গোপনে দাওয়াত, নতুন আলোর যাত্রা
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:২১ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

রাতের খাবার শেষ। উঠোনে মাদুর পেতে নাতি-নাতনিরা গোল হয়ে বসে আছে গল্প শোনার জন্য। আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছে। কেউ কেউ সেগুলো নিয়ে কথা বলছে।

দাদা পান চিবাতে চিবাতে এসে মুচকি হেসে বললেন, আচ্ছা বলো তো, বড় বড় গাছ কি একদিনেই বিশাল হয়ে যায়?

সবাই একসঙ্গে বলল, না দাদা! ছোট্ট চারা থেকেই তো বড় হয়।

দাদা মাথা নেড়ে বললেন, ঠিক তাই। ইসলামের ইতিহাসও শুরু হয়েছিল একটি ছোট্ট চারার মতো। কিন্তু সেই চারাই একদিন সারা পৃথিবীকে ছায়া দিয়েছিল। এখনো দিচ্ছে।

হেরা গুহা থেকে ফিরে আসলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তাঁর হৃদয়ে নেমেছে আল্লাহর বাণী। তখনো মক্কার মানুষ সেই মহান সংবাদ জানত না।

চারদিকে চলছিল মূর্তিপূজা, অন্যায়, কুসংস্কার আর গোত্রের অহংকার। এমন পরিবেশে যদি তিনি সঙ্গে সঙ্গেই সবাইকে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাতেন, তাহলে নতুন মুসলিমদের জীবন ভীষণ বিপদের মুখে পড়ত। তাই আল্লাহর নির্দেশে শুরু হলো নীরব এক বিপ্লব— গোপনে দাওয়াতের যাত্রা।

দাদা একটু থামলেন। তারপর বললেন, জানো, সবার আগে কে নবীজির কথায় বিশ্বাস করেছিলেন?

এক নাতি বলল, খাদিজা (রা.)?

দাদা হেসে বললেন, হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ। সর্বপ্রথম ঈমান আনলেন তাঁর প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.)। তারপর ইসলাম গ্রহণ করলেন মুক্তদাস যায়েদ ইবন হারিসা (রা.), চাচাতো ভাই আলী ইবন আবি তালিব (রা.) এবং প্রিয় বন্ধু আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তাঁরা কেউ দ্বিধা করেননি। সত্য চিনেই আন্তরিকভাবে তা গ্রহণ করেছিলেন।

এরপর দাদা আবু বকর (রা.)-এর কথা বলতে শুরু করলেন।

আবু বকর (রা.) শুধু নিজে ঈমান এনেই থেমে থাকেননি। তিনি তাঁর বন্ধুদেরও সত্যের পথে ডেকেছিলেন। তাঁর আহ্বানে ইসলাম গ্রহণ করেন উসমান ইবনে আফফান (রা.), আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.), যুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.), সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) এবং তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)। এভাবেই ছোট্ট ঈমানের কাফেলা ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল।

তখন মুসলিমরা প্রকাশ্যে ইবাদত করতে পারতেন না। কখনো নির্জন পাহাড়ে, কখনো বিশ্বস্ত কোনো সাহাবির ঘরে একত্র হতেন। সেখানে কুরআনের নতুন নাজিল হওয়া আয়াত শিখতেন, নামাজ আদায় করতেন এবং আল্লাহর স্মরণে নিজেদের হৃদয়কে শক্ত করতেন। সংখ্যা ছিল অল্প, কিন্তু ঈমান ছিল পাহাড়ের মতো দৃঢ়।

কিছুদিন পর সাফা পাহাড়ের কাছে আরকাম ইবনে আবিল আরকাম (রা.)-এর ছোট্ট বাড়িটি ইসলামের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হলো। নবীজি (সা.) সেখানে সাহাবিদের কুরআন শিক্ষা দিতেন, ধৈর্যের শিক্ষা দিতেন, সত্যবাদিতা শেখাতেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করতে উদ্বুদ্ধ করতেন। সেই ছোট্ট ঘরেই গড়ে উঠেছিল এমন একদল মানুষ, যারা পরবর্তীতে ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন।

প্রায় তিন বছর এভাবেই গোপনে দাওয়াত চলল। মুসলিমদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু তাঁদের ঈমান, চরিত্র আর ধৈর্য দিন দিন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। তাঁরা জানতেন— সত্যের পথে কষ্ট আসবে, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কোনো পুরস্কার নেই।

দাদা গল্প শেষ করে নাতিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখো, জীবনের বড় পরিবর্তন সব সময় বড় আয়োজন দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কয়েকটি আন্তরিক হৃদয়, অটল বিশ্বাস আর আল্লাহর ওপর ভরসাই ইতিহাস বদলে দেয়। তাই ভালো কাজ ছোট মনে করে কখনো অবহেলা করবে না।

গল্প শেষ করে দাদা ওঠে পড়লেন। সাথে নাতি-নাতনিরাও ওঠে গেল। আগামীকালের গল্পের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ১০)

লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী

চলবে....

 

আইও/