যে হৃদয় আল্লাহকে ভুলে যায়
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:২৫ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক 

মানুষের শরীর বেঁচে থাকে হৃদয়ের স্পন্দনে। কিন্তু একজন মুমিনের জীবনে হৃদয়ের কাজ শুধু রক্ত সঞ্চালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার হৃদয়ই ঈমানের ঠিকানা, ভালোবাসার কেন্দ্র এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেই হৃদয় যখন আল্লাহর স্মরণে সজীব থাকে, তখন দুঃখের মধ্যেও মানুষ আশার আলো খুঁজে পায়। বিপদে ভেঙে পড়ে না, প্রাচুর্যে অহংকারী হয় না। আর যখন হৃদয় তার রবকে ভুলে যায়, তখন বাহ্যিক জীবনে যতই স্বাচ্ছন্দ্য থাকুক, ভেতরে ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা তাকে গ্রাস করতে থাকে ক্রমশ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮)

পৃথিবীর অর্থ, সম্পদ, যশ-খ্যাতি, ভালোবাসা কিংবা সাফল্য—কোনোটিই মানুষের অন্তরকে স্থায়ী প্রশান্তি দিতে পারে না। কারণ মানুষের হৃদয়কে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তার প্রকৃত প্রশান্তির পথও তিনি সবচেয়ে ভালো জানেন।

আল্লাহকে ভুলে যাওয়া বলতে কী বোঝায়?

আল্লাহকে ভুলে যাওয়া মানে এই নয় যে মানুষ মুখে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করলেই কেবল সে আল্লাহকে ভুলে গেল। বরং মানুষ যখন নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত, চিন্তা, কাজ ও উদ্দেশ্য থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সরিয়ে দেয়, তখন ধীরে ধীরে তার হৃদয় গাফেল হয়ে পড়ে।

নামাজের সময় হয়ে গেছে, অথচ দুনিয়ার ব্যস্ততায় নামাজের কথা মনে নেই। হারাম-হালালের সীমারেখা সামনে থাকার পরও নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া। বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকা, কিন্তু স্বস্তি ফিরে এলে তাঁকে ভুলে যাওয়া—এসবও অন্তরের গাফেলতির লক্ষণ।

আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন, “তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে; ফলে তিনি তাদের নিজেদেরকেই ভুলিয়ে দিয়েছেন।” (সূরা আল-হাশর, ৫৯:১৯) 

মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন আসলে সে নিজের প্রকৃত পরিচয় ও জীবনের উদ্দেশ্যও ভুলে যেতে থাকে। সে জানে কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হয়, কীভাবে মানুষের কাছে নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়; কিন্তু কেন তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে—এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর তার জীবন থেকে হারিয়ে যায়।

অন্তর শক্ত হয়ে যায়

গুনাহের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রভাবগুলোর একটি হলো—তা ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে কঠিন করে দেয়। প্রথমবার কোনো গুনাহ করলে অন্তরে অনুশোচনা হতে পারে। দ্বিতীয়বারও অস্বস্তি থাকতে পারে। কিন্তু একই গুনাহ বারবার করতে থাকলে একসময় বিবেকের সেই সতর্ক ঘণ্টাটিও যেন নীরব হয়ে যায়। 

আল্লাহ তাআলা বলেন, “কখনোই নয়; বরং তারা যা অর্জন করেছে, তা তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।” (সূরা আল-মুতাফফিফিন, ৮৩:১৪) 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। সে তওবা করলে ও গুনাহ থেকে ফিরে এলে তার অন্তর পরিষ্কার হয়। কিন্তু সে যদি গুনাহ করতে থাকে, তাহলে সেই দাগ বাড়তে থাকে। (তিরমিজি, ৩৩৩৪) 

এ কারণেই ছোট গুনাহকে ছোট মনে করে অবহেলা করা উচিত নয়। একটি গুনাহ হয়তো বাইরে থেকে খুব সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু তা যদি মানুষের অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় ও লজ্জা কমিয়ে দেয়, তাহলে সেটি তার জন্য ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হতে পারে।

দুনিয়া বাড়ে, প্রশান্তি বাড়ে না

মানুষ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। প্রযুক্তি হাতের মুঠোয়, যোগাযোগ সহজ, বিনোদনের অভাব নেই। তারপরও মানুষের মধ্যে অস্থিরতা, একাকিত্ব ও অশান্তি কমছে না।

এর কারণ এই নয় যে দুনিয়ার সবকিছুই খারাপ। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন মানুষ দুনিয়াকে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলে এবং আখিরাতকে ভুলে যায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, তার জীবন হবে সংকীর্ণ।” (সূরা ত্বহা, ২০:১২৪) 

অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে তার কাছে অনেক কিছু থাকলেও অন্তরে প্রশান্তি নাও থাকতে পারে। সে আরও কিছু চায়, আরও কিছু পাওয়ার পরও অস্থির থাকে। এক চাওয়া পূরণ হলে আরেকটি চাওয়া সামনে এসে দাঁড়ায়। কারণ অন্তরের যে শূন্যতা আল্লাহর স্মরণ দিয়ে পূর্ণ হওয়ার কথা, সেখানে সে অন্য কিছু দিয়ে পূর্ণতা খুঁজছে।

আল্লাহর স্মরণে ফিরে আসার পথ

আল্লাহকে ভুলে যাওয়া হৃদয়ের জন্য সবচেয়ে সুন্দর সংবাদ হলো—ফিরে আসার দরজা এখনো খোলা। মানুষ যত দূরেই চলে যাক, আন্তরিকভাবে ফিরে এলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “বলুন, হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।” (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩) 

তাই তওবার জন্য কোনো বিশেষ বয়সের প্রয়োজন নেই, কোনো নির্দিষ্ট সময়েরও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু সত্যিকারের অনুশোচনা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার দৃঢ় সিদ্ধান্ত।

নামাজকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনা, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা, বেশি বেশি জিকির করা, গুনাহ থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং সৎ মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা—এসবের মাধ্যমেই অন্তর আবার জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে এবং যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে না—তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের মতো।” (সহিহ বুখারি, ৬৪০৭) 

কত গভীর এই উপমা! একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে জীবিত, কিন্তু তার অন্তর যদি আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তাহলে তার আধ্যাত্মিক জীবন মৃতের মতো হয়ে যেতে পারে।

ফিরে আসার এখনই সময়  

আমরা অনেক সময় মনে করি, একটু পরে নামাজ ঠিক করব, বয়স হলে তওবা করব, জীবন একটু গুছিয়ে নিলে কুরআন পড়ব। অথচ মৃত্যু কারও পরিকল্পনা অনুযায়ী আসে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫) 

তাই আল্লাহর দিকে ফিরে আসার জন্য আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যে হৃদয় আজ আল্লাহকে স্মরণ করতে পারে, তার জন্য আজই ফিরে আসার সময়।

হয়তো আমাদের জীবনে অনেক ভুল হয়েছে। হয়তো অনেক নামাজ ছুটে গেছে, অনেক গুনাহ হয়েছে, অনেকবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আবার ভেঙেছি। তবুও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। কারণ আমাদের ভুলের চেয়ে আল্লাহর রহমত অনেক বড়।

শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় সাফল্য কত টাকা রেখে গেল, কত মানুষ তাকে চিনল কিংবা কত বড় পরিচয় নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিল—তা নয়। সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, পৃথিবী ছাড়ার সময় তার হৃদয় যেন তার রবকে চিনতে পারে এবং তার রবও যেন তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন।

যে হৃদয় আল্লাহকে ভুলে যায়, সে হৃদয় দুনিয়ার সবকিছু পেয়েও শূন্য থাকতে পারে। আর যে হৃদয় আল্লাহকে খুঁজে পায়, সে অনেক কিছু হারিয়েও শান্ত থাকতে পারে।

আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার ব্যস্ততার মাঝেও মহান আল্লাহকে স্মরণ করার তাওফিক দান করুন। কখনো যেন ভুলে না-যাই আমাদের রবকে। আমীন। 

এসএইচ/