
|
‘সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচরণ ইলমের জন্য বহুমুখী ক্ষতির কারণ’
প্রকাশ:
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৫৪ রাত
নিউজ ডেস্ক |
বর্তমান সময়ে জ্ঞানচর্চা, সংবাদ জানা, মতামত প্রকাশ ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তথ্য ও আলোচনা সামনে আসছে। এর মধ্যে যেমন প্রয়োজনীয় ও উপকারী বিষয় রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিভ্রান্তিকর, ভিত্তিহীন ও সময়ক্ষেপণকারী নানা উপাদান। বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও লেখক মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন দীর্ঘদিন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে ছিলেন। পরে কয়েকজন আলেমের পরামর্শে ফেসবুকে যুক্ত হলেও একপর্যায়ে তিনি সেখানে লেখালেখি বন্ধ করে দেন। তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে কিছু উপকার পাওয়া গেলেও ইলমের পথে এর ক্ষতির দিক অনেক বেশি। বিশেষ করে একজন তালিবুল ইলমের মনোযোগ, কিতাবি মুতালাআ, গবেষণা ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের ওপর এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরে আসার কারণ ও ইলমের ওপর এর প্রভাব নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আওয়ার ইসলামের সম্পাদক হুমায়ুন আইয়ুব? আওয়ার ইসলাম: আপনি দীর্ঘদিন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে ছিলেন। এর পেছনে মূল কারণ কী ছিল? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি যখন চালু হয়, তখন থেকেই বহু বছর আমি এগুলো থেকে বিরত ছিলাম। এমনকি আমার একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি আমার নামে ফেসবুকে একটি অ্যাকাউন্টও খুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও আমি নিজে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশ করিনি। পরবর্তী সময়ে কয়েকজন আলেম আমাকে বললেন, ফেসবুক-ইউটিউবের মাধ্যমে প্রচুর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখানে বিভ্রান্তির অনেক উপকরণ রয়েছে। আমাদের লোকজনের পক্ষ থেকেও অনেক অনাসৃষ্টি হচ্ছে। আমি যদি এসবের বিরুদ্ধে লিখি, তাহলে হয়তো আমাদের লোকজন অন্তত সচেতন হবে। তাদের কথায় একসময় ফেসবুকে প্রবেশ করি। কয়েক বছর সেখানে নেতিবাচক বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে শত শত পোস্টও দিয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে, এতে খুব বেশি ফল হয়েছে বলে মনে হয় না। বরং অনলাইনে লেখালেখিতে যে সময় ব্যয় করেছি, সেই সময়টা অফলাইনে ইলমের কাজে দিলে হয়তো বেশি উপকার হতো। এ উপলব্ধি থেকেই ফেসবুকে লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছি। আওয়ার ইসলাম: তাহলে কি আপনি মনে করেন সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো উপকার নেই? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: না, তা বলছি না। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচরণে কিছু লাভ অবশ্যই আছে। সমসাময়িক অনেক বিষয় জানা যায়, ছোটখাটো অনেক খবর পাওয়া যায়, যেগুলো অনেক সময় বড় বড় গণমাধ্যমেও আসে না। এসব সোশ্যাল মিডিয়া থেকে তথ্য ও জ্ঞান আহরণের ইতিবাচক দিক। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এর বিপরীতে ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি। বিশেষ করে যারা ইলমের পথে মেহনত করছেন, তাদের জন্য এর কিছু ক্ষতি অত্যন্ত গভীর। আমার সোশ্যাল মিডিয়া ত্যাগের পেছনে মূলত এসব কারণই কাজ করেছে। আওয়ার ইসলাম: ইলমের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা কী? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: আমার কাছে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো—এটি মানুষের জেহেন মুনতাশির, অর্থাৎ মন ও চিন্তাকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় একসঙ্গে এত বিচিত্র বিষয় সামনে আসে যে, জেহেনকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নিবিষ্ট রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এক মুহূর্তে রাজনীতি, পরক্ষণে কোনো সংবাদ, এরপর কোনো বিতর্ক, তারপর কোনো বিনোদনের বিষয়—এভাবে নানা ধরনের বিষয় সামনে আসতে থাকে। এর ফলে একমুখী মুতালাআ থেকে মানুষ দূরে সরে যায়। অথচ কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে একই বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া দরকার। নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা, চর্চা ও গবেষণাও এভাবেই এগিয়ে নিতে হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার বিচরণ এই নিবিষ্টতা নষ্ট করে। আওয়ার ইসলাম: সময় নষ্ট হওয়ার বিষয়টিও কি বড় সমস্যা? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: অবশ্যই। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর ফালতু লোকের লেখা পড়েও সময় নষ্ট হয়। অনেক সময় একটি আকর্ষণীয় শিরোনাম দেখে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। পরে দেখা গেল, ভেতরে তেমন কোনো মূল্যবান কথা নেই; বরং একজন অযোগ্য ব্যক্তির নানা ধরনের বাজে কথা। তখন সেখান থেকে বের হয়ে এলাম ঠিকই। কিন্তু ততক্ষণে কিছু সময় তো নষ্ট হয়েই গেছে। এভাবে প্রতিদিন অল্প অল্প করে যে সময় নষ্ট হয়, একটা পর্যায়ে দেখা যায় ইলমের জন্য দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ই কমে গেছে। আওয়ার ইসলাম: সোশ্যাল মিডিয়ার বিতর্ক ও নেতিবাচক আলোচনার প্রভাব কী? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর নেগেটিভ ও ডিস্ট্রাক্টিভ আলোচনা থাকে। এসব আলোচনায় জড়ালে মানুষের মেধা ও চিন্তার শক্তি এমন সব বিষয়ে ব্যয় হয়, যেগুলো তার ইলমী জীবনে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখে না। একজন মানুষ যে সময় কোনো কিতাব পড়তে পারত, কোনো বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে পারত বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা করতে পারত, সেই সময় সে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে ব্যয় করছে। শুধু সময় নয়, মেধারও অপচয় হচ্ছে। আওয়ার ইসলাম: সোশ্যাল মিডিয়ার সহজলভ্য জ্ঞান কি কিতাবি মুতালাআর প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়াশোনা করা খুব সহজ। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি পোস্ট পড়া যায়, একটি ভিডিও দেখা যায়, একটি বিষয়ে কিছু তথ্য জানা যায়। কিন্তু কিতাবি মুতালাআ একটু কঠিন। সেখানে সময় দিতে হয়, মনোযোগ দিতে হয়, ধৈর্য ধরতে হয়। এই সহজিয়ার কারণে মানুষ ধীরে ধীরে কঠিন কিতাবি মুতালাআ থেকে বিমুখ হয়ে যেতে পারে। অথচ ইলমে স্থিতি অর্জনের জন্য কিতাবি মুতালাআর বিকল্প নেই। শুধু তথ্য জানলেই ইলম হয় না। গভীরভাবে পড়তে হয়, বুঝতে হয়, চিন্তা করতে হয় এবং দীর্ঘ সময় কোনো বিষয়ে মেহনত করতে হয়। কিতাবি মুতালাআ মানুষের জ্ঞান ও মানসিকতায় যে স্থিতি তৈরি করে, সোশ্যাল মিডিয়ার বিচ্ছিন্ন তথ্য তা দিতে পারে না। আওয়ার ইসলাম: সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও তো প্রশ্ন রয়েছে? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: হ্যাঁ। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর ভিত্তিহীন ও ভুয়া তথ্য থাকে। কেউ একটি কথা লিখল, আরেকজন সেটি যাচাই না করেই প্রচার করল। এভাবে একটি ভুল তথ্য বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এর ফলে মানুষের মাথায় ভিত্তিহীন ও ভুয়া বিদ্যা বাসা বাঁধে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, মানুষ অনেক সময় ভুল তথ্যকে সত্য মনে করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অন্যের কাছেও প্রচার করে। আওয়ার ইসলাম: সোশ্যাল মিডিয়ায় কার কাছ থেকে জ্ঞান নেওয়া হচ্ছে—এ বিষয়টিও কি গুরুত্বপূর্ণ? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোশ্যাল মিডিয়ার একটি সমস্যা হলো, এখানে মানুষ অনেক সময় বড়দের বাদ দিয়ে ছোটদের কাছ থেকে বিদ্যা নেওয়ার অভ্যাস করে ফেলে। যার দীর্ঘদিনের ইলমি প্রস্তুতি নেই, যার কোনো বিষয়ে গভীর অধ্যয়ন নেই, তার কথাও এখানে খুব সহজে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে অপরিপক্ব বিদ্যা মানুষের মাথায় জমা হতে থাকে। ইলমের ক্ষেত্রে কার কাছ থেকে শিখছি—এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অভিজ্ঞ ও যোগ্য আলেমদের কাছে বসা, তাদের কিতাব পড়া এবং তাদের কাছ থেকে বিষয় বোঝার একটি আলাদা মূল্য রয়েছে। আওয়ার ইসলাম: সোশ্যাল মিডিয়া কি ইলমের জন্য মেহনত করার মানসিকতাও কমিয়ে দেয়? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: আমার মনে হয়, অনেক ক্ষেত্রে দেয়। ইলম অর্জন করতে দীর্ঘ সময় মেহনত করতে হয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে অল্প সময়ে অল্প পরিশ্রমে অনেক কিছু পাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত করে। একসময় দেখা যায়, দীর্ঘ সময় বসে কিতাব পড়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ইলমের জন্য যে মেহনত দরকার, সেই মেহনত করার মনোবৃত্তি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। আওয়ার ইসলাম: ইলমের পরিবর্তে অন্য শুগলে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কাও কি থাকে? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: অবশ্যই। সোশ্যাল মিডিয়া এমন একটি জায়গা, যেখানে এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে চলে যাওয়া খুব সহজ। আপনি ইলমের একটি বিষয় দেখতে গিয়ে হঠাৎ অন্য কোনো আলোচনায় চলে গেলেন। সেখান থেকে আরেকটি বিষয়। এভাবে একসময় দেখা গেল, যে উদ্দেশ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকেছিলেন, সেটাই আর মনে নেই। এভাবে ইলমি শুগল ছেড়ে মানুষ ধীরে ধীরে অন্য শুগলে ডুবে যেতে পারে। ইলমের পথে এটি বড় ক্ষতি। আওয়ার ইসলাম: সোশ্যাল মিডিয়ার বিতর্ক কি পুরোনো বা মীমাংসিত বিষয়কেও নতুন করে বিতর্কিত করে তোলে? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: হ্যাঁ, এটি সোশ্যাল মিডিয়ার আরেকটি সমস্যা। অনেক মীমাংসিত বিষয়কেও এখানে নতুন করে অমীমাংসিত বানিয়ে ফেলা হয়। একই বিষয় নিয়ে বারবার বিতর্ক, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও তর্ক চলতে থাকে। এখানে শুধু ক্যাচাল আর ক্যাচাল। এতে ইলমের গভীরতা বাড়ে না; বরং মানুষের মনোযোগ ও সময় নষ্ট হয়। একজন তালিবুল ইলমের উচিত কোন বিষয়ে আলোচনা করা দরকার এবং কোন বিষয় এড়িয়ে চলা দরকার—এ ব্যাপারে সচেতন থাকা। আওয়ার ইসলাম: সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে জীবনযাপনের রুটিনেও কি প্রভাব পড়ে? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: অবশ্যই পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচরণ অনেক সময় রুটিন মোতাবেক জীবন চালানোর বারোটা বাজিয়ে দেয়। ইলমের জীবনে রুটিন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কখন পড়ব, কখন বিশ্রাম নেব, কখন ইবাদত করব, কখন মানুষের প্রয়োজনীয় কাজে সময় দেব—এসবের একটি নিয়ম থাকা দরকার। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকে গেলে সময়ের হিসাব থাকে না। কয়েক মিনিটের জন্য ঢুকে অনেকক্ষণ পার করে দেওয়া খুব সহজ। আওয়ার ইসলাম: আপনার দৃষ্টিতে তাহলে একজন তালিবুল ইলমের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা জরুরি? মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন: আমি সবার জন্য একই সিদ্ধান্ত দিতে চাই না। তবে একজন তালিবুল ইলমকে নিজের প্রয়োজন, সময় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে খুব সচেতন হতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া যদি তার ইলমি মুতালাআ, রুটিন, চিন্তার স্থিরতা ও মেহনতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে তাকে অবশ্যই নিজের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু ‘আমি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করি’—এটি সমস্যা নয়; সমস্যা হলো এটি আমার ইলমি জীবনকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। আমার নিজের ক্ষেত্রে আমি দেখেছি, অনলাইনে লেখালেখিতে যে সময় ব্যয় করছিলাম, সেটি অফলাইনে ইলমের কাজে দিলে বেশি উপকার হবে। তাই আমি সরে এসেছি। এসএইচ/ |