‘জুলাই সনদ’ অক্ষরের অক্ষরে বাস্তবায়নের ঘোষণা চিফ হুইপের
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:১৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে স্বাক্ষর হয়েছে, সেগুলো সবই বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য যেখানে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে, সেখানে সংবিধান সংশোধন করেই তা বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি বলেন, জুলাই সনদের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান একদম পরিষ্কার। আমরা দাড়ি, কমা, সেমিকোলনসহ যা কিছু স্বাক্ষর হয়েছে, তার সবটাই বাস্তবায়ন করব। বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধান সংশোধন ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে চিফ হুইপ এসব কথা বলেন। এ সময় হুইপ এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, মো. আখতারুজ্জামান মিয়া এবং এ.বি.এম আশরাফ উদ্দিন (নিজান) উপস্থিত ছিলেন।

চিফ হুইপ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে চায়। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সংবিধান প্রণীত হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে সংশোধনের নজির রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব এবং বর্তমান সরকারও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সে পথেই এগোতে চায়। 

তিনি বলেন, তৃতীয় অধিবেশন মাত্র নয়টি কর্মদিবস চলেছে। ২৭ আগস্ট অধিবেশন শুরু হয়ে ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। এ সময়ে ছয়টি বিল উত্থাপিত এবং ছয়টি বিল পাশ হয়েছে। সংসদের কার্যপ্রণালির বিভিন্ন বিধিতে নোটিশ ও আলোচনা হয়েছে। বিধি ৬৮-এ দুটি নোটিশের ওপর আলোচনা, বিধি ৭১-এ ১৪টি বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং দুই মিনিটের বক্তব্যের বিধিতে ১২৪টি নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে।

চিফ হুইপ জানান, প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার জন্য ১৪৪টি প্রশ্নের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টির উত্তর দিয়েছেন। মন্ত্রিসভার সদস্যরা সব মিলিয়ে ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৬৭৮টির উত্তর দিয়েছেন।

তিনি বলেন, তৃতীয় অধিবেশনে পাশ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলোর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর এবং সম্পত্তিতে আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংক্রান্ত আইন অন্যতম। এ আইন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চিফ হুইপ বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা সন্তানদের সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পর বৃদ্ধ বয়সে অসহায় হয়ে পড়েন এবং কেউ কেউ বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করতে বাধ্য হন। নতুন আইনের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগের অধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ আইন নিয়ে বিরোধিতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব ও সম্মান নিশ্চিত করার বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়। ধর্মীয় বিধানের কথা যারা বলছেন, তাদের প্রতি প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, বাবা-মাকে সম্মান ও সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও ধর্মীয় মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার-সংক্রান্ত আইন নিয়েও কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, এসব আইন প্রণয়নের আগে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, সংশ্লিষ্ট অংশীজন, আইনজীবী, বিচারক ও সাংবাদিকদের মতামত নেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার যাতে কোনোভাবেই লঙ্ঘিত না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আইনগুলোকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্দোলন বা লংমার্চ করে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন বছর সময় প্রয়োজন। এ কারণে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে সরকারকে সময় দিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

চিফ হুইপ বলেন, আগের সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন চুক্তি ও ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে না থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। বর্তমান সরকার এসব বিষয় পর্যালোচনা করছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রেও আগের সরকারের সময়ে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এসব বিষয়ে বর্তমান সরকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

কৃষি ও সার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের প্রথম দিকের সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে কৃষিঋণ ও কৃষক কার্ডের বিষয়টি রয়েছে। বিপুলসংখ্যক কৃষক পরিবার এ কর্মসূচির আওতায় উপকৃত হবে বলে তিনি জানান। 

দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে দাবি করে চিফ হুইপ বলেন, এখন আমাদের কাছে ১৬ লাখ মেট্রিক টন সার অতিরিক্ত আছে। সার ব্যবস্থাপনায় কিছু ত্রুটি থাকতে পারে। তবে সরকার কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দিতে কাজ করছে বলে জানান তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, বিদেশি ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ১০১টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে সরকার আলোচনা ও পর্যালোচনা করছে। এসব বিষয়ে দ্রুত ফল পাওয়া যাবে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে চুক্তিগুলোর আর্থিক দিকও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়। কোনো দেশকে শত্রু হিসেবে না দেখে সবাইকে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করা হলেও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। অন্য কমিটিগুলোতে দুজন করে বিরোধী দলের সদস্য রাখা হয়েছে।

চিফ হুইপ বলেন, অতীতে বিরোধী দলের সদস্যকে স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার নজির খুবই সীমিত। তবে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ওপর নজরদারি করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সভাপতি পদটি বিরোধী দলের সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে দেওয়া হয়েছে।

সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়েনি, বরং সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিরোধী দলের নেতা ভিন্ন একটি রাজনৈতিক বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিরোধী দলের লংমার্চ প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বলেছেন, লংমার্চ করে যদি বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা যেত, তাহলে সরকারই সবার আগে লংমার্চ করত।

চিফ হুইপ সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারের ভুল হলে সেটিও লিখতে হবে এবং সরকার সঠিক কাজ করলে সেটিও তুলে ধরতে হবে। 

তিনি বলেন, সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি থাকলে সাংবাদিকরা তা তুলে ধরবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

চিফ হুইপ বলেন, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ইচ্ছা করলে আইন পাস করতে পারে। তবে সরকার তা না করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চায়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন তিনি কোনো একটি দলের প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

দেশকে স্বাবলম্বী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বিরোধী দলসহ সবার সহযোগিতা চায় উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।

তিনি বলেন, আমরা সরকার এবং বিরোধীদল সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে এই দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে চাই। আমরা দেশকে স্বাবলম্বী করতে চাই। দেশের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে চাই। গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে চাই। এর জন্য যা করা দরকার আমরা তা করবো।

এসএইচ/