নেপালে ফের ৫ মাত্রার ভূমিকম্প
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৪৬ সকাল
নিউজ ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নেপালের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (এনসিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূপৃষ্ঠের ১৪৩ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পটির উপকেন্দ্র ছিল ২৯.০২২ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৩.৯৭৮ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল তুলনামূলকভাবে গভীরে হওয়ায় ভূপৃষ্ঠে এর প্রভাব সীমিত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টা ৩৮ মিনিটে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়।

তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের স্থাপনা ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এদিকে ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত নেপালে চলছে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান। গত মাসে ভোতে কোশি নদীর ভয়াবহ বন্যার পর এ অভিযান ১৪তম দিনে গড়িয়েছে।

নেপাল পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাত ৮টা পর্যন্ত দুর্যোগে ১ হাজার ৩৬৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৪ হাজার ৭৭৭ জন।

উদ্ধার করা মরদেহ ও দেহাবশেষের মধ্যে ৫৩৩ জন পুরুষ, ৩৩৯ জন নারী এবং ৫০২টির দেহের আংশিক অবশিষ্ট রয়েছে। এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা মরদেহের মধ্যে ১০২টি শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া মরদেহ সংরক্ষণের জন্য ফরেনসিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ১ হাজার ১৪৭টি মরদেহ মাটিতে সমাহিত করা হয়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে নেপালের নাগরিক ৩ হাজার ৪৬৯ জন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৯০৭ জন পুরুষ ও ৫৬২ জন নারী। এ ছাড়া ৩৫টি দেশের প্রায় ৬০০ বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬৯ জন পুরুষ এবং ৩২৯ জন নারী।

নেপাল পুলিশের নেতৃত্বে পরিচালিত উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ২৫৪ জনকে উদ্ধার অথবা আহত অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬ হাজার ৩৮০ জন পুরুষ, ২ হাজার ৮২৪ জন নারী এবং পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি এমন ৫০ জন রয়েছেন। এ ছাড়া বাস্তুচ্যুত ৩ হাজার ৩০ জনকে বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৬৯৮টি ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে মৃতদের ১ হাজার ২৮৬টি এবং নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের সদস্যদের ১ হাজার ৪১২টি নমুনা রয়েছে। পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি এমন ১ হাজার ৩১০ জনের প্রোফাইল ও ছবি সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে স্বজনেরা তাদের শনাক্ত করতে পারেন।

উদ্ধার তৎপরতায় নেপাল পুলিশের ৭ হাজার ৯৭৫ জন সদস্য মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। দুর্যোগে পুলিশের ৬৫ জন সদস্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ২৫ জন এখনো যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করতে পুলিশ ১৫৮টি কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। এসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন ৪৩ হাজার ৯৪৩ জন।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মঙ্গলবার দুপুর ২টার এক বিবৃতিতে বলা হয়, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৫টি দেশের প্রায় ৬০০ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।

বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও উদ্ধারকারীরা এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৫৮৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। তাদের মধ্যে ৩০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক। গত পাঁচ দিনে ধ্বংসস্তূপ থেকে চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন নেপালি নাগরিককে ৪ সেপ্টেম্বর আপার ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেল থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া আপার ত্রিশূলি-১ টানেল থেকে একজন চীনা নাগরিক এবং ৫ সেপ্টেম্বর বেত্রাবতীর একটি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি থেকে একজন নেপালি নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

মাইলুং খোলা, আপার ত্রিশূলি-১, ৩এ ও ৩বি, চিলিমে, রাসুওয়াগাড়ি এবং লাংটাংসহ ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে এখনো জটিল উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

উদ্ধারকাজে নেপালের সঙ্গে ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষায়িত টানেল উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। নেপালি সেনাবাহিনীর পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, মালয়েশিয়ার স্মার্ট দল এবং অস্ট্রেলিয়ার ডার্ট দলও উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছে।

উদ্ধারকারী দলগুলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে আকাশপথে ড্রোন, ভারী খননযন্ত্র এবং পানির নিচে চলাচলকারী ড্রোন ব্যবহার করছে। এদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদারে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিআরআরএমএ) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিশেষায়িত সরঞ্জাম চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন, লিডার ব্যবস্থা, অস্থায়ী বেইলি সেতু, পানির নিচে চলাচলকারী ড্রোন, বহনযোগ্য জেনারেটর, পানি নিষ্কাশন পাম্প, পরীক্ষাগারের ফ্রিজার, মহামারি প্রতিরোধের সরঞ্জাম এবং দ্রুত ডিএনএ পরীক্ষার কিট।

সরকার দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি ও প্রয়োজন নিরূপণ প্রতিবেদন (আরডিএনএ) প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন ব্যয় নিরূপণে পোস্ট ডিজাস্টার নিডস অ্যাসেসমেন্ট (পিডিএনএ) পরিচালনা করা হচ্ছে। দেশি-বিদেশি সহায়তা প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হচ্ছে।

এনডিআরআরএমএর সন্ধ্যা ৭টার তথ্য অনুযায়ী, রাসুওয়া ও নুওয়াকোট জেলার ৩৪টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ৩ হাজার ৩২৮ জন বাস্তুচ্যুত মানুষ অবস্থান করছেন। ১৭৫ জন স্বাস্থ্যকর্মীর সমন্বয়ে গঠিত ৩৮টি জরুরি চিকিৎসা দল এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৭২২ জনের বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে। মানসিক সহায়তা ও কাউন্সেলিং দেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষকে।

এদিকে ভূমিধসে কিমরুং নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নয়াপুল ও বিরেথান্থি এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করে উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নিহতের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ফরেনসিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় ধাপ শেষ করে উদ্ধার করা মরদেহগুলো সাময়িকভাবে মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে। পরিচয় শনাক্তে ভারত, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা নেপালের স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করছেন।

নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজছেন এমন পরিবারগুলোকে কাঠমান্ডুর মহারাজগঞ্জে নেপাল পুলিশ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে অথবা সরকারি ওয়েবসাইটে ইলেকট্রনিকভাবে ডিএনএ প্রোফাইল জমা দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে নেপালে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত নবীন শ্রীবাস্তব জানিয়েছেন, চিলিমে টানেল থেকে ধ্বংসাবশেষ ও কাদা সরাতে ভারত ও নেপালের দলগুলো যৌথভাবে কাজ করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, চিলিমে টানেল উদ্ধার অভিযানে ভারত ও নেপালের দলগুলো ধ্বংসাবশেষ ও কাদা সরিয়ে টানেলটি পরিষ্কার করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ঢালু টানেলের কারণে সৃষ্ট সমস্যা মোকাবিলায় ভেতরে চলাচল সহজ করতে এইচডিপিই পাইপ স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সিয়াফ্রুবেশি থেকে টানেলের প্রবেশমুখ পর্যন্ত একটি অস্থায়ী সড়ক তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে।

আইও/