
|
ইলমের হেফাজতে এক নিভৃতচারী ব্যক্তিত্ব
প্রকাশ:
২৩ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৮ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
IIতানভীরুল ইসলাম শিহাবII উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য যখন উপনিবেশবাদের পতাকা নিয়ে প্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হয়েছিল, তখন তার সাথে সাথে এসেছিল আরেকটি অস্ত্র।কলম ও গবেষণাগারের অস্ত্র। এই অস্ত্রের নাম ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদ। উইলিয়াম মূর, ডি. এস. মারগোলিউথ, মন্টগোমারি ওয়াট প্রমুখ যে ধারার জন্ম দিয়েছিলেন, তার লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবন, চরিত্র ও রিসালাতকে ঐতিহাসিকতার মোড়কে মুড়ে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো, কুরআনকে মানবরচিত গ্রন্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালানো, এবং মুসলিম সভ্যতার আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেওয়া। এডওয়ার্ড সাইদ তাঁর বিখ্যাত Orientalism গ্রন্থে এই প্রকল্পের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কাঠামো উন্মোচন করলেও, ইসলামের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে,কুরআন, সিরাত ও ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলের নিরিখে এই আগ্রাসনের বৈজ্ঞানিক ও তাহকিকি জবাব প্রয়োজন ছিল। সেই জবাব যাঁরা দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে সুসংহত, প্রামাণ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কাজটি করেছেন বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক ড. মুহাম্মদ মোহর আলী(জন্ম :১৯২৯, মৃত্যু: ২০০৭)। জীবনের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা: পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং জেসোর, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর বিভিন্ন সরকারি কলেজে ইতিহাস অধ্যাপনা করেন। এই পর্বেই তিনি তাঁর প্রথম কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে যখন তিনি লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (SOAS)এ পিএইচডি করতে যান এবং সাথে সাথে লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারিও সম্পন্ন করেন। এই দ্বৈত প্রশিক্ষণ,পাশ্চাত্যের আধুনিক ঐতিহাসিক-গবেষণা পদ্ধতি এবং আইনশাস্ত্রের যুক্তি-প্রমাণ-নির্ভর কাঠামো তাঁকে এমন এক ইলমি অস্ত্রে সজ্জিত করে, যা পরবর্তীতে ওরিয়েন্টালিস্টদের নিজস্ব মাঠেই তাঁদের পরাস্ত করার সামর্থ্য দেয়। এখানেই তাঁর কাজের অনন্যতা নিহিত।তিনি পাশ্চাত্যের নিজস্ব একাডেমিক মানদণ্ড, সূত্র-সমালোচনা (source criticism) ও দলিলনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহার করেই তাদের দাবিগুলোর ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করেছেন। দেশভাগ-পরবর্তী রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে দুঃসহ এক অধ্যায় পার হয়ে তিনি অবশেষে সৌদি আরবে পাড়ি জমান, যেখানে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক তিনি রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ও মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনা করেন এবং পবিত্র কুরআন মুদ্রণের বাদশাহ ফাহাদ কমপ্লেক্সে গবেষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চার দশকেরও বেশি বিস্তৃত এই শিক্ষকতা জীবনের ফসল হিসেবেই জন্ম নেয় তাঁর কালজয়ী রচনাসমূহ। ২০০০ সালে তিনি ইসলামি অধ্যয়নে কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।একমাত্র বাঙালি হিসেবে এই সম্মান অর্জনের গৌরব তাঁরই প্রাপ্য থেকে যায়। তাহকিকি রচনাবলি: তাঁর দ্বিতীয় মৌলিক অবদান এর বাইরেও রয়েছে 'History of the Muslims of Bengal' (৪ খণ্ড)বাংলার মুসলিম ইতিহাসের উপর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ,গ্রন্থটি বাংলায় ইসলামের বিস্তার, বাঙালি মুসলিম সমাজের সংগ্রাম এবং স্থাপত্য-সাহিত্যে ইসলামি প্রভাব বিষয়ে এক প্রামাণিক দলিল হিসেবে স্বীকৃত। 'The Bengali Reaction to Christian Missionary Activities' (পিএইচডি থিসিস)যা খ্রিস্টান মিশনারি কার্যক্রমের ওপর এক গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা। প্রশ্ন উঠতে পারে এই যে গভীর ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি, যুক্তির কাঠোর শৃঙ্খলা এবং প্রাচ্যবাদ খন্ডনের যে মেজাজ তিনি প্রদর্শন করেছেন, তার উৎস কোথায়? এর উত্তর নিহিত তাঁর জীবনের দ্বৈত শিক্ষাক্রমে। একদিকে হুগলী মাদরাসার ইলমি পরিবেশ তাঁকে দিয়েছে দ্বীনি চেতনা ও উম্মাহর প্রতি দায়বদ্ধতার বোধ। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সোয়াসের একাডেমিক প্রশিক্ষণ তাঁকে দিয়েছে আধুনিক ঐতিহাসিক পদ্ধতিবিজ্ঞান, সূত্র-সমালোচনার কৌশল এবং আইনি যুক্তির নিখুঁত বিন্যাস। এই দুই ধারার সংগমেই জন্ম নিয়েছে এমন এক তাহকিকি মানহাজ, যা দলিল দিয়ে দলিলের জবাব দেয়, তত্ত্ব দিয়ে তত্ত্বের খন্ডন করে। এখানেই নিহিত রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা: একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রাচ্যবাদের রূপ বদলেছে বটে, কিন্তু তার মূল লক্ষ্য অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। ইন্টারনেট, একাডেমিক জার্নাল ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে নব্য-প্রাচ্যবাদী বয়ান আরও দ্রুতগতিতে, আরও সূক্ষ্মভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায় দেওবন্দী ও উপমহাদেশীয় আলিম-দার্শনিক মহলের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে,কেবল প্রথাগত ইলমে দ্বীনের চর্চায় সীমাবদ্ধ না থেকে, পাশ্চাত্যের একাডেমিক ভাষা ও পদ্ধতিও রপ্ত করা। ড. মোহর আলীর জীবন ও কর্ম আমাদের সামনে একটি রোডম্যাপ উপস্থাপন করে।কীভাবে ইলমে দ্বীন ও আধুনিক গবেষণা-পদ্ধতির মেলবন্ধনে এমন তাহকিকি কাজ সম্ভব, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে টিকে থাকতে পারে এবং উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মরক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। আমাদের মাদরাসা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই ধরনের তাহকিকি চর্চাকে পাঠ্যক্রমের অংশ করা, তরুণ প্রজন্মকে আরবি-উর্দু-ফারসির পাশাপাশি ইংরেজি একাডেমিক লেখনী ও গবেষণা-পদ্ধতিতে দক্ষ করে তোলা,এটিই এখন সময়ের দাবি। ড. মোহর আলী যেভাবে একাধারে ফকিহ-দার্শনিকের মতো গভীরতা এবং ঐতিহাসিক-গবেষকের মতো নির্মোহ যুক্তিবাদিতা প্রদর্শন করেছেন, তা আমাদের প্রজন্মের জন্য একটি অনুকরণীয় আদর্শ (উসওয়া) হয়ে থাকতে পারে। ড. মুহাম্মদ মোহর আলী ছিলেন এক নিভৃতচারী ইলমি মুজাহিদ, যিনি কলমের যুদ্ধে প্রাচ্যবাদের দুর্গ ভেঙেছেন নিরেট তাহকিক ও প্রমাণনির্ভর যুক্তি দিয়ে। বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নিয়েও তিনি বিশ্বজনীন স্বীকৃতি অর্জন করেছেন, এবং তাঁর রচনাবলি আজও সিরাত ও কুরআনিক স্টাডিজের অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্য এক অবিচ্ছেদ্য সম্পদ। তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতি গভীর মনোযোগ ও অধ্যয়ন আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে, ইনশাআল্লাহ। এমএন/ |