
|
ট্রাম্পের ভুল যেন পাকিস্তান না করে
প্রকাশ:
০৮ জুলাই, ২০২৬, ০৩:২৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| হামিদ মীর || কথা ও কাজের অমিল এখন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অমিলগুলোর সঙ্গে বেঁচে থাকাটাই এখন প্রজ্ঞা ও বিবেচনার দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অমিলগুলো ধরিয়ে দেওয়া এখন বোকামি ও ধৃষ্টতা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এমন একটি ধৃষ্টতাপূর্ণ প্রশ্ন আমাকেও করা হয়েছিল। এই ধৃষ্টতাপূর্ণ প্রশ্নের কোনো জবাব আমার কাছে ছিল না। প্রশ্নটি এমন একজন নারী করেছিলেন, যিনি মানবাধিকার কর্মী হিসেবে সুপরিচিত এবং প্রতিটি শাসনামলেই কারাবরণ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। ওই নারীর কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্ক নেই। তিনি শুধু পাকিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করেন না, বরং তাকে ফিলিস্তিন ও কাশ্মীরের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করতে দেখেছি। সেই নারীর নাম তাহিরা আবদুল্লাহ। তাহিরা আপা আমাকে একটি ছবি পাঠিয়েছেন, যেখানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তার প্রতিনিধি দলসহ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যে অংশ নিচ্ছেন এবং তার জন্য দোয়া করছেন। ছবির নিচে তাহিরা আপা লিখেছেন, যার জন্য দোয়া করছেন, তার হত্যাকারীর জন্য তিনি বিশ্ব থেকে নোবেল শান্তি পুরস্কারও চাইছেন। প্রথমে ভেবেছিলাম তাহিরা আপাকে জবাব দেব যে, যখন ইরানের সরকারেরই কোনো আপত্তি নেই, তখন আপনি কে আপত্তি করার? তারপর থেমে গেলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, তাহিরা আপা বলবেন যে, আমি পাকিস্তানের সরকারের প্রতিনিধি নই, আমি জনগণের মুখপাত্র; আমাকে আমার প্রশ্নের জবাব চাই। আমি চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলাম, কারণ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যে আফগান তালেবানদেরও ডাকা হয়েছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকারী গ্রুপকেও ডাকা হয়েছিল। আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শাহাদাতের পর আলি খামেনি বিশ্বে প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তার শেষকৃত্যে কোটি মানুষের অংশগ্রহণ বিশ্বকে এই বার্তাই দিয়েছে যে, ইরানের সাথে শান্তি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ইরানি জাতি যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত এবং শান্তির জন্যও প্রস্তুত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান আর কতদিন ইরান ও আমেরিকার সাথে চলতে পারবে? এখন পাকিস্তানে এই প্রশ্নটি সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, যদি আমরা ইরান ও আমেরিকার মধ্যে আলোচনা করাতে পারি, তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অনেক সংকট কেন আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছি না? ঠিক গতকালই (৫ জুলাই) আজাদ কাশ্মীর থেকে আসা কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তি আমার সাথে দেখা করতে এলেন। তাদের মধ্যে মুসলিম লীগ (ন)-এর একজন নেতা এবং সাবেক মন্ত্রীও ছিলেন, যার নিজের বাড়ি পুঞ্চে। তিনি জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটির বিরোধী ছিলেন, কিন্তু বারবার বলছিলেন যে, জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটিকে ভারতীয় দালাল বলাটা একেবারেই ভুল। এই কমিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাধারণ কাশ্মীরিদের কাছে ভালো বার্তা দেয়নি। যদি আমরা ইরান ও আমেরিকার মধ্যে আলোচনা করাতে পারি, তবে আজাদ কাশ্মীরের সমস্যা কেন আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারি না? এই প্রতিনিধি দলে একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাও ছিলেন। তিনিও জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটির বিরুদ্ধে ছিলেন, কিন্তু এই কমিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে আলোচনা শুরুর পক্ষে ছিলেন। আমাদের শাসকরা ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতাকে বড় কোনো কূটনৈতিক সাফল্য মনে করছেন, কিন্তু এই সাফল্য তারা আজাদ কাশ্মীর, খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে কেন পাচ্ছেন না? হয় আমরা বৈশ্বিক পর্যায়ে শান্তি আলোচনার কৃতিত্ব নেওয়া কমিয়ে দিই, নয়তো পাকিস্তানের ভেতরেও এমন শান্তি আলোচনা শুরু করি। আমাদের কথা ও কাজের অমিল সাধারণ পাকিস্তানিদের কাছে খুব বেশিদিন গ্রহণযোগ্য থাকবে না। আজাদ কাশ্মীরে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। নির্বাচনি প্রচার শুরু হয়ে গেছে এবং এই প্রচারে মুসলিম লীগ (ন)-এর প্রার্থীদের জন্য অনেক সংকট রয়েছে। পিপিপি এই সংকটগুলো থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে এবং সরদার তানভীর ইলিয়াস থেকে মুক্তি পেয়ে তারা নিজেদের বেশ হালকা বোধ করছে। সরদার তানভীর ইলিয়াস পিটিআই আমলে আজাদ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ইমরান খানের সরকার পতনের পর তারও ছুটি হয়ে যায় এবং তিনি পিপিপির ছায়ায় আশ্রয় নেন। নির্বাচন কাছে আসতেই টিকিটের ঝগড়ায় তিনি পিপিপি ছেড়ে ইস্তেখামে পাকিস্তান পার্টিতে চলে যান। এই আশ্রয়স্থলটি তার জন্য বেশি নিরাপদ। তিনি সেই রাজনীতিবিদদের একজন, যারা ভোট পাওয়ার জন্য ভোটারের কাছে যাওয়া জরুরি মনে করেন না, বরং এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন যে ভোটাররাই নিজে তার কাছে এসে ভালোবাসা উসুল করে নেয়। আজাদ কাশ্মীরের ভোটার কি এবার তার কাছে কিছু উসুল করতে আসবে? আজাদ কাশ্মীরে মার্কেট, রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া কোনো সমস্যার সমাধান নয়। এখন অ্যাকশন কমিটি পেছনে পড়ে গেছে, জনগণ এগিয়ে গেছে। আসন্ন নির্বাচনে নিজের পছন্দের ফলাফল পাওয়া খুব কঠিন নয়, কিন্তু পছন্দের ফলাফল দিয়ে পরিস্থিতি ভালো হবে না। এখন পর্যন্ত আজাদ কাশ্মীরের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পাকিস্তানের সাথেই আছে। তাদের লড়াই পাকিস্তানের সাথে নয়, বরং সেই সিস্টেমের সাথে যা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সিস্টেমটি তাদের সাথে ক্ষমতার ভাষায় কথা বলছে। যারা সিস্টেম চালাচ্ছেন, তারা আপাতত জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটির সাথে আলোচনা না করলেও সমস্যা নেই, তারা আজাদ কাশ্মীরে মুসলিম লীগ (ন)-এর নেতৃত্ব ও নির্বাচনী প্রার্থীদের ডেকে তাদের জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে কী করা উচিত। আজ না হোক কাল, আপনাকে তো আলোচনার টেবিলে বসতেই হবে। কিন্তু আল্লাহ না করুন, সেই আলোচনায় আপনার অবস্থান যেন ট্রাম্পের মতো না হয়। ট্রাম্প একটি সুপারপাওয়ারের প্রেসিডেন্ট, কিন্তু ইরানের সাথে আলোচনার পর ট্রাম্পের দাপট শেষ হয়ে গেছে। ট্রাম্প ইসরায়েলের সাথে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে শক্তির ব্যাপক ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু সেই শক্তি তার কোনো কাজে আসেনি। ইরানি জনগণের ঐক্য সুপারপাওয়ারের অহংকার ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। ট্রাম্প পাকিস্তানের মাধ্যমে আলোচনা শুরু করেছিলেন এবং এখন ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমেই ইরানের সাথে তার বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করছেন। কেউ মানুক বা না মানুক, এই আলোচনায় ইরানকেই শক্তিশালী অবস্থানে দেখা যাচ্ছে। যদি ট্রাম্প গত বছর যুদ্ধ ছাড়াই আলোচনা সফল করার চেষ্টা করতেন, তবে হয়তো ইরান তা অর্জন করতে পারতো না যা সে যুদ্ধের পর পাচ্ছে। এই আলোচনায় ট্রাম্পকে বিজয়ী দেখা যেত, যুদ্ধের পর ইরানকে বিজয়ী দেখা যাচ্ছে। শুধু এটুকুই বলার যে, ট্রাম্প হবেন না। ট্রাম্প অনেক শক্তিশালী কিন্তু রাজনৈতিকভাবে দুর্বল এবং অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছেন। যখন ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকবেন না, তখন ইতিহাসে এটাই লেখা থাকবে যে তিনি যুদ্ধেও হেরেছেন এবং আলোচনাতেও হেরেছেন। আমি তাহিরা আপার পাঠানো ছবিতে শাহবাজ শরিফের আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিদের মধ্য থেকে দুজনকে সেই প্রশ্নটি পাঠিয়েছিলাম যা তাহিরা আপা আমাকে করেছিলেন। এই লেখা পর্যন্ত তাদের কেউ কোনো জবাব দেয়নি। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে একবার নয়, দুইবার যুদ্ধ বাঁধিয়েছেন কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমেই পরিত্রাণ খুঁজছেন। আজাদ কাশ্মীর ও ইরানের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে, কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ায় কোনো ক্ষতি নেই। আজাদ কাশ্মীরে নিজেদের লোকজনের বিরুদ্ধে বড় কোনো যুদ্ধ শুরু করার আগে আলোচনার পথ বেছে নেওয়াই শ্রেয়। [পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক হামিদ মীরের এই লেখাটি রোজনামায়ে জং থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন: সাইমুম রিদা] আওয়ার ইসলাম/জেডএম |