বাবুনগরের বৈঠকে ঐক্যের পথে কতটা এগোলো ৭ দল?
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৩৯ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

কওমি ঘরানার সাত ইসলামি দলের রাজনৈতিক ঐক্যের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগোলেও এখনো চূড়ান্ত হয়নি ঐক্যের রূপরেখা। নেতৃত্বের কাঠামো, কমিটির মেয়াদ ও দায়িত্ব পরিবর্তন এবং অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে দলগুলোর সম্পর্কের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য থাকায় তা নিরসনে গঠন করা হয়েছে লিয়াজোঁ কমিটি। আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকায় বৈঠকের মাধ্যমে এসব বিষয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে সাত দলের প্রতিনিধিদের বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে সাত দলের প্রতিটি থেকে পাঁচজন করে মোট ৩৫ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।

বৈঠকে দলগুলোর পক্ষ থেকে আগে দেওয়া পৃথক প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৈরি করা একটি খসড়া ঐক্যের রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে প্রতিটি দল নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ওই খসড়া নিয়ে মতামত ও আপত্তি তুলে ধরে। এতে ঐক্যের বিষয়ে অগ্রগতি হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সব দলের মত এক না হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাতদলীয় ঐক্যের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব কে হবেন, কমিটির মেয়াদ শেষে নেতৃত্ব কীভাবে পরিবর্তিত হবে এবং কোনো দল অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকলে বা ভবিষ্যতে নতুন কোনো জোটে যেতে চাইলে তার ক্ষেত্রে কী নীতি অনুসরণ করা হবে—এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর অন্য জোটের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে একক অবস্থানে পৌঁছানো যায়নি। সংশ্লিষ্ট নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলগুলোর জোট ও সমঝোতার ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে কোনো দলের অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকা বা ভবিষ্যতে জোটে যাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করা হবে কি না, তা নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন।

এ ছাড়া বৈঠকের আগে খসড়া রূপরেখাটি সব দলের কাছে বিস্তারিতভাবে আলোচনার সুযোগ না থাকায় কিছু বিষয় নিজ নিজ দলীয় ফোরামে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

ঐক্য প্রক্রিয়ায় হেফাজতে ইসলামের ভূমিকা কতটা থাকবে, সেটিও আলোচনার একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। হেফাজত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়ায় সাতটি রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সংগঠনটির ভূমিকা কী হবে—এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা মনে করেন, ঐক্য গঠনে হেফাজত সমন্বয়কের ভূমিকা রাখতে পারে; তবে ঐক্য চূড়ান্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দলগুলোর নিজস্ব ফোরামের স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাতটি দলের প্রত্যেকটি থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি এবং হেফাজতের আরও দুই শীর্ষ নেতাকে নিয়ে কমিটিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ মোট সদস্যসংখ্যা ২৪ জন।

সাত দলকে নিজেদের প্রতিনিধিদের নাম নির্ধারণ করে হেফাজতের মহাসচিবের কাছে পাঠাতে বলা হয়েছে। এরপর আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকায় লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে ঐক্যের রূপরেখার বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকের পর ঐক্যের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। পরে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন হেফাজতের নেতারা।

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, সাত দলই ঐক্যের বিষয়ে ইতিবাচক। তবে রোববারের বৈঠকে ঐক্যের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকের মাধ্যমে বাকি বিষয়গুলো সমন্বয় করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

হেফাজতের নায়েবে আমির মুফতি জসীম উদ্দিন বলেন, সাত দলের পক্ষ থেকে দেওয়া পৃথক ফর্মুলাগুলো নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার পর একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। সেই রূপরেখা নিয়েই রোববারের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে ঐক্য প্রক্রিয়ায় সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় রয়েছে—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।

এর আগে গত ১৬ জুলাই বাবুনগর মাদরাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমিরের আহ্বানে সাত দলের নেতাদের বৈঠকে নীতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। তখন ঐক্যের সুনির্দিষ্ট ফর্মুলা পরে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণের কথা বলা হয়। এবার সেই ফর্মুলা নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের মাধ্যমে আরও এক ধাপ এগোলো দলগুলো।

আইও/