
|
কওমি মাদরাসা নিয়ে প্রচলিত ধারণা কতটা সত্য, গবেষণায় যা বললেন নৃবিজ্ঞানী
প্রকাশ:
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:২৮ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
নিজস্ব প্রতিবেদক কওমি মাদরাসাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কিংবা সরাসরি উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা রয়েছে। তবে এ ধরনের পূর্বধারণার বাইরে গিয়ে কওমি মাদরাসার শিক্ষা, সামাজিক ভূমিকা ও শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে বোঝা প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ের গবেষণা বলছে, কওমি মাদরাসা শুধু ধর্মীয় জ্ঞান দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; দীর্ঘ সময়ের শিক্ষা, অনুশীলন ও সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আচরণ ও জীবনবোধ গড়ে তোলার একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ নৃবিজ্ঞানী ড. নুরুল মোমেন ভূঁইয়া বলেন, কওমি মাদরাসাকে ‘সন্ত্রাসের প্রজননক্ষেত্র’ হিসেবে দেখার ধারণা অনেকটাই সরলীকৃত। তাঁর দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মাদরাসায় এনে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শে দীক্ষিত করে সন্ত্রাসী বানানোর এমন সরল প্রক্রিয়া তিনি দেখেননি। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পুরান ঢাকার শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজে আয়োজিত ‘ধর্মীয় সামাজিকীকরণে সময়, স্থান ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: একটি এথনোগ্রাফিক গবেষণা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি। কলেজের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ধারাবাহিক আয়োজন ‘কানেক্টিং অ্যানথ্রোপলজি’র তৃতীয় পর্ব হিসেবে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। নিজের গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ড. নুরুল মোমেন বলেন, ধর্মীয় সামাজিকীকরণ শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্দিষ্ট সময়, স্থান, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে একজন মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আচরণ গড়ে ওঠে। কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়ের শিক্ষা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তাঁদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় ও জীবনাচরণ গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ‘আদব’, ‘ইমান’ ও ‘আমল’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, কওমি মাদরাসায় আদব শুধু কোনো পাঠ্যবিষয় নয়; একজন শিক্ষার্থী কীভাবে কথা বলবে, চলাফেরা করবে, নিজের আচরণ ও শরীরী ভাষা নিয়ন্ত্রণ করবে—এসবের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি দৈনন্দিন আচরণের মধ্য দিয়েও শিক্ষার্থীদের পরিচয় নির্মিত হয়। ড. নুরুল মোমেন জানান, ২০০৭ সালে সিলেটের বিশ্বনাথের একটি কওমি মাদরাসায় বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১৫ মাস অবস্থান করে তিনি মাঠপর্যায়ে গবেষণা করেন। দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের পর প্রায় তিন বছর ধরে গবেষণাটির ওপর কাজ করেন তিনি। তাঁর মতে, নৃবিজ্ঞানের গবেষণায় কোনো প্রতিষ্ঠান বা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা নিয়ে মাঠে যাওয়া ঠিক নয়। মানুষের জীবনযাপন, আচরণ ও বাস্তবতার কাছাকাছি গিয়ে তা বোঝার চেষ্টা করতে হয়। কওমি মাদরাসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। স্থানীয় অর্থনীতি, দাতা, সামাজিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মাদরাসাগুলোর নানা ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যেও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে এসব প্রতিষ্ঠান টিকে আছে। ৯/১১, লন্ডনের ৭/৭ হামলা এবং বাংলাদেশে ২০০৫ সালের বোমা হামলার পর বিশ্বজুড়ে মাদরাসা নিয়ে আগ্রহ ও সন্দেহ বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন ড. নুরুল মোমেন। এর পর থেকে কওমি মাদরাসাশিক্ষাকে মূলধারায় আনার চাপও বেড়েছে। তবে তাঁর গবেষণার অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা করা মানেই কোনো শিক্ষার্থী উগ্রবাদী হয়ে ওঠার একটি সরল পথ তৈরি হয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং বিষয়টি বুঝতে হলে শিক্ষার্থীদের পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাজীবনের বাস্তবতা একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, কওমি মাদরাসা নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা দরকার। ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে স্থানীয় গবেষকদের আরও বেশি মাঠপর্যায়ের কাজ করা প্রয়োজন। সেমিনারে বক্তারা বলেন, দেশে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কওমি ও আলিয়া মাদরাসাসহ বিভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। এসব ধারার মধ্যে দূরত্বের কারণে একে অন্যের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজের অধ্যক্ষ ড. কাজী জুলফিকার আলী বলেন, ধর্মীয় শিক্ষায় যুক্ত মানুষের সঙ্গে সমাজের কিছুটা দূরত্ব রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে অনেকেই এই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করেছেন। তবে তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ আরমান হোসেন বলেন, কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক পরিসরে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে সমাজে তাঁদের প্রভাবও বাড়ছে। এ কারণে কওমি মাদরাসা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, ধর্ম ও ইসলাম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক ধারণা কীভাবে তৈরি ও ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও গবেষণার মাধ্যমে বোঝা প্রয়োজন। সেমিনারে বক্তারা বলেন, কওমি মাদরাসা সম্পর্কে পূর্বধারণার পরিবর্তে গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আলোচনা করা জরুরি। সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যকার দূরত্ব কমাতে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও মাঠভিত্তিক গবেষণার বিকল্প নেই। সেমিনারে কলেজের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কলেজের নৃবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. মাহ্ফুজ সরকার। আইও/ |