
|
দূরত্ব নয়, ঐক্যই সমাজ উন্নয়নের চাবিকাঠি
প্রকাশ:
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:০২ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| মুফতি শেখ মু. নাঈম বিন আ. বারী || সমাজে যেন এক অদ্ভুত প্রাচীর গড়ে উঠেছে। মানুষে মানুষে দূরত্ব যেন এখন একটা স্বাভাবিক নিয়ম। কেউ কাউকে ছাড় দিতে বা কারো মুখোমুখি বসে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে রাজি নয়। এ সকল মনোভাব আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে মারাত্মকভাবে গ্রাস করছে। একটি সুস্থ, সুন্দর ও শান্ত সমাজের জন্য তা মারাত্মক হুমকি। সম্পর্কের এই দেয়াল ভেঙে পারস্পরিক আলোচনা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। ইসলামে পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক জীবনব্যবস্থা, যা পারস্পরিক ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে পরিচালিত হয়। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে বিভিন্ন গোত্র ও দলে বিভক্ত করেছেন একে অপরের পরিচিতি সহজ করার জন্য, দূরত্ব সৃষ্টির জন্য নয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে, আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো।" (সুরা হুজুরাত: ১৩) পরিচিত হওয়া এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখার প্রথম শর্ত হলো—পরস্পরে সুন্দর কথা বলা এবং দূরত্ব কমানো। অহংকার বা দূরত্ব বজায় রেখে কখনো সমাজ সংস্কার করা সম্ভব নয়। মতপার্থক্য বা ভুল বোঝাবুঝি মানুষের চলার পথে স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু তা মনের মধ্যে জিইয়ে রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় যেকোনো সমস্যা সমাধানে এবং সম্পর্ক জোড়া লাগাতে পারস্পরিক আলোচনা এবং পরামর্শ করার ওপর জোর দিয়েছেন। হিংসা-বিদ্বেষ এবং একে অপরকে এড়িয়ে চলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন তিনি। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "তোমরা একে অপরের সাথে হিংসা করো না, একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুতা করো না এবং একে অপরের লেনদেনের ওপর লেনদেন করো না। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা ভাই ভাই হয়ে যাও।" (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) যদি কেউ আমাদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে চায়, তবে উচিত—শান্তি ও মহত্ত্বের সাথে সে দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া। যে ব্যক্তি প্রথমে সালাম দেয় বা মুসাফাহার হাত বাড়িয়ে দেয়, আল্লাহর দরবারে সে-ই শ্রেষ্ঠ। সুসম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্বের সোনালী শিক্ষা সমাজকে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে একে অপরের প্রতি সহনশীল হওয়া এবং কুসংস্কার ও অহংকার বিসর্জন দেওয়া জরুরি। যে কোনো সমস্যা সমাধান খুঁজতে হবে পরামর্শ এবং আলোচনার টেবিলে। মুমিনের পরস্পরে আন্তরিক হওয়াই তো কাম্য। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা বোঝাতে চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "পরস্পর ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে মুমিনদের উদাহরণ একটি দেহের মতো; যখন তার একটি অঙ্গ অসুস্থ হয়, তখন পুরো শরীর জ্বর ও অনিদ্রায় ভোগে।" (সহিহ মুসলিম) আমাদের সমাজেও যদি এই বোধ ফিরে আসে, তবে কেউ আর কাউকে এড়িয়ে চলবে না। সবাই সবার বিপদে পাশে দাঁড়াবে। সুখে-দুঃখে অংশ নেবে। যে কোনো সমস্যাই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে। শুরু হোক আজ থেকেই অহংকার ও দূরত্ব আমাদের সমাজকে কেবল পিছিয়েই দিচ্ছে। দূরে রাখছে আমাদের প্রাপ্য সফলতাগুলোও। পবিত্র কোরআনের বণি—"আর তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।" (সুরা ইমরান: ১০৩) আসুন, এই আয়াতের শিক্ষাকে সামনে রেখে পরস্পরে দূরত্ব কমিয়ে শান্তিময় ও আদর্শ ইসলামিক সমাজ গড়ে তুলি। লেখক: আমীর; সচেতন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ফেডারেশন আইও/ |