হারিয়ে যাওয়া জমজম কূপের সন্ধান
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ০৩:৩৪ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর যুগের পর কালের প্রবাহে জমজম কূপকে ঘিরে বহু পরিবর্তন, সংস্কার ও বিবর্তন ঘটে। কোনো জনপদ ধ্বংস হয়েছে, আবার তার স্থানে গড়ে উঠেছে নতুন জনপদ। এভাবেই একসময় জমজম কূপটি মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। মরুভূমির প্রবল বালুঝড়েও কূপটি বালুর স্তূপে চাপা পড়ে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আল্লামা ইয়াকূত হামাভী তাঁর মু’জামুল বুলদান গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকার ফলে জমজম কূপের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং একসময় এর অবস্থানের চিহ্নও বিলুপ্ত হয়ে যায়। ঐতিহাসিকদের একটি মত হলো, দীর্ঘদিন মক্কার কর্তৃত্বে থাকা জুরহুম গোত্র মক্কা ত্যাগ করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে কূপটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়। এ কাজে নেতৃত্ব দেন তাদের নেতা মুযায ইবনে জুরহুম। ফলে বহু বছর ধরে জমজম কূপের সঠিক অবস্থান মানুষের অজানাই থেকে যায়।

হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবের পূর্ব পর্যন্ত কেউ জমজম কূপ পুনরুদ্ধারে সফল হয়েছেন বলে জানা যায় না। তবে এটিও বলা হয় যে, মহান আল্লাহ তাঁর অসীম প্রজ্ঞায় জমজম কূপ পুনরাবিষ্কারের সময়কে হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত নির্ধারণ করে রেখেছিলেন, যাতে তাঁর আগমনের প্রাক্কালে মক্কার গুরুত্ব ও জনবসতি আরও বৃদ্ধি পায়।

আবদুল মুত্তালিব যখন হাজিদের পানির ব্যবস্থা করার দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন, তখন জমজম কূপের অবস্থান অজানা থাকায় তাঁকে দূরবর্তী স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করে হাজিদের পান করাতে হতো। এটি ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ। তিনি জানতেন, কোথাও না কোথাও জমজম কূপ বিদ্যমান রয়েছে। তাঁর মনে প্রায়ই ইচ্ছা জাগত—যদি তাঁর দশজন শক্তিশালী পুত্র থাকত, তবে তাঁদের সহযোগিতায় কূপটি অনুসন্ধান ও খনন করা অনেক সহজ হতো। এ চিন্তা থেকেই তিনি মানত করেন, আল্লাহ তাঁকে দশজন পুত্রসন্তান দান করলে তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে তিনি আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করবেন।

এর কিছুদিন পর এক রাতে আবদুল মুত্তালিব স্বপ্নে দেখলেন, শুভ্রকেশ এক নূরানি ব্যক্তিত্ব তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর সমগ্র অবয়বে ছিল জ্যোতির্ময় দীপ্তি এবং মুখমণ্ডলে গভীর গাম্ভীর্যের ছাপ। তিনি বললেন, “হে মুত্তালিব! ‘তাইবা’ খনন করো।”

আবদুল মুত্তালিব জিজ্ঞেস করলেন, “তাইবা কী?”

কিন্তু তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

পরের রাতে আবারও একই ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা গেল। এবার তিনি বললেন, “হে মুত্তালিব! ‘বাররাহ’ খনন করো।”

আবদুল মুত্তালিব প্রশ্ন করলেন, “বাররাহ কী?”

কিন্তু এবারও তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

তৃতীয় রাতেও একই ঘটনা ঘটল। এবার তিনি বললেন, “হে আবদুল মুত্তালিব! ‘আল-মাযনূনা’ খনন করো।”

আবদুল মুত্তালিব জানতে চাইলেন, “আল-মাযনূনা কী?”

কিন্তু এবারও তিনি কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

পরপর তিন রাত একই স্বপ্ন দেখায় আবদুল মুত্তালিব গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এটি কোনো সাধারণ স্বপ্ন নয়; বরং এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু ‘তাইবা’, ‘বাররাহ’ ও ‘আল-মাযনূনা’—এই নামগুলোর অর্থ কিংবা উদ্দেশ্য তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না। কারণ এ নামগুলো তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল।

চতুর্থ রাতে তিনি আবারও সেই নূরানি ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখলেন। এবার তিনি বললেন, “হে আবদুল মুত্তালিব! বারবার তোমাকে বলা হচ্ছে, অথচ তুমি তা বুঝতে পারছ না। এবার জমজম খনন করো।”

‘জমজম’ নামটি তাঁর পরিচিত ছিল। তবুও তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “জমজম কী?”

এবার সেই ব্যক্তি অদৃশ্য না হয়ে বললেন, “এটি এমন একটি কূপ, যা কখনো সম্পূর্ণরূপে ভরাট হবে না এবং যার পানি কখনো শুকিয়ে যাবে না। কাবা শরিফ জিয়ারতকারীদের জন্যই এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারা এর পানি পান করবে।”

এ কথা শুনে আবদুল মুত্তালিব জিজ্ঞেস করলেন, “এটি কোথায় অবস্থিত?”

তিনি উত্তরে বললেন, “যেখানে পশুর গোবর, রক্ত ও মাংসের চিহ্ন রয়েছে, সেখানেই এর অবস্থান।”

এই ইঙ্গিতপূর্ণ উত্তরের প্রকৃত অর্থ আবদুল মুত্তালিব তখনও বুঝতে পারলেন না। তাই তিনি বিনীতভাবে বললেন, “আমাকে আরও কিছু নিদর্শন জানিয়ে দিন, যাতে আমি কূপটির অবস্থান নিশ্চিতভাবে চিনে নিতে পারি।”

আবদুল মুত্তালিবের কথা শুনে সেই নূরানি ব্যক্তি বুঝতে পারলেন, তিনি এখনো জমজম কূপের সঠিক অবস্থান শনাক্ত করতে পারেননি। তখন তিনি বললেন, “যেখানে সাদা পালকের পাখিদের আনাগোনা দেখতে পাবে এবং যেখানে অসংখ্য পিঁপড়া খাদ্যকণা মুখে করে গর্তে প্রবেশ করছে, সেখানেই জমজম কূপের অবস্থান। সেখানে খনন করলেই তুমি তোমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করবে।” এ কথা বলে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

স্বপ্নে দেওয়া এই ইঙ্গিত মূলত সেই স্থানটির প্রতি নির্দেশ করেছিল, যেখানে পশু জবাই করা হতো। কারণ এমন স্থানে পশুর রক্ত-মাংসের অবশিষ্টাংশ থাকায় সেখানে পাখি ও পিঁপড়ার সমাগম হওয়াই স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন ধরে জমজম কূপের অবস্থান বিস্মৃত হয়ে যাওয়ায় এবং কূপটি মাটিচাপা পড়ে থাকায় লোকেরা অজান্তেই সেই স্থানকে পশু জবাইয়ের জন্য ব্যবহার করত।

জমজম কূপের একাধিক নাম রয়েছে, যা এর মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক। অধিক পানির আধার হওয়ায় এর নামকরণ হয়েছে ‘জমজম’। আরবি ভাষায় ‘জমজম’ শব্দটি প্রাচুর্য ও সমাবেশের অর্থও প্রকাশ করে। আবার কোনো কোনো গবেষকের মতে, হজরত হাজেরা আলাইহাস সালাম পানির প্রবাহ চারদিকে ছড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করার জন্য কূপের চারপাশে মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরি করেছিলেন। তিনি যদি তা না করতেন, তবে পানি চারদিকে ছড়িয়ে যেত। এ ঘটনার সঙ্গেও ‘জমজম’ নামের উৎপত্তিকে অনেকে সম্পর্কিত করেছেন।

‘জমজম’ নামেই কূপটি সর্বাধিক পরিচিত হলেও ইতিহাসে এর আরও কয়েকটি নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন—‘শাব্বাআ’, ‘বাররাহ’, ‘তাইবা’, ‘আওয়ানা’, ‘সাফিয়া’, ‘বুশরা’, ‘আবরার’ এবং ‘আল-মাযনূনা’।

এসব নামই মূলত জমজম কূপের বিভিন্ন উপাধি। হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের যুগের পর মক্কায় বহুবার জনপদের উত্থান-পতন ঘটেছে। কালের বিবর্তনে হয়তো কূপটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। এমনও হতে পারে, কোনো কোনো গোত্র নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নিজস্ব নামেই কূপটিকে অভিহিত করত, যাতে এর ওপর তাদের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ন থাকে। স্বপ্নে সেই নূরানি ব্যক্তি আবদুল মুত্তালিবের সামনে একের পর এক এসব নাম উচ্চারণ করে যেন অতীত ইতিহাসের প্রতিই তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি ইঙ্গিত দিতে চেয়েছিলেন যে, যারা আল্লাহর দান করা এই অফুরন্ত নিয়ামতকে নিজেদের একচ্ছত্র সম্পদে পরিণত করে মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিল, ইতিহাস তাদের টিকিয়ে রাখেনি। কালের আবর্তে তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অতএব, আল্লাহর এই মহামূল্যবান নিয়ামত যেন কখনো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক সম্পদে পরিণত না হয়।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের পর দীর্ঘ সময় কাবা শরিফের তত্ত্বাবধান জুরহুম গোত্রের হাতে ছিল। কাবার দায়িত্বের পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবেই জমজম কূপের দেখাশোনার দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত হয়। আমালিকা গোত্রকে পরাজিত করে তারা মক্কার কর্তৃত্ব গ্রহণ করে এবং মুযায ইবনে আমর ইবনে হারিসের সময় পর্যন্ত সেই কর্তৃত্ব বজায় থাকে।

তাদের শাসনামলে মক্কায় ব্যবসা-বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। কিন্তু ক্রমে তারা আরাম-আয়েশে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং জমজম কূপের রক্ষণাবেক্ষণের প্রতি উদাসীন হয়ে যায়। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পরিচর্যার অভাবে কূপটি ধীরে ধীরে ভরাট হতে থাকে এবং এর পানিপ্রবাহও বন্ধ হয়ে যায়।

জুরহুম গোত্রের এই অবহেলা ও দুর্বলতার সুযোগে খুযাআ গোত্র মক্কার নেতৃত্ব গ্রহণের উদ্যোগ নেয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে জুরহুম নেতা মুযায তাঁর গোত্রের লোকদের সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তারা তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। তখন তিনি বুঝতে পারলেন, অচিরেই মক্কার কর্তৃত্ব তাদের হাতছাড়া হবে।

এই আশঙ্কা থেকেই তিনি কাবা শরিফের কিছু মূল্যবান উপঢৌকন এবং দুটি স্বর্ণের হরিণ গোপনে জমজম কূপে লুকিয়ে রাখেন। তাঁর ধারণা ছিল, ভবিষ্যতে যদি আবার মক্কার কর্তৃত্ব ফিরে পাওয়া যায়, তবে এসব সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হবে। এরপর তিনি নিজের গোত্র এবং হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বংশধরদের নিয়ে মক্কা ত্যাগ করেন। পরে খুযাআ গোত্র মক্কার শাসনভার গ্রহণ করে এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পঞ্চম পূর্বপুরুষ কুসাই ইবনে কিলাবের সময় পর্যন্ত তারা সেই দায়িত্ব পালন করে।

স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে আবদুল মুত্তালিব গভীরভাবে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকেই তাঁকে জমজম কূপ পুনরাবিষ্কার ও পুনঃখননের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই এই ইঙ্গিত উপেক্ষা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি ছিলেন নিজ গোত্রের নেতা। ইচ্ছা করলে গোত্রের লোকদের নিয়ে খননকাজ শুরু করতে পারতেন। কিন্তু তাতে কূপটির ওপর তাঁর অধিকার নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজের একমাত্র পুত্র হারিসকে সঙ্গে নিয়েই জমজম কূপ পুনঃখননের কাজ শুরু করবেন। 

মূলমাওলানা আব্দুর রহমান কাওসার মাদানী

অনুবাদশরিফ হাসানাত

এসএইচ/