ফতোয়া ও আত্মশুদ্ধির ময়দানে মুফতি সাঈদ আহমদ রহ.
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৪৩ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

|| মুফতি হোসাইন তৈয়ব ||

আল্লামা মুফতি সাঈদ আহমদ রহ. ছিলেন একজন বরেণ্য মুফতি, যিনি মানুষকে শরিয়তের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার পথহারা মানুষকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন। আল্লাহভোলা বান্দাদের তার সাথে সম্পর্ক গড়ে দিয়েছেন। এককথায় তিনি যেমন একজন খ্যাতিমান মুফতি ছিলেন, অনুরূপ ছিলেন একজন মুরশিদে কামেল তথা খাঁটি পীর।

জন্ম ও পরিচিতি:

মুফতি সাঈদ আহমদ রহ. ১৯ চৈত্র, ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ২ এপ্রিল ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার জুমার নামাজের পূর্বে ফেনী জেলার অন্তর্গত ছনুয়া গ্রামের এক দ্বীনদার সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জনাব হাজি আহসানুল্লাহ সওদাগর এবং মাতা মুসাম্মাত আছিয়া।

শিক্ষাজীবন:

শৈশব থেকে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল। মাতাপিতা তাকে জনৈক হিন্দু শিক্ষকের নিকট সোপর্দ করার শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। একটি স্কুলে তাকে ভর্তি করানো হয়েছিল, কিন্তু স্বভাবগতভাবে স্কুলে তার দেহ গেলেও মন যেত না। এভাবে দু’বছর স্কুলে পড়ার পর তাকে রহিমপুর মাদরাসায় ভর্তি করানো হয়। এখানে তিনি মনোযোগ সহকারে জামাতে হাশতম পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।

এরপর তার বিশিষ্ট ওস্তাদ মাওলানা আব্দুল মতিন সাহেব তাকে মীরসরাই জামালপুর মাদরাসায় ভর্তি করান। জামালপুর মাদরাসায় তিনি জামাতে দুউম (উচ্চ মাধ্যমিক) পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। উল্লেখ্য, জামালপুর মাদরাসায় জামাতে 'সুউম' পর্যন্ত ছিল; তার খাতিরে জামাতে 'দুউম' খোলা হয়েছিল। প্রতি পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করতেন। এমনকি তিনি জামাতে সুউমের (একাদশ শ্রেণি) বছর ইত্তেহাদুল মাদারিসিল কওমিয়া (বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড)-এ প্রথম স্থান অধিকার করেন।

তিনি জামাতে হাশতমের বছর থেকেই নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে অভ্যস্ত ছিলেন। জামাতে চাহারমের বছর স্বপ্নে দেখেন, কুতুবুল আলম ইমামে রব্বানি পটিয়ার হযরত মুফতি আজিজুল হক রহ. তাকে শায়খুল মাশায়েখ হযরত শাহ সুলতান আহমাদ নানুপুরী রহ.-এর হাতে তুলে দিচ্ছেন। এজন্য তিনি চাহারমের বছর নানুপুরী হযরতের হাতে বায়আত গ্রহণ করেন।

জামালপুর মাদরাসা থেকে বিদায় নিয়ে পটিয়া মাদরাসায় যাওয়ার সময় মুহতামিম সাহেবসহ সকল ছাত্র-শিক্ষক মাদরাসা থেকে দেড় মাইল দূরে 'চিনকি আস্তানা' নামক রেলস্টেশনে আসেন। স্টেশনে কান্নাকাটির রোল পড়ে যায়, যার কারণে রেলগাড়ি ছাড়তেও বিলম্ব হয়। তার একান্ত ওস্তাদ মাওলানা আব্দুল মতিন সাহেব তাকে পটিয়া মাদরাসায় ভর্তি করান। বোর্ডের পরীক্ষায় ১ম স্থান অধিকার করায় মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তার ভর্তি পরীক্ষা নেননি।

পটিয়া মাদরাসায় তিনি দু’বছর অধ্যয়ন করেন। প্রথম বছর ফুনুনাতে আলিয়া পড়েন। ফুনুনাতের কিতাব 'কাজি ও হামদুল্লাহ' পড়েছেন খতিবে আজম আল্লামা সিদ্দিক আহমদ রহ.-এর নিকট। তিনি কয়েক দিন পড়ানোর পর মুফতি সাহেবের যোগ্যতা অনুমান করতে পেরে বললেন, "তোমাকে আর পড়াতে হবে না। আগামীকাল থেকে তুমি কিতাব দেখে এসে অর্থসহ বলবে আর আমরা শুনব।" ওই বছরও সকল পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন।

তারপর জামাতে উলায় ভর্তি হন। মেশকাত শরিফ প্রথম খণ্ড পড়েছেন আল্লামা দানেশ রহ.-এর নিকট। তিনি মুফতি সাহেবকে তার অনুপম চরিত্রের জন্য খুবই ভালোবাসতেন এবং সবকে সামনেই বসাতেন। ঘটনাক্রমে একদিন তিনি পেছনে বসলে তাকে সামনে এনে বললেন, "তুমি সবসময় আমার সামনেই বসবে। কেননা তুমি সামনে না থাকলে আমার পড়ানোর স্পৃহা জাগে না।"

তিনি মেশকাত শরিফ তাকরার করতেন। আল্লামা দানেশ রহ. তার তাকরার শুনে বলতেন, 'আমার মনমতো যোগ্য আলেম দক্ষিণ দিকে একজনকে পাঠিয়েছি, পূর্ব দিকেও একজনকে পাঠিয়েছি; কিন্তু পশ্চিম দিকে পাঠানোর জন্য কাউকে খুঁজে পেলাম না। আশা করি আল্লাহ তাআলা তোমার দ্বারা আমার মনের আশা পূরণ করবেন।' এরপর তিনি ছাত্রদেরকে তাকে মুহাদ্দিস সাহেব বলার জন্য হুকুম করলেন এবং নিজেও ডাকতে লাগলেন।

হেদায়া তৃতীয় খণ্ড পড়েছেন মুফতি ইবরাহিম রহ.-এর নিকট। তিনি যেদিন সবক শুরু করলেন ওই দিন সকল ছাত্রদের থেকে ইবারত পড়া শুনে বললেন, "সাঈদ আহমদ! তুমিই সারা বছর ইবারত পড়বে।" তার কথামতো সারা বছর তিনিই ইবারত পড়েন।

তিনি হেদায়াও তাকরার করাতেন। জামাতের মধ্যে মোট তিনটি ফরিক বা দল ছিল। মুফতি সাহেব তাকরার শুরু করার পর তাকরারের সব ফরিক ভেঙে এক ফরিক হয়ে যায়। অন্য ফরিকে যারা তাকরার করাতেন তারাসহ সবাই তার তাকরার শোনার জন্য সমবেত হতো।

ফতোয়ার খেদমত:

নানুপুর মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ হওয়ার একদিন পর নানুপুরী হযরত রহ. ঘোষণা দিলেন, ‘আজ হতে আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করে মাদরাসায় দারুল ইফতা বা 'ফতোয়া বিভাগ' খোলা হলো এবং সাঈদ আহমদ সাহেবকে মুফতি বানানো হলো।' এরপর ছাত্রদের বলে দিলেন, 'তোমরা প্রয়োজনীয় মাসআলা তাকে জিজ্ঞেস করবে এবং সাধারণ মানুষকেও বলে দেবে।'

মুফতি সাহেব বললেন, তিনি কোনো ইফতা বিভাগে ভর্তি হননি এবং কারও কাছে ফতোয়া দেওয়াও শেখেননি। তারপরও যখন হযরতের যবানে ফতোয়া দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলো—তিনি বুঝতে পারলেন, এতে আল্লাহ পাকের কোনো রহস্য আছে এবং নিশ্চয় এতে তাঁর রহমত বর্ষিত হবে। তাই মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করে ফতোয়া লেখা আরম্ভ করলেন। ধীরে ধীরে তার মাধ্যমে ফতোয়া বিভাগের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন জায়গা থেকে বিজ্ঞ মুফতিয়ানে কেরাম তার নিকট ফতোয়া সত্যায়নের জন্য প্রেরণ করা আরম্ভ করলেন।

তিনি পাকিস্তানে কখনো যাননি, এতদসত্ত্বেও পাকিস্তানের মুফতি বোর্ডে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাকিস্তানের জামিয়া বানুরীর তৎকালীন প্রধান মুফতি কয়েকটি মাসআলা ও রেসালার সত্যায়ন এবং মন্তব্য লেখার জন্য তার নিকট প্রেরণ করেন। তার পক্ষ থেকে বিস্তারিত মন্তব্য লিখে পাঠানো হয়েছিল। সেখানকার মুফতিয়ানে কেরাম তা পছন্দ করেছেন এবং করাচির জামিয়া বানুরী থেকে প্রকাশিত 'জাওয়াহিরুল ফতোয়া' নামক বিরাট ফতোয়া গ্রন্থে তার কয়েকটি উত্তর স্থান পেয়েছে। আবুধাবির ওয়াকফ সচিব 'শায়খ বশির' মালেকী মাযহাবের অভিজ্ঞ আলেম; তিনি একবার মুফতি সাহেবের নিকট কয়েকটি প্রশ্ন পাঠান। উত্তর পেয়ে ওই সচিব যথেষ্ট আনন্দিত হন।

এরশাদ সরকারের আমলে মুফতি ওয়াক্কাস সাহেবকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে তার মধ্যস্থতায় বাংলাদেশের খ্যাতনামা মুফতিয়ানে কেরামের নিকট কয়েকটি প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। চট্টগ্রামে পাঠানো কপির উত্তরের দায়িত্ব দারুল উলুম পটিয়া, নানুপুর ও বাবুনগর মাদরাসার মুফতিগণের নিকট অর্পণ করা হয়েছিল। সবার লিখিত ফতোয়ার মধ্যে মুফতি সাহেবের লিখিত দীর্ঘ বায়ান্ন পৃষ্ঠার ফতোয়াটি বড় বড় উলামায়ে কেরাম ও মুফতিয়ানে কেরামের সর্বসম্মতিক্রমে শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। হযরত নানুপুরী রহ. ও পটিয়ার হাজি ইউনুস সাহেব রহ. ফতোয়ার কপিটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট এরশাদ ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মুফতি ওয়াক্কাসের বৈঠকে তাশরিফ নিয়েছিলেন। দেশ-বিদেশ থেকে পাঠানো প্রশ্নসমূহের জবাব দেওয়ার সাথে সাথে তিনি মাসিক আর-রশীদের ফতোয়া বিভাগের প্রশ্নসমূহের জবাবও লিখতেন।

আন্তর্জাতিক মুফতি সেমিনারে আমন্ত্রিত:

১৯৯১ ও ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের 'মাহমুদ' হলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুফতি সেমিনারের কমিটির পক্ষ থেকে তার নিকট বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। তার লিখিত ফতোয়া এখানকার সঞ্চালকদের নিকট পছন্দ ও বিশুদ্ধ হওয়ায় সাথে সাথে উপস্থিত সবার প্রশংসাও কুড়িয়েছিল।

বিভিন্ন মুফতি বোর্ডের সদস্য:

ঢাকাস্থ বাংলাদেশ মুফতি বোর্ডের শুরু লগ্ন থেকেই তাকে সদস্য বানানো হয় এবং ওই বোর্ডের দশ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতেও তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার পক্ষ থেকে 'আল বুহুসুল ইসলামি' নামক দশ সদস্যবিশিষ্ট ফতোয়া বোর্ডের জন্মলগ্ন থেকেই তাকে সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়।

নানুপুর মাদরাসায় থাকাকালীন তার ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ:

১. ফতোয়া বিভাগের প্রধান, ২. শিক্ষা পরিচালক, ৩. অধ্যাপনা, ৪. আঞ্জুমানে সুলতানিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব, ৫. মাসিক আর-রশীদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তা ছাড়া নানুপুরী হযরত রহ. তার দ্বারা বাইরের অনেক মাদরাসার তত্ত্বাবধান ও পরিদর্শনের কাজ আঞ্জাম দিতেন। কোনো কোনো মাদরাসার পুরো দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করেছিলেন। একাধিক মাদরাসার ভিত্তিও তার মাধ্যমে স্থাপন করেছিলেন। তিনি ফেনী লালপোল জামিয়া ইসলামিয়া সুলতানিয়া (মাদরাসা)-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও শায়খুল হাদিস ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু মাদরাসার পৃষ্ঠপোষকতা ও তত্ত্বাবধান করেছেন।

নানুপুরী রহ.-এর গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র লিখন:

নানুপুরী হযরত রহ. গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র তার মাধ্যমেই লিখতেন। অনেক খলিফার খেলাফতের চিঠি তার হাতেই লিখিয়েছেন। খলিফাদের নামের তালিকাভুক্ত খাতা একটি নিজের কাছে ও অন্যটি মুফতি সাহেবের নিকট রেখেছিলেন। নানুপুরী হযরতের ইন্তেকালের পর সমস্ত খলিফাদের নাম মাসিক আর-রশীদের মাধ্যমে তিনিই প্রকাশ করেন।

নানুপুর মাদরাসা থেকে বিদায়:

তিনি দীর্ঘ ১১ বছর নানুপুর মাদরাসায় অবস্থান করেন। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক, কর্তৃপক্ষ কারো পক্ষ থেকে তার ব্যাপারে কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। নানুপুরী হযরতজি রহ.-এর ইন্তেকালের পর ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে মুহতামিম হযরত মাওলানা জমিরুদ্দিন সাহেব রহ. তাকে বিদায় দিতে রাজি ছিলেন না; কিন্তু যেহেতু কুতুবুল আলম হযরতজি রহ. মুফতি সাহেবের ব্যাপারে হুকুম জারি করেছিলেন যে, 'আমার ইন্তেকালের পর তুমি ফেনী লালপোলস্থ সুলতানিয়া মাদরাসায় খেদমত করবে', তাই হযরতের নির্দেশনা মেনে ১৪২০ হিজরির শাবান মাসে তিনি নানুপুর মাদরাসা থেকে বিদায় নেন।

ফেনী লালপোল মাদরাসায় অবস্থান:

তিনি আখেরি হায়াত পর্যন্ত ফেনীর লালপোল মাদরাসায় অবস্থান করেছিলেন। নানুপুরী হযরত ফেনীর লালপুলে নিজে জায়গা খরিদ করে মাদরাসার ভিত্তি স্থাপন করেন। এরপর হুকুম জারি করলেন, 'আমি যতদিন বেঁচে থাকি তুমি নানুপুর মাদরাসা থেকে যেতে পারবে না; বরং যাতায়াতের মাধ্যমে উক্ত মাদরাসা পরিচালনা করবে। আমার ইন্তেকালের পর স্বয়ং সেখানে অবস্থান করে মাদরাসার খেদমত করে যাবে।' তাই নানুপুরী হযরত রহ.-এর ইন্তেকালের পর তার নির্দেশক্রমে নানুপুর মাদরাসা থেকে বিদায় নিয়ে তিনি ফেনী লালপোল সুলতানিয়া মাদরাসায় অবস্থান করে মাদরাসা পরিচালনা করতে থাকেন। তার অবস্থানের ফলে দ্রুতগতিতে মাদরাসার ছাত্রসংখ্যা বাড়তে থাকে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মাদরাসার সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদের আগমন ছিল বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো। বর্তমানে এটি একটি আদর্শ মাদরাসা।

মুনাযারায় অংশগ্রহণ:

ছোটবেলা থেকেই তার অন্তরে ছিল শিরক ও বিদআতের প্রতি ঘৃণা এবং হক ও সুন্নাতকে প্রতিষ্ঠিত করার ফিকির। এ কারণে ছাগলনাইয়া মাদরাসায় খেদমতকালে বিভিন্ন জায়গায় বিদআতিদের সাথে মাঠ পর্যায়ে মুনাযারা করেছেন। আল্লাহর রহমতে প্রত্যেক জায়গায় তিনি কামিয়াব হয়েছেন আর প্রতিপক্ষ হেরে গেছে। পটিয়া মাদরাসায় তাকে 'সাইয়েদুল মুনাযিরিন' উপাধি দেওয়াটাই প্রমাণ করে যে, বাস্তবিকই তিনি ছিলেন মুনাযারা জগতের কিংবদন্তি।

খাঁটি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ সংস্থা প্রতিষ্ঠা:

তার মধ্যে হক প্রচার ও বাতিল প্রতিরোধের জযবা ও স্পৃহা থাকার কারণে ছাগলনাইয়ায় থাকাকালীন উলামা বাজার, ঘাটঘর, ফুলগাজী মাদরাসাসমূহের অভিজ্ঞ উলামায়ে কেরামদের ডেকে 'খাঁটি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ পরিষদ' নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ওই সংস্থা থেকে সহিহ আকিদা ও আমল সম্পর্কীয় কয়েকটি দ্বীনি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। যেমন: ১. ওয়াহাবি কে? সুন্নি কে? ২. মাথা কামানোর ফতোয়া ও মাইকে শবিনা খতম, ৩. মুনাযারায়ে সোনাপুর ইত্যাদি।

ইসলাহি খেদমত:

নানুপুরী হযরত রহ.-এর আশা ছিল, মুফতি সাহেবের দ্বারা ব্যাপকভাবে মানুষ উপকৃত হবে। আল্লাহ তাআলা তার আশা পূরণ করেছেন। হাজার হাজার মানুষ তার হাতে বায়আত হয়ে আত্মশুদ্ধির পথ বেছে নিয়েছে। মাহে রমজান এলে তার সোহবতে থেকে আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে বড় বড় আলেম-উলামা থেকে নিয়ে বিভিন্ন স্তরের জনতা লালপোল সুলতানিয়া মাদরাসায় ইতেকাফ করার জন্য সমবেত হয়ে থাকেন।

কয়েকটি বিশেষ গুণ:

মুফতি সাহেব এমন এক ব্যক্তিত্ব যার মধ্যে বহুগুণের সমাবেশ ঘটেছে। তন্মধ্যে একটি হলো, সুন্নতে রাসূল-এর অনুসরণ। তার প্রতিটি কাজে রাসূল সা.-এর সুন্নতের অনুসরণ করতেন। তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, সময়ানুবর্তিতা। তিনি কখন কোন কাজ করবেন—এ ব্যাপারে পূর্ব থেকেই পরিকল্পনা থাকত। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি সব কাজ সময়মতো সম্পাদন করতেন।

তার আরেকটি বিশেষ গুণ হলো, সুষ্ঠু এন্তেজাম। তার সুষ্ঠু এন্তেজামের ফলে নানুপুর মাদরাসাটি পুষ্পের ন্যায় ফুটে উঠেছিল। লালপোল মাদরাসায় কদম রাখলেও মাদরাসার সুষ্ঠু এন্তেজাম দেখে অন্তরে শীতলতা অনুভব হয়।

মৃত্যু:

যুগের বিরল মনীষী মুফতি সাঈদ আহমদ সাহেব রহ. ২৩ এপ্রিল ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৫ শাবান রোজ সোমবার সকাল ৯:৪০ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। তার জানাজা লালপোল সুলতানিয়া মাদরাসার ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়। মরহুমের বড় পুত্র মাওলানা মুহাম্মদ তৈয়ব সুলতানী জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। মাদরাসা মসজিদের উত্তর পাশে তাকে দাফন করা হয়।

লেখক: তরুণ আলেম

আইও/