মাদকাসক্তি: ধ্বংসের মুখে যুবসমাজ
প্রকাশ: ২৭ জুন, ২০২৬, ১১:৫২ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| নূর মুহাম্মদ রাহমানী ||

২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস।  মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার প্রতিরোধ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উদ্যোগে বাংলাদেশেও ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ পালিত হচ্ছে।  মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ২৬ জুনকে মাদকবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।  পরের বছর থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে।  সে হিসেবে আমাদের বাংলাদেশেও পালিত হয়ে আসছে।

সমাজে মদের কুপ্রভাব :

বর্তমান যুগে যে কয়েকটি জিনিস মানব সমাজকে অপূরণীয় ক্ষতি করছে, তার মধ্যে মাদকের অভিশাপ সর্বাগ্রে।  এটি মানুষের দ্বীন ও ঈমান দুর্বল করে দেয়।  এর ছোবল অত্যন্ত বিষাক্ত।  এর কারণে উগ্রতা ও অপরাধ প্রবণতা সীমাহীনভাবে বাড়ছে।  মাদকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পরিবারে কলহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি পায়।  মানুষের কর্মস্পৃহা নষ্ট হয়ে যায়।  এর কারণে যুবসমাজ আজ ধ্বংসের মুখে।  মাদককে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ঘটছে ধর্ষণ, হত্যা।  গত ১৮ মে বগুড়া শহরে মাদক সেবন করে এক তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে তিন যুবক।  ১৯ মে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে মাদকসেবন নিয়ে তর্কের জেরে পরের দিন জুয়েল হোসেন নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।  ২৩ মে খুলনায় মাদকসেবীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন ওমর ফারুক রাব্বানি নামের এক যুবক।  তার বুকে ও মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

যে যুব সমাজ ছিল একটা দেশের অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও সামাজিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি।  মাদকের কারণে আজ তাদের বেহাল দশা। যে সময়টা ছিল তাদের খেলাধুলার তা না করে ইন্টারনেট ও মাদকের বেড়াজালে তারা বন্দি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মাদকের কারণ শুধু ডিপ্রেশন নয়; বরং সেটা এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।  বন্ধুদের দেখাদেখি শখের বশে অনেকেই এতে জড়িয়ে পড়ছে।  এখন আর আড়ালে নয় সরাসরি রাস্তার কিনারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেবন করছে নিষিদ্ধ মাদক।

মাদকাসক্তির কারণ :

মাদকাসক্তির এ ভয়াবহতার পেছনে চিন্তা করলে দেখা যাবে এর মূলে রয়েছে বেশ কিছু কারণ।  সবচেয়ে বড় কারণ বলা যায়, ধর্মীয় বিধি-নিষেধ অনুসরণে শিথিলতা।  রয়েছে মা-বাবার উদাসীনতা।  অধিকাংশ কিশোর মা-বাবার অবহেলা এবং তাদের নিয়ন্ত্রন না করার কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে।  খারাপ বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে চলাফেরা এতে জড়িয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ।  পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণও এর জন্য কম দায়ি নয়।  দ্বীনি শিক্ষার অভাব এবং আধ্যাত্মিকতার চেয়ে বস্তুবাদকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণেই মাদকের এ নেশা তাদের পেয়ে যাচ্ছে।  আর মিডিয়া ও চলচ্চিত্রের নেতিবাচক প্রভাবের কথা আর কী বলব! টিভি-সিনেমায় মাদকের দৃশ্য গ্ল্যামারাইজড করে দেখানোর ফলে তরুণদের মধ্যে মাদকের নেশা ঝেঁকে বসেছে।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেশা-জাতীয় দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচারও তাদের এতে টানছে।

 

মাদকের ক্ষতি :

চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাদক সেবনের ক্ষতি অপূরণীয়।  জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নিঃসন্দেহে মানুষের অমূল্য সম্পদ, মাদক তা কেড়ে নেয়।  ফলে তার ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয় এবং দ্বীন ও শরিয়ত সম্পর্কে অজ্ঞ লোকটা পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাড়ায়।  মাদক শরীরের অনেক ক্ষতি করে।  তা সেবনের ফলে মুখের ভেতরের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়, ফলে মাড়িতে ক্ষত বা ইনফেকশন এবং ফোলা ভাব দেখা দেয়।  মদ্যপায়ীদের দাঁত দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।  মাদকের তীব্রতায় খাদ্যনালীর সংবেদনশীল পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ক্যান্সারের রূপ ধারণ করতে পারে।  মাদক সেবনের আরও একটি বড় ক্ষতি হলো লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।  এছাড়াও মাদক মানুষের প্রজনন ক্ষমতা ধ্বংস করে ছাড়ে।

 

ইসলামের দৃষ্টিতে মাদক সেবন

ইসলামের দৃষ্টিতে জীবন আল্লাহর বড় নেয়ামত।  এর সুরক্ষা করা ওয়াজিব।  নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া আল্লাহর নেয়ামতের অবমাননা ও অবাধ্যতার শামিল।  আর মাদক সেবন করা মানে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া।  আল্লাহ বলেন, ‘ তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।’ (সুরা বাকারা : ১৯৫)

ইসলামের শুরু সময়ে মাদক বৈধ থাকলেও ধাপে ধাপে তা হারাম হয়ে যায়।  সর্বশেষ আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতের মাধ্যমে মদ চিরকালের জন্য হারাম করে দেন।  আল্লাহ বলেন, ‎‘‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, পূজার বেদী ও (ভাগ্য) নির্ণায়ক) শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ।  সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর।  যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।  শয়তান তো এ-ই চায় যে, মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করবে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখবে।  সুতরাং তোমরা কি নিবৃত্ত হচ্ছ? (সূরা মায়েদা : ৯০-৯১)

মাদক বলতে নেশা জাতীয় যত রকমের দ্রব্য আছে সবগুলো সেবন করা নিষিদ্ধ ও হারাম।  গাঁজা, হাশিশ, পপি, ইয়াবা, আঁঠা, ড্রাগ, হেরোইন, ফেন্সিডিল, ভাঙ, পেথিডিন, টাকিলা, মারিজুয়ানা, আফিম, কোকেন, কেফিন, মরিফিন, ইলেকট্রিক মাদকসহ যত মাদক রয়েছে সবগুলোই পরিত্যাজ্য।  হাদিসের দৃষ্টিতে প্রতিটি মাতাল করে দেয়া বস্তুই মদ।  আর প্রতিটি মদই হারাম।  বিশিষ্ট সাহাবি দায়লাম হিময়ারি রা. বলেন, আমি নবী সা.-এর কাছে আরজ করলাম, ‘আল্লাহর রাসুল! আমরা এক ঠান্ডা দেশের অধিবাসী, আমাদের কঠিন পরিশ্রমের কাজ করতে হয়, আমরা গম দ্বারা এক ধরনের পানীয় প্রস্তুত করে থাকি, যার দ্বারা আমরা কাজের শক্তি পাই ও শীতের মোকাবেলা করি।  তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সেটা কি নেশা সৃষ্টি করে?’ আমি বললাম, জী হাঁ।  তিনি বললেন, ‘তাহলে তা বর্জন কর।  আমি বললাম, ‘লোকেরা তা বর্জন করতে প্রস্তুত হবে না।  তিনি বললেন, ‘ত্যাগ না করলে তাদের সাথে লড়াই কর।| ’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩৬৮৩)

মাদক সেবন করা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক পাপ।  এক হাদিসে একে শিরক আখ্যা দেওয়া হয়েছে।  আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যখন শরাব হারাম করা হলো তখন আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সাহাবিগণ একে অপরের কাছে গিয়ে বললেন, ‘শরাব হারাম হয়েছে এবং একে শিরকের মতো (মারাত্মক গুনাহ) সাব্যস্ত করা হয়েছে। ’ (আত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস : ৩৫৭৬) মাদক শুধু সেবন করা হারাম এমন নয়; বরং মাদক সংশ্লিষ্ট সবকিছু হারাম।  হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা (মাদক সংশ্লিষ্ট নিম্নোক্ত সবার ওপর) অভিসম্পাত করেছেন,

‎১. মাদকের উপর; ২. যে মদ পান করে; ৩. পরিবেশনকারী; ৪. বিক্রয়কারী; ৫. ক্রয়কারী; ৬. যে মাদক নিংড়ায়; ৭. যার আদেশে নিংড়ানো হয়; ৮. বহনকারী; ৯. যার কাছে বহন করে নেওয়া হয়; ১০. আর যে মাদক বিক্রয়লব্ধ অর্থ ভোগ করে। ’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩৬৭৬)

রাসুলের জমানায় মদপানের কারণে ৪০ বেত্রাঘাত করা হলেও সাহাবি জমানায় মদ পানের কারণে ৮০টি বেত্রাঘাত করা হতো।  ওমর (রা.) একজনের মদ পানের ঘটনায় ৮০ বেত্রাঘাতের হুকুম দিয়েছিলেন।  মাদক ব্যবহারের জন্য আখেরাতেও রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।  জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ‘জাইশান’ থেকে এলেন-জাইশান ইয়ামানের একটি জায়গা- তিনি ‘মিয্র’ নামক একটি পানীয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন যা তাদের অঞ্চলে পান করা হতো।  আল্লাহর রাসুল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটা কি নেশা সৃষ্টি করে?’ লোকটি বললেন, ‘জী হাঁ।  আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, ‘নেশা সৃষ্টিকারী সব কিছু হারাম।  আর আল্লাহ নিজের উপর অপরিহার্য করে নিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি নেশা সৃষ্টিকারী বস্তু পান করবে তাকে তিনি ‘তীনাতুল খাবাল’ পান করাবেন। সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর রাসুল! ‘তীনাতুল খাবাল’ কী? তিনি বললেন, জাহান্নামীদের ঘাম অথবা বললেন, জাহান্নামীদের পুঁজ।  (সহিহ মুসলিম : ২০০২)

 যদি আমরা মাদক থেকে ফিরে আসতে চাই তাহলে গোড়া থেকে সংস্কার করতে হবে।  আবার পূর্ণাঙ্গ ইসলামের দিকে ফিরে আসতে হবে।  ঈমানি মেহনত বাড়াতে হবে।  এর ভয়ংকর প্রভাব সম্পর্কে অবগতি লাভ করতে হবে।  সার্বিকভাবে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে।  সরকার ও প্রশাসনকে এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।  আসুন মাদক বন্ধে সহযোগিতা করি।  সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি।  আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

লেখক : শিক্ষাসচিব ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ।

জেডএম/