
|
সুন্নাহর অনুসরণই নবীপ্রেমের প্রকৃত মানদণ্ড
প্রকাশ:
১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:০০ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| মাওলানা মুহাম্মাদ আরশাদ || ইসলামের ইতিহাসে রবিউল আউয়াল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসে আল্লাহ তাআলা সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পৃথিবীতে রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, وما أرسلناك إلا رحمة للعالمين অর্থ: নিশ্চয়ই আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি। (সুরা আম্বিয়া: ১০৭) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুরো জীবন মানবজাতির জন্য কল্যাণ ও হেদায়েতের উৎস। এজন্য প্রত্যেক মানুষের জন্য তাঁর জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজ অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। কুরআনের ভাষ্যও তাই— لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة অর্থ: তোমাদের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সুরা আহযাব: ২১) তাই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শকে জীবনের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়নের জন্য সব সময় সচেষ্ট থাকা জরুরি। হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে— عن عبد الله بن عمرو بن العاص رضي الله عنهما: لا يؤمن أحدكم حتى يكون هواه تبعا لما جئت به(الأربعين النبوية :٤١) অর্থ: ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেউ সত্যিকারের মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তার ইচ্ছা সেই অনুযায়ী হয় যা আমি নিয়ে এসেছি। উক্ত হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, একজন মুমিন প্রকৃত মুমিন হওয়ার জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনীত সকল বিধানকে নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেনে চলা এবং মনগড়া কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ না করা অপরিহার্য। সে অনুযায়ী ১২ রবিউল আউয়াল নবীজির ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের জন্য জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন না করা চাই। কারণ, তা বিদআত ও শরীয়ত পরিপন্থী নবআবিষ্কৃত প্রথা। ঈদে মিলাদুন্নবী যদিও হিজরীর ষষ্ঠ শতাব্দীর পরে আবিষ্কৃত, কিন্তু জশনে জুলুস একেবারেই নবআবিষ্কৃত বিংশ শতাব্দীর সংযোজন; যা ভারতবর্ষে শিয়া সম্প্রদায়ের দেখাদেখি মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে। শহরের মধ্যে জুলুস বের করা এবং মিলাদ পড়ে পড়ে রাস্তায় চলা ইত্যাদি আবশ্যকীয় ও দ্বীনের অংশ হিসেবে গণ্য করা বিদআত। (কেফায়াতুল মুফতী ১/১৪৯) প্রচলিত মিলাদ মাহফিলের উৎপত্তির ব্যাপারে রাহে সুন্নাত কিতাবে এসেছে, এই বিদআত ৬০৪ হিজরীতে ইরাকের মোসুল শহরের বাদশাহ মুজাফফর উদ্দীনের নির্দেশে সর্বপ্রথম সূচনা হয়, যিনি দ্বীনের ব্যাপারে একজন উদাসীন ব্যক্তি ছিলেন। (রাহে সুন্নাত: ১৬২) আর ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন শুরু হয় খ্রিস্টানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। এ ব্যাপারে মুফতী শফী (রহ.) তাফসিরে মাআরিফুল কোরআনে বলেছেন, "খ্রিস্টানরা হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম তারিখে ঈদ উদযাপনের প্রথা চালু করেছে। তাদের দেখাদেখি কিছু মুসলমানরাও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম তারিখে ঈদে মিলাদুন্নবী নামে একটি ঈদ পালন করা শুরু করেছে। অথচ ঈদ একটি ধর্মীয় পরিভাষা, যা শরীয়ত কর্তৃক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা নির্ধারিত। আর তা হচ্ছে বছরে দুটি— এক. ঈদুল ফিতর, দুই. ঈদুল আজহা।" এই উভয় ঈদের সম্পর্ক ইবাদতের সাথে, কোনো নবী ও রাসূলের জন্ম কিংবা মৃত্যুর সাথে সম্পৃক্ত নয়। বাস্তবিকভাবেই যদি নবীজীর জন্মকে কেন্দ্র করে কোনো উৎসবের কথা থাকত, তাহলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তা বলে যেতেন, ঈদের সংখ্যা দুটি ঘোষণা না দিয়ে তিনটি করতেন। অথচ নবীজি নিজেই বছরে দুটি ঈদ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। عن أنس رضي الله تعالى عنه قال: قدم رسول الله صلى الله عليه وسلم المدينة ولهم يومان يلعبون فيهما، فقال: ما هذان اليومان؟ قالوا: كنا نلعب فيهما في الجاهلية. فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إن الله قد أبدلكم بهما خيرا منهما يوم الأضحى ويوم الفطر অর্থ: আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় আগমন করলেন। সেখানে লোকদের দুটো দিন ছিল, যেদিন তারা খেলাধুলা করত। রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন: "এ দুটি দিন কী?" তারা বলল: "আমরা জাহেলিয়াতের যুগে এই দুই দিনে খেলাধুলা করতাম।" তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: "আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে এর চেয়ে উত্তম দুটো দিন দান করেছেন — এক হলো ঈদুল আযহা এবং অপরটি হলো ঈদুল ফিতর।" (সুনানু আবু দাঊদ: ১১৩৪) কোনো সাহাবী, তাবেঈন, তাবেতাবেঈন, মুহাদ্দিস ও ফকীহ কিংবা কোনো পীর-মাশায়েখ ও বুজুর্গ থেকে এ ধরনের কোনো আমল প্রমাণিত নয়। তাই এসব কিছু দ্বীনের নামে শরীয়তের মধ্যে নবআবিষ্কৃত আমল হওয়ায় প্রত্যাখ্যানযোগ্য। (এলাউস সুনান: ১৭/৪৩০, আলমাদখাল লি ইবনিল হাজ্ব: ২/১০) অতএব নিজেদের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ বাদ দিয়ে নবীজীর তরিকায় মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা উচিত। যেমন হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে— عن أبي قتادة الأنصاري رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم سئل عن صوم يوم الإثنين فقال: فيه ولدت فيه أنزل عليّ (صحيح مسلم: ١١٦٢) অর্থ: হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো তিনি কেন সোমবারে রোজা রাখেন? উত্তরে নবীজি বললেন: "সোমবারে আমার জন্ম হয়েছে এবং কুরআনুল কারীম নাযিল হয়েছে। তাই আমি এই দিনে রোজা রাখি।" (সহীহ মুসলিম: ১১৬২) উক্ত হাদিস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়— নবীজির জন্মদিবস পালনের নিয়ম হলো সোমবারে রোজা রাখা, যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই রেখেছেন নিজের জন্মদিবস পালনার্থে। তাছাড়া ১২ই রবিউল আউয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মতারিখ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মতানৈক্য থাকলেও বারটি সোমবার ছিল তা নিশ্চিত। পাশাপাশি শরীয়তের মাসআলার দিকে লক্ষ্য করলেও বোঝা যায় বিদআতিদের কর্মকাণ্ড যেমন শরীয়ত পরিপন্থী, তেমনি বাস্তবতারও বিপরীত। হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নবীজি নিজের জন্মদিবসকে উপলক্ষ করে রোজা রেখেছেন, আর বিদআতিরা এ দিনকে সামনে রেখে ঈদ উদযাপন করে। অথচ ঈদ আর রোজা দুটি বিপরীতমুখী কাজ। শরীয়তে যে দিনে ঈদ পালনের কথা এসেছে, সেদিন রোজা হারাম করেছে শরীয়ত। তাহলে দুই ঈদ ব্যতীত অন্য কোনো ঈদ উদযাপন করা শরীয়ত সমর্থিত নয়। আসুন আমরা বিদআত মুক্ত জীবন গড়ি এবং সত্যিকার অর্থে সঠিক পদ্ধতিতে নবীজিকে ভালোবাসি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন—আমীন। লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া ছমদিয়া আশরাফুল উলুম, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম আইও/ |