দুই প্রাণঘাতী আগাছানাশক নিষিদ্ধ: নিরাপদ কৃষির পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৭ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| মিনহাজ উদ্দীন আত্তার ||

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তার অনেকগুলোর কেন্দ্রবিন্দু ছিল খাদ্য, পানি এবং উর্বর ভূমি। একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার খাদ্যব্যবস্থার নিরাপত্তা, কৃষির স্থিতিশীলতা এবং জনগণের সুস্বাস্থ্যের ওপর। যে জাতি নিজের খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা হারায়, সে ধীরে ধীরে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের স্বাধীনতাও হারাতে শুরু করে।

মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জারের বহুল আলোচিত উক্তি—"যে আপনার খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করে, সে আপনার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করে।" এই একটি বাক্যের মধ্যেই আধুনিক বিশ্বের কঠিন বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। খাদ্য কেবল ক্ষুধা নিবারণের উপায় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।

এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি সরকার কৃষিতে বহুল ব্যবহৃত দুটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ আগাছানাশক—প্যারা কোয়াট (Paraquat) ও গ্লাইফোসেট (Glyphosate)-এর নিবন্ধন, আমদানি ও লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এ অনুষ্ঠিত বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (পিটাক) ৯১তম সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন নিবন্ধন বন্ধের পাশাপাশি বিদ্যমান লাইসেন্সও আর নবায়ন করা হবে না। বর্তমানে দেশে মজুত থাকা প্রায় ৩৯৫ টন প্যারা কোয়াট আগামী ছয় মাসের মধ্যে পর্যায়ক্রমে অপসারণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বিপজ্জনক বালাইনাশকের ব্যবহার অন্তত ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত সেই লক্ষ্য অর্জনের দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

নীরব বিষের বিস্তার

প্যারা কোয়াট পৃথিবীর অন্যতম বিষাক্ত আগাছানাশক হিসেবে পরিচিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে এটি নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। কারণ সামান্য পরিমাণ গ্রহণ করলেও এটি মানুষের ফুসফুস, কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুও ঘটাতে পারে।

২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্যারা কোয়াট বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ২৫৭ জন রোগীর মধ্যে প্রায় ৪৩.২ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে বিষয়টি কেবল কৃষির নয়; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সংকট।

অন্যদিকে গ্লাইফোসেট বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত আগাছানাশক হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বহু বছর ধরে বিতর্ক চলছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় এর সম্ভাব্য ক্যানসার-ঝুঁকি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং মাটির স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য শুধু কৃষির বিষয় নয়

কৃষিজমিতে ব্যবহৃত প্রতিটি রাসায়নিক শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে। অতিরিক্ত বা নিয়মবহির্ভূত ব্যবহার শুধু জমির উর্বরতা কমায় না; মাটি, পানি ও পরিবেশকেও দূষিত করে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে মানুষের শরীরে জমা হতে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিল রোগসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের অনেক কৃষক এখনো যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করেন। ফলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় তারাই প্রথম স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হন।

শুধু নিষিদ্ধ করলেই হবে না

সরকারের সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে নিষেধাজ্ঞাই সমস্যার শেষ সমাধান নয়। কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—

কৃষকদের নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প আগাছা দমন পদ্ধতির প্রশিক্ষণ।

জৈব ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার (IPM) বিস্তার।

মজুত থাকা রাসায়নিকের কঠোর নজরদারি, যাতে সেগুলো অবৈধভাবে বাজারে প্রবেশ করতে না পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে তদারকি।

নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি।

নিরাপদ কৃষিই টেকসই ভবিষ্যৎ

কৃষির সাফল্য কেবল উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই খাদ্য যদি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়, তবে সেই সাফল্য অর্থহীন হয়ে পড়ে। একটি ফল, একটি সবজি কিংবা একমুঠো ধান শুধু বাজারের পণ্য নয়; এটি একটি শিশুর পুষ্টি, একটি পরিবারের সুস্থতা এবং একটি জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।

দুই প্রাণঘাতী আগাছানাশক নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিরাপদ কৃষি আন্দোলনে একটি ইতিবাচক মাইলফলক। এখন প্রয়োজন কঠোর বাস্তবায়ন, গবেষণাভিত্তিক কৃষিনীতি, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ বিকল্প প্রযুক্তির বিস্তার।

নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার, কৃষক, গবেষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সবার সম্মিলিত উদ্যোগই পারে একটি বিষমুক্ত, সুস্থ ও টেকসই বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলতে।

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা

আইও/