
|
মাদরাসায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে কী বলছেন চিন্তাশীল আলেমরা
প্রকাশ:
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:১৯ রাত
নিউজ ডেস্ক |
|| ইমরান ওবাইদ || সমকামিতা ও যৌন নির্যাতনের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় নিয়ে ধর্মীয় অঙ্গনেও সাম্প্রতিক সময়ে নানা অভিযোগ সামনে আসছে। বিশেষ করে মাদরাসাগুলোতে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে একদিকে প্রকৃত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার জরুরি হয়ে ওঠে, অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণের আগেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও দেখা দেয়। ফলে কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং নিরপরাধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষায় দায়িত্বশীল ও প্রমাণভিত্তিক অবস্থান নেওয়া জরুরি। ইসলামি দৃষ্টিতে সমকামিতা ও যৌন অনাচার গুরুতর গুনাহ হিসেবে বিবেচিত। কোরআনে হজরত লুত (আ.)-এর জাতির ঘটনা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে ধর্মীয় অঙ্গনে এমন অভিযোগ সামনে এলে ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোচনার পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার সত্যতা, প্রমাণ ও প্রেক্ষাপটও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণ—দুটি এক বিষয় নয়। যাচাই-বাছাই ছাড়াই কোনো ঘটনা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে যেমন প্রকৃত অপরাধ আড়ালে যেতে পারে, তেমনি নিরপরাধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ধর্মীয় অঙ্গনকে এই কালিমা লেপনের কুৎসিত অবস্থা থেকে কীভাবে মুক্তি দেওয়া যায় তা নিয়ে দেশের কয়েকজন চিন্তাশীল আলেমের সঙ্গে কথা বলেছে আওয়ার ইসলাম। তাদের সে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শগুলো বাস্তবে রূপ দিতে পারলে হয়তো এই নগ্ন পরিস্থিতির অবসান ঘটানো সম্ভব। সময় টেলিভিশনের অ্যাসোসিয়েট জয়েন্ট নিউজ এডিটর ও মাদরাসা শিক্ষক মুফতি আবদুল্লাহ তামীম এই কঠিন পরিস্থিতিতে মাদরাসা বোর্ডগুলোকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এই বিষয়টির সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, বোর্ড পর্যায়ে একটি কেন্দ্রীয় অভিযোগ সেল গঠন এবং পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ দায়ের করার জন্য একটি ডেডিকেটেড হটলাইন চালু করা। প্রতিটি মাদরাসার জন্য একটি লিখিত ও সুস্পষ্ট শিশু সুরক্ষা নীতি প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়ন করা। মুফতি আব্দুল্লাহ তামীম এই নিকৃষ্ট কাজের প্রতিরোধে মাদরাসার ওয়াশরুম ছাড়া প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্থানে সিসিটিভি স্থাপনের পরামর্শ দেন এবং শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক এবং আকস্মিক যেকোনো মাদরাসা পরিদর্শনের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, কোনো শিক্ষকের ওপর এমন অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে কঠোর আইনি শাসনের আওতায় আনতে হবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বহিষ্কারসহ ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। যেন সে পরবর্তী সময়ে আর কোনো মাদরাসায় ঢুকে এমন অনৈতিক কাজ করতে না পারে। যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসার মুশরিফ মুফতি মনিরুজ্জামান এই পরিস্থিতির পেছনে আবাসিক ব্যবস্থাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, যে স্তর পর্যন্ত এই সমস্ত অনৈতিক কাজ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে সেগুলোতে অনাবাসিক ব্যবস্থা চালু করলে এর দ্রুত অবসান ঘটানো সম্ভব। তিনি শিক্ষকদের জন্য কোয়ার্টারের ব্যবস্থা গ্রহণ করাকেও এর বিকল্প পথ হিসেবে উল্লেখ করেন। বলেন, সপ্তাহ অন্তর অন্তর একজন মাদরাসার নেগরানি করবে, বাকি সকল ওস্তাদ (বিশেষত রাতে) নিজেদের পরিবার নিয়ে মাদরাসার পাশে অবস্থান করবেন। তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এককভাবে টার্গেট করার পেছনে কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন। লালমাটিয়া মাদরাসার মুদাররিস শারাফাত শরিফ কাসেমি বলাৎকারের মতো অনৈতিক কাজ বন্ধে পরামর্শ দিয়ে বলেন, শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে বয়স এবং ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন, সেই বয়সের পূর্বে এবং ট্রেনিং ছাড়া কাউকে শিশুদের শিক্ষক না বানানো। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় দাওরায়ে হাদিস শেষ হওয়ার পূর্বেই অনেক ছাত্র চাকরি শুরু করে দেয়। তারা মক্তব-হেফজখানায় পড়ানো শুরু করে; অথচ তাদের পড়ানোর বয়সও হয়নি এবং প্রপার ট্রেনিংও তারা পায়নি। বাচ্চাদের কতটুকু শাসন করা যাবে, তাদের ভয় দেখানো যাবে কি যাবে না, তাদের কীভারে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, ইত্যাদি কোনো ট্রেনিং তাদের নেই। মাওলানা শারাফাত শরিফ জবাবদিহিতার পরিবেশ তৈরি করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, প্রতিটি এলাকায় নির্দিষ্ট কিছু আঞ্চলিক বোর্ড থাকে। কেউ যদি মাদরাসা খুলতে চায়, সেই বোর্ড বা এলাকার প্রবীণ আলেমগণের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রতিষ্ঠা করার নিয়ম চালু করা ও জোরদার করা জরুরি এবং সর্ব বিষয়ে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় থাকতে বাধ্য করতে হবে; যেন থাকা-খাওয়াসহ শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও যেকোনো সমস্যায় তাদের জবাবদিহি করতে হয়। তিনি মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করার জন্য ৪০ দিনের ট্রেনিংকে অপর্যাপ্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, প্রাইমারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো শিক্ষক নিয়োগ দিলে নিয়োগের পর তাকে অন্তত এক বছর ট্রেনিং নিতে হয়। অথচ আমাদের মাদ্রাসাগুলোতে মাত্র ৪০ দিনের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়, অনেকে আবার এই সময়ও পূর্ণ করে না। মাত্র ৪০ দিন একেবারেই অপর্যাপ্ত সময়। তিনি ট্রেনিংগুলোকে ৬ মাস বা ১ বছর মেয়াদি করার পরামর্শ দেন। তালিমুন নাজাত মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মুফতি যাইনুল আবিদিন আলেম ছাত্র-শিক্ষকের সীমারেখা স্পষ্ট করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ছাত্র-শিক্ষক একান্তে থাকা, অনুচিত স্পর্শ ও শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সুযোগ যেন না থাকে; বিশেষ করে আবাসিক মাদরাসায় ছাত্র-শিক্ষক ঘুমানোর পৃথক ব্যবস্থাপনা, সিসিটিভি ও নাইট ক্যামেরা প্রতিস্থাপন করা এবং সপ্তাহ অন্তর অন্তর তা মনিটরিংসহ কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের পরিবারসহ থাকার ব্যবস্থা করা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বলে উল্লেখ করেন তিনি। মুফতি যাইনুল আবিদিনও নিরাপদে পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ দায়ের করার ব্যবস্থা চালু করা এবং শিক্ষক নিয়োগ ও তদারকিতে সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেন। এবং অপপ্রচার প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণে থানাভিত্তিক দক্ষ-অভিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের একটি কমিটি গঠন করার পরামর্শ দেন তিনি, যারা কোনো মাদরাসা বা শিক্ষকের ওপর এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুততম সময়ে নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট বিষয়টি মিডিয়ার সামনে তুলে ধরবেন। মারকাযুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়া, বাড্ডা, ঢাকার মুহাদ্দিস মুফতি আশিকুল ইসলাম ব্যাপক হারে নৈতিক শিক্ষা চালুর পরামর্শ দিয়ে বলেন, নৈতিক শিক্ষার অবক্ষয়ের কারণে বর্তমানে সমকামিতা বা বলাৎকারের মতো গুনাহের কাজ হচ্ছে। তিনিও সিসি ক্যামেরাসহ মাদরাসাগুলোকে কঠোর নেগরানির আওতায় আনার পরামর্শ দেন এবং বলেন, এমনভাবে পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেন এ সমস্ত গুনাহের প্রতি সকলের অনীহা তৈরি হয়, কোনোভাবেই সে দিকে কারো ঝোঁক না যায়। মুহাদ্দিস, লেখক ও আলোচক মুফতি শেখ মুহা. নাঈম বিন আ. বারী এই নিকৃষ্ট কাজকে প্রতিহত করতে পরামর্শ দিয়ে বলেন, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছোটবেলা থেকেই ইসলামি মূল্যবোধ, শালীনতা ও নৈতিক চরিত্র গঠনের তালিম নিশ্চিত করা জরুরি। অভিভাবকদের সন্তানদের চালচলন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর সুস্থ নজরদারি বাড়াতে হবে। গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সমকামিতার পক্ষে চলা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিহত করতে হবে। দেশের প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রোপাগান্ডাকারী সংস্থাসমূহের কার্যক্রম দমন করতে হবে। তিনি এই মানসিক বিকার বা আসক্তির শিকার ব্যক্তিদের ঘৃণা না করে, কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দেন। জামিয়া ইসলামিয়া দারুল ঈমান বেগম মসজিদ চাঁদপুরের মুহাদ্দিস মাওলানা মুহাম্মাদ বুরহানুদ্দীন বিন সাদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্ধুত্বের নামে যেন এ দুষ্ট ব্যাধি বিস্তার করতে না পারে সে দিকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ও অভিভাবকদের সজাগ দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সমকামিতা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি সুস্পষ্ট নিষিদ্ধ ও গর্হিত অপরাধ। তাই এর প্রচার, স্বাভাবিকীকরণ ও অশ্লীল প্রভাব থেকে সমাজ রক্ষায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আলেমসমাজ ও সামাজিক নেতৃবৃন্দকে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষত সন্তানদের শৈশব থেকেই ঈমান, তাকওয়া, লজ্জাশীলতা ও আত্মসংযমের গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক ইসলামী শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার থেকে রক্ষা করতে হবে। আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রায় সবাই মাদরাসাগুলোতে কঠোর নজরদারি বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের জন্য নিরাপদে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই ও সতর্কতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও সবাই একমত হন। এ বিষয়ে শিক্ষাবোর্ড ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। আইও/ |