ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বিটকয়েন: পরিচিতি ও শরয়ি বিশ্লেষণ
প্রকাশ: ২২ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:৪২ রাত
নিউজ ডেস্ক

|| আফফান হুসাইন ||

ক্রিপ্টো (Crypto) শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ক্রিপ্টোস (kryptós) থেকে। অর্থ—গোপন। কারেন্সি (Currency) মানে মুদ্রা। সুতরাং ক্রিপ্টোকারেন্সির আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায়—গোপন মুদ্রা।

ক্রিপ্টোকারেন্সি (Cryptocurrency) হলো এমন একধরনের ভার্চুয়াল বা ডিজিটাল মুদ্রা যা নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করতে ক্রিপ্টোগ্রাফি (Cryptography) ও ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এটি কোনো কাগজের নোট বা ধাতব মুদ্রা নয়; বরং ইন্টারনেটভিত্তিক একটি অর্থব্যবস্থা।

অনেকে মনে করে থাকে ক্রিপ্টোকারেন্সি মানেই বিটকয়েন, অথচ এই ধারণাটি সম্পূর্ণ অমূলক। কারণ, প্রত্যেক বিটকয়েন ক্রিপ্টোকারেন্সির অন্তর্ভুক্ত হলেও প্রত্যেক ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন নয়; বরং ক্রিপ্টোকারেন্সির আরও অনেক প্রকার রয়েছে। যেমন—ইথেরিয়াম, সোলানা, ইউএসডিটি ইত্যাদি। তবে বিটকয়েন হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রথম সন্তান। ২০০৮ সালে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ‘সাতোশি নাকামোতো’ ছদ্মনামে পরিচিত এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিটকয়েনের ধারণা প্রকাশ করেন। ২০০৯ সালের ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিটকয়েন নেটওয়ার্ক চালু হয়।

বিটকয়েনের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি অর্থব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে মানুষ কোনো ব্যাংক বা তৃতীয় পক্ষের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি একে অপরের কাছে অর্থ পাঠাতে পারবে।

সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় বিবেচনায় এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক অনেক দিক রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে এর নেতিবাচক প্রভাবটাই অনেক বেশি। বিশ্বে ১.৮ বিলিয়নেরও বেশি মুসলমানের জন্য ইসলামি শরিয়তের আলোকে ক্রিপ্টোকারেন্সির হালাল বা হারাম হওয়ার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিম্নে সহজভাবে এর মেকানিজম বর্ণনা করা হলো—

যেকোনো বস্তুর অস্তিত্ব দুই ধরনের হতে পারে, যথা: ১. ফিজিক্যাল, ২. ডিজিটাল। আমাদের হাতে ব্যবহৃত ফোনটার ফিজিক্যাল অস্তিত্ব আছে বিধায় আমরা তা ছুঁতে পারছি। তবে ফোনের ভিতর যে অ্যাপসগুলো রয়েছে সেগুলোরও অস্তিত্ব রয়েছে, তবে ফিজিক্যাল নয় বরং ডিজিটাল অস্তিত্ব। তাই আমরা সেগুলো দেখতে পারি কিন্তু ছুঁতে পারি না।

অপরদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে আমরা ডিজিটাল মুদ্রা বলছি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা প্রমাণিত যে, বিটকয়েন—ফিজিক্যাল বা ডিজিটাল—কোনোভাবেই অস্তিত্বশীল বস্তু নয়। তাহলে এটি কী? এবং কেনই বা একে মূল্যবান ধরা হয়?

ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত একটি ট্রানজেকশন বা লেনদেনের নামমাত্র। অর্থাৎ, দুই পক্ষের মধ্যে একটি লেনদেন সংঘটিত হলে তার তথ্য একটি ডিজিটাল রেকর্ড বা ব্লকচেইনে সংরক্ষিত হয়; কিন্তু সেই লেনদেনের পেছনে কোনো বাস্তব সম্পদ (Asset) সঞ্চিত বা প্রতিনিধিত্বশীল অবস্থায় থাকে না। সাধারণভাবে কোনো লেনদেন বা চুক্তির ক্ষেত্রে তার পেছনে কোনো না কোনো বাস্তব সম্পদ, পণ্য বা মূল্যমানসম্পন্ন বস্তুর অস্তিত্ব থাকে।

একইভাবে বিকাশ, নগদ কিংবা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় হিসাবের মধ্যে যে সংখ্যাগুলো দেখা যায়, সেগুলোর পেছনে প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার অধীনে বাস্তব অর্থমূল্য বিদ্যমান থাকে। কিন্তু বিটকয়েন বা অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এখানে মূলত লেনদেনের তথ্যই নিবন্ধিত হয়। এর পেছনে কোনো বাস্তব সম্পদের অস্তিত্ব থাকে না। ফলে লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর ব্যবহারকারী তার ডিজিটাল ওয়ালেটে কেবল কিছু সংখ্যাগত তথ্য বা ডিজিটাল ব্যালেন্স দেখতে পান।

এখানে আরও মজার বিষয় হলো, যদিও এটিকে আমরা ট্রানজেকশন বলছি তবে ট্রানজেকশন সম্পন্ন হওয়ার যত শর্ত রয়েছে সেই সকল শর্তগুলোও ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বিটকয়েন অতিক্রম করতে পারেনি। তাহলে কেন এটিকে মূল্যবান সম্পদ মনে করা হয়?

অর্থনীতির মূলনীতি অনুযায়ী যেকোনো জিনিসের মূল্য নির্ধারিত হয় চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যে।

বিটকয়েনের সর্বোচ্চ সরবরাহ ২১ মিলিয়নে সীমাবদ্ধ করেছেন ‘সাতোশি নাকামোতো’। আর বিশ্বব্যাপী চাহিদাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সীমিত সরবরাহ এবং বাড়তি চাহিদার কারণে এটিকে মূল্যবান মনে করা হচ্ছে, যদিও এর পেছনে বাস্তব কোনো সম্পদ নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় কয়েকটি সাদা কাগজের টুকরো বা খাতার কয়েকটা পৃষ্ঠা যদি মানুষ মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিশ্বাস করা শুরু করে এবং কাগজের সংখ্যাও সীমিত হয়, তাহলে সেটাও মূল্যবান বস্তুতে পরিণত হবে, যদিও এর পেছনে বাস্তব কোনো সম্পদ নেই।

বিটকয়েনের ডিজিটাল অস্তিত্ব সম্পর্কিত এই মিথ্যে বাস্তবতা উন্মোচন করতে কিছু দৃষ্টান্ত পেশ করা হলো—

প্রথম দৃষ্টান্ত:

ট্রানজেকশনের একটি সংজ্ঞা: দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে সম্পদ আদান-প্রদানকে ট্রানজেকশন বলা হয়।

সরাসরি সংজ্ঞায় এ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় রয়েছে—১. দুই বা ততোধিক পক্ষ, ২. সম্পদ ও ৩. আদান-প্রদান (স্থানান্তর)।

ট্রানজেকশন সম্পন্ন হওয়ার পর তার রেকর্ড প্রচলিত যেকোনো পদ্ধতিতে যেমন—ফিজিক্যাল রেজিস্টার, কপি বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে করা যেতে পারে।

সহজভাবেই এখানে কিছু প্রশ্ন জাগে—
১. যদি দুই বা ততোধিক পক্ষ না থাকে, তাহলে কি ট্রানজেকশন হবে?
২. যদি বস্তু (সম্পদ) অস্তিত্বশীল না হয়, তাহলে কি ট্রানজেকশন হবে?
৩. যদি কোনো কিছুর স্থানান্তর না ঘটে, তাহলে কি ট্রানজেকশন হবে?

ইসলামের নীতিমালা সামনে রেখে উলামায়ে কিরাম ক্রয়-বিক্রয়ের মৌলিক কিছু শর্ত উল্লেখ করেছেন—
১. বিক্রয়ের সময় পণ্য অস্তিত্বশীল থাকতে হবে।
২. বিক্রেতার মালিকানায় থাকতে হবে।
৩. বিক্রেতার দখলে থাকতে হবে।
৪. অতিরিক্ত কোনো শর্ত ছাড়া বিক্রয় তৎক্ষণাৎ কার্যকর হতে হবে।
৫. পণ্য মূল্যমানবিশিষ্ট হতে হবে।
৬. পণ্য এমন হতে পারবে না, যা কেবল হারাম লক্ষ্যেই ব্যবহৃত হয়। যেমন: শূকর, মদ ইত্যাদি।
৭. পণ্য নির্ধারিত হতে হবে এবং ক্রেতাকে তার পরিচয় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে হবে।
৮. পণ্যের ওপর ক্রেতার অবাধ অধিগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এই অধিকার ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্য ঘটনা বা অন্য কোনো শর্তের ওপর নির্ভরশীল হতে পারবে না।
৯. বিক্রয় শুদ্ধ হতে মূল্য নির্ধারণও একটি জরুরি শর্ত। যদি মূল্য নির্ধারণ করা না হয়, তাহলে বিক্রয় শুদ্ধ হবে না।
১০. বিক্রয় শর্তমুক্ত হতে হবে।

এবার ওপরের তিনটি প্রশ্ন এবং ক্রয়-বিক্রয়ে শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত মৌলিক শর্তগুলো সামনে রেখে বিটকয়েনকে বিশ্লেষণ করা যাক।

২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩ জানুয়ারি ‘সাতোশি নাকামোতো’ একটি নতুন অ্যাকাউন্ট (বিটকয়েন লেজার) চালু করেন, যেখানে একটি অ্যাড্রেসে ৫০ বিটকয়েন রেকর্ড করা হয়েছিল। এটাই ছিল বিটকয়েন লেজারে ঘটিত প্রথম ট্রানজেকশন। এই ট্রানজেকশনের সময়, তারিখ এবং এতে কত বিটকয়েন লেখা হয়েছিল, এ সম্পর্কে আমাদের জানা আছে। সুতরাং আমাদের কাছে স্পষ্ট যে, ৫০ বিটকয়েনের রেকর্ড (মাইনিং প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ) একটি অ্যাড্রেসে হয়েছে, যা সাতোশি নাকামোতোর ছিল। তখন এই ৫০ বিটকয়েনের সত্তাগত বা বাহ্যিক কোনো মূল্য ছিল না। এটি ছিল কেবল একটি সাধারণ ট্রানজেকশন, যা একটি অ্যাকাউন্টে (লেজারে) রেকর্ড করা হয়েছিল। সেখানে কোনো পক্ষও ছিল না, সম্পদও ছিল না; আর সম্পদ স্থানান্তরের তো কোনো প্রশ্নই আসে না!

মুফতিদের মতে, বিটকয়েনের এই সাধারণ ট্রানজেকশন, ক্রয়-বিক্রয়ের শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত অনেকগুলো শর্ত (২, ৩, ও ৫) লঙ্ঘন করেছে। এ জন্য বিটকয়েন ক্রয়-বিক্রয়ের অর্থ হলো 'পণ্যবিহীন কেবল ট্রানজেকশন ক্রয়-বিক্রয়'। এটা আমাদের বুঝতে হবে যে, অ্যাকাউন্টে (অর্থাৎ, লেজারে) অর্থের 'রেকর্ড'টা বাস্তবে কোনো 'অর্থ' নয়। আর বিটকয়েন কোনো সম্পদের প্রতিনিধিত্বও করে না। তাই বিটকয়েনের প্রশ্নে পণ্য বলতে কিছু নেই, যার ওপর মালিকানা বা দখল প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ফলে কেবল ট্রানজেকশন বা অ্যাকাউন্ট রেকর্ড করার দ্বারা বিটকয়েনের মালিকানা ও দখল প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত:

A ১ হাজার টাকা ঋণ নিল B-এর কাছ থেকে। এরপর A একটি চিঠি লিখল B-এর কাছে—আমি এক মাসের মধ্যে এই ১ হাজার টাকা পরিশোধ করে দেব—যার নিচে A-এর স্বাক্ষর ছিল। ফলে এ চিঠিটি ঋণের একটি রসিদ হয়ে গেল। এখন যদি মানুষ ঋণের এ রসিদটি ক্রয়-বিক্রয় করা শুরু করে দেয়? মনে রাখতে হবে, এটি কেবল একটি ঋণের রসিদ, মূল অর্থ নয়। আমরা সবাই জানি, ইসলামি শরিয়তে ঋণ ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ।

কল্পনা করুন, যদি কোনো ব্যক্তি একটি খালি কাগজে স্বাক্ষর করে—যখন কিনা কোনোপ্রকার বিবরণ বা বস্তু তার সঙ্গে যুক্ত নেই—তাহলে এই ফাঁকা স্বাক্ষরের কি কোনো মূল্য বা গুরুত্ব থাকতে পারে?

আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি (NIST), ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের ডিজিটাল স্বাক্ষরের মানদণ্ড অনুযায়ী, ডিজিটাল স্বাক্ষর হলো—হাতে লেখা স্বাক্ষরের একটি ইলেকট্রনিক প্রতিরূপ; এটি ব্যবহার করা হয় এ নিশ্চয়তার জন্য যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেই তথ্যের ওপর স্বাক্ষর করেছে।

বিটকয়েনের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, এখানে না আছে কোনো পণ্য, আর না আছে কোনো সেবা, অধিকার বা সম্পদ—যা ক্রয়-বিক্রয় হতে পারে। তাহলে এখানে বিক্রি হচ্ছে কেবল ডিজিটাল স্বাক্ষরের একটি চেইন। এ কথা বিটকয়েনের আবিষ্কারক সাতোশি নাকামোতো তার বিখ্যাত 'বিটকয়েন হোয়াইট পেপার'-এ উল্লেখ করেছেন,

We define an electronic coin as a chain of digital signatures. Each owner transfers the coin to the next by digitally signing a hash of the previous transaction and the public key of the next owner and adding these to the end of the coin. A payee can verify the signatures to verify the chain of ownership.  

ইলেকট্রনিক কয়েনকে আমরা সংজ্ঞায়িত করি ডিজিটাল স্বাক্ষরের একটি চেইন হিসেবে। প্রত্যেক মালিক পূর্ববর্তী লেনদেনের হ্যাশ ও পরবর্তী মালিকের 'পাবলিক কি'-এর ওপর ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্বাক্ষর করে এবং এই তথ্যগুলো কয়েনের শেষে যুক্ত করে। তারপর কয়েনটি পরবর্তী মালিকের কাছে স্থানান্তরিত হয়। গ্রাহক স্বাক্ষরগুলো যাচাই করার মাধ্যমে মালিকানা চেইনের সঠিকতার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারে।

আইও/