্দিকী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় গাজীপুরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় ৭৩টি মসজিদ, মাদ্রাসা ও মন্দিরে অনুদানের চেক বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন। আয়োজকেরা জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ থেকে জেলার ৭৩টি মসজিদ, মাদ্রাসা ও মন্দিরের জন্য মোট ৫০ লাখ টাকার অনুদান দেওয়া হয়েছে।

রাহাতের পরিবারের কাছে এই ২০ হাজার টাকা কেবল আর্থিক সহায়তা নয়; এটি ছেলের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার অবলম্বন। প্রয়োজনীয় বই ও কিতাব সংগ্রহ করে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন—এমন আশাই এখন তাঁদের। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর জীবনের বাস্তবতা, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতাই যেন তাঁর ভবিষ্যতের সীমানা হয়ে না দাঁড়ায়। মুফতি হওয়ার স্বপ্ন পূরণে রাহাতের এখন প্রয়োজন পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ ও ধারাবাহিক সহযোগিতা।

আইও/