ঢাকায় হচ্ছে আরও দুই মেট্রোরেল, বাড়তি ব্যয় কমানোর নির্দেশ
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৫৩ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে আরও দুটি মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে প্রকল্পের ব্যয় বেশি হওয়ায় বাড়তি ব্যয় কমানোর নির্দেশ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্প থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প থেকে ৮০০ কোটি টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

রোববার (৩০ আগস্ট) দুই প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্প দুটির ব্যয় বৃদ্ধির বিভিন্ন কারণ নিয়ে আলোচনা হয়। পরে ব্যয় আরও যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সংশোধিত প্রস্তাব দুটি ফেরত পাঠানো হয়। ব্যয়ের বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করতে একটি কমিটিও গঠন করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও যানজট কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯ সালে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প নেওয়া হয়। তখন প্রকল্প দুটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এখন সংশোধিত প্রস্তাবে মোট ব্যয় ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা করার আবেদন করা হয়েছে। এতে মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা করার আবেদন করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সভায় এই প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পাতালপথে মেট্রোরেল নির্মাণ হবে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের আওতায়। নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল অংশে থাকবে উড়ালপথ। প্রকল্পটির মোট দৈর্ঘ্য ৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার। এতে ২১টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রকল্প অনুমোদনের সময় ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

তবে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগে প্রকল্পটির অগ্রগতি রয়েছে খুবই কম। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। একই সময়ে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৯০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা সংশোধিত প্রস্তাবিত মোট ব্যয়ের ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ।

অন্যদিকে সাভার থেকে গাবতলী, মিরপুর, গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পে উড়াল ও পাতালপথ থাকবে। এতে ১৪টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে তা প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা করার আবেদন করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পিইসি সভায় প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্প থেকেও ৮০০ কোটি টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

প্রকল্প দুটির ব্যয় বাড়ানোর পেছনে বিস্তারিত নকশায় পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন, কর-ভ্যাট, ভূমি অধিগ্রহণ, সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর, পরামর্শক ব্যয় এবং নির্মাণকালীন সুদসহ বিভিন্ন কারণ দেখানো হয়েছে। ২০১৯ সালে ডলারের দাম প্রায় ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে ডলারের দর বেড়ে যাওয়ায় বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামগ্রীর ব্যয় বেড়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

তবে এসব কারণ দেখিয়ে প্রকল্প দুটির ব্যয় এতটা বাড়ানো কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মেট্রোরেল প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কম থাকার বিষয়টিও সভায় আলোচনায় এসেছে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, জাইকার বিভিন্ন শর্তের কারণে দরপত্রে মূলত জাপানি প্রতিষ্ঠান অথবা তাদের যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এতে দরপত্রে প্রতিযোগিতা কমেছে এবং ঠিকাদারদের দর কমানোর সুযোগও সীমিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এর আগে প্রকল্প দুটির ব্যয় কমানোর বিষয়ে মতামত দিতে গত ২৪ মে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। গত জুলাইয়ে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে কমিটি মূল প্রকল্প প্রস্তাবের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি ব্যয়কেও যৌক্তিক বলে মত দিয়েছিল। এরপর ডিএমটিসিএল সংশোধিত ব্যয়ের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়।

এবার প্রকল্প দুটির ব্যয় আরও পর্যালোচনা ও যৌক্তিকীকরণের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সড়ক পরিবহন উইংয়ের প্রধান অতিরিক্ত সচিব আলী রেজা সিদ্দিকীকে প্রধান করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে প্রকল্পের বিভিন্ন ব্যয় খাত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত ব্যয় নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার যানজট কমাতে মেট্রোরেল প্রকল্প দুটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি নেই। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং মূল প্রাক্কলনের তুলনায় বিপুল ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সংশোধিত প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নতুন কমিটির পর্যালোচনার পর প্রকল্প দুটির চূড়ান্ত ব্যয় কত দাঁড়াবে, তা নির্ধারণ হবে।

আইও/