শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. তাঁকে যেভাবে পেয়েছি 
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৩:৩৬ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| মাওলানা আনিসুর রহমান ||

রাত্র এখন ১২টা বেজে ৫০ মিনিট। কলম হাতে নিয়ে কি যেন লিখব ভাবছি। আমার মনকে জিজ্ঞেস করলাম, লিখতে দেরি করছ কেন? মন বলল কি লিখব? লিখতে গেলেই তো তোমার চোখের জলে কলমের কালি ও সব কাগজ নষ্ট হয়ে যাবে। তাছাড়া তুমি তো কোনদিন কিছু লেখনি। বললাম, জানি লিখতে গেলে আমার চোখেরজলে কাগজ নষ্ট হবে, কালি ভেসে যাবে। তারপরও তোমার জীবনের লেখাটি লিখতেই হবে। অগত্যা লিখতে শুরু করলাম। কিন্তু কলম চলছে না। বারবার থেমে যাচ্ছে। কারণ একটাই; দুদিন আগেও যার নামের শেষে দামাত বারাকাতুহু লেখা হত, এখন তাঁর নামের পরে রহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখতে হবে। সেই মহান মনীষী, বিগত শতাব্দীর মহান ব্যক্তি শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ, যার অনুগ্রহ ও ইহসান আমার প্রতিটি পশমের গোড়ায় গোড়ায়, যার অন্তরের মণিকোঠায় আমি অধমের মহব্বত ছিল সযত্নে লালিত। তার সেই ইহসান, অনুগ্রহ ও মুহাব্বতের শুকরিয়া আমি কি করে আদায় করব। কি দিয়ে সেই ঋণ আমি শোধ করব, সেই ভাষা আমার জানা নেই। তিনি ছিলেন আমার হৃদয়স্পন্দন, নয়নমণি, মাথার মুকুট। তাঁকে হারিয়ে আমি আজ ব্যাকুল দিশেহারা; চোখের জলে বুক ভাসছে আর প্রভুর দরবারে কায়মনোবাক্যে প্রার্থণা করছি, আল্লাহ তাআলা যেন তাঁকে আপন অনুগ্রহে জান্নাতের আলা মাকাম দান করেন। আমিন।

শায়খুল হাদিস রহ. এমন ব্যক্তিত্ব, যার জীবনাদর্শ, ত্যাগ ও তাকওয়ার কথা লিখে শেষ করার মতো নয়। আমার মত অযোগ্য উম্মি হযরতের শানে কিছু লিখে তাঁর শান ও মর্যাদাকে ছোট করা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই হযরতের জীবন-আদর্শ না লিখে আমি অধম আমার জীবনে শায়খুল হাদিস রহ. কে কিভাবে পেয়েছি এবং কেমন পেয়েছি এই বিষয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা পোষণ করছি। আশা করি আমার এই ক্ষুদ্র লেখাটি একজন তালিবুল ইলমকে আদর্শধান তালিবুল ইলম ও অনুসরণীয় আদর্শ মুআল্লিম হওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা যোগাবে।

শায়খুল হাদিস রহ. কে আমি কিভাবে পেয়েছি:

এ প্রসঙ্গে আমি আমার জীবনের শুরুলগ্নের কিছু কথা না বললেই নয়। কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার থানার অন্তর্গত বনকোটি গ্রামে আমার জন্ম। বাড়ির পাশে এক মাইল দূরে ঐতিহাসিক রামপুর কাসেমুল উলুম মাদরাসায় আমার পড়ালেখার হাতেখড়ি। পল্লীগ্রামে জন্ম এবং গ্রামের মাদরাসায় পড়াশুনা। আকাবিরে উলামাদের তেমন একটা খেদমত করার সুযোগ হতনা তাই মাদরাসার বার্ষিক মাহফিলে তাদের কেউ আসলে তার জুতো উঠানো ও খেদমত করার জন্য চেষ্টা করতাম। 

১৯৯২ সালে ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক চরমপন্থী এক দল হিন্দু ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ শহিদ করত সেখানের মুসলমানদের উপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়েছিল। যেমন বর্তমানে মায়ানমারের মুসলমানদের উপর চালানো হচ্ছে। জীবিত মুসলমানদেরকে হাত-পা বেধে আগুনে ফেলা হচ্ছে। নিষ্পাপ শিশুদেরকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে জবাই করা হচ্ছে। মুসলিম নারীদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হচ্ছে। মুসলমানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। মুসলমানরা চিৎকার করে রাব্বুল আলামিনের নিকট ফরিয়াদ করছে- ربنا اخرجنا من هذه القربة الظالم أهلها
আজ তাদের এই ফরিয়াদে সাড়া দেবার মতো কেউ নেই। নেই সেই মহান মুজাহিদ, যিনি ১৯৯২ সালে ভারতের মজলুম মুসলমানদের আর্তনাদে স্থির থাকতে পারেননি। আর কেমন করেই বা পারবেন, তিনি তো ছিলেন হযরত শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. এর হাতেগড়া ছাত্র, হযরত শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান রহ. ও হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর সুযোগ্য উত্তরসূরী। তাই গর্জে ওঠে শায়খুল হাদিস রহ. এর প্রতিবাঁদি কণ্ঠ এবং বাবরী মসজিদ পুননির্মাণের দাবিতে ও মজলুম মুসলমানদের পাশে দাঁড়াবার জন্য লংমার্চের ঘোষণা করেন। লংমার্চ আহবান করার কিছুকাল পরেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় লম্পট শায়খকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে শায়খের উপর হামলা করে এবং শায়খুল হাদিস রহ. কে আহত করে রাজপথকে রক্তাক্ত করে এক কারবালার ইতিহাস রচনা করে।

পরদিন জাতীয় পত্র-পত্রিকায় শায়খুল হাদিস রহ. এর রক্তমাখা শরীরের ছবিসহ খবর প্রকাশিত হয়। সেদিন শায়খুল হাদিস রহ. এর রক্তরঞ্জিত শরীর পত্রিকার পাতায় দেখার মাধ্যমে আমার জীবনে সর্বপ্রথম তাঁকে দেখার সৌভাগ্য অর্জিত হয়। সেদিন আমার দুচোখ বেয়ে নীরবে কী পরিমাণ যে অশ্রু প্রবাহিত হয়েছিল তা আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ জানে না।

মনে মনে ভাবছিলাম, আল্লাহ তাআলা যদি আমাকে সেই মহান ব্যক্তির খেদমত করার সুযোগ করে দিতেন, তাহলে আমার জীবনকেও তাঁর মত আল্লাহর রাহে কুরবান করে দিতাম। 

এ থেকেই শুরু হল শায়খুল হাদিস রহ. এর সাথে আমার হৃদয়ের নিবিড় সম্পর্কের সূচনা। ১৯৯৩ সালের ২রা জানুয়ারি যখন ৫ লক্ষ তাওহিদি জনতা নিয়ে লংমার্চ শুরু হল, তখন দিলে বড় তামান্না ছিল লংমার্চে শরিক হওয়ার জন্য। কিন্তু মাদরাসা থেকে অনুমতি না থাকায় এবং আর্থিক দুর্বলতার কারণে লংমার্চে শরিক হতে পারিনি। কিন্তু শায়খুল হাদিস রহ. এর ছবিটি পত্রিকার পাতায় একনজর দেখার জন্য প্রতিদিন মাদরাসা থেকে তিন মাইল দুরে গিয়ে পত্রিকা কিনে আনতাম এবং শায়খুল হাদিস রহ. এর ছবিটিকে চুমু খেয়ে চোখের জলে বুক ভাসাতাম। উল্লেখ্য যে, এর পূর্বে আমি পত্রিকাও পড়তে পারতাম না। দরবারে এলাহিতে ফরিয়াদ করেছিলাম, হে আল্লাহ তুমি আমাকে একটিবারের জন্য হলেও সেই মহা মনীষীর নিকটে যাওয়া ও তাঁর খেদমত করার সুযোগ করে দাও। 

ঐ বছর আমি শরহে বেকায়াতে পড়ি। ভেবে দেখলাম,। যদি আমি শায়খুল হাদিস রহ. এর প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী জামিআ রাহমানিয়ায় ভর্তি হতে পারি, তাহলেই আমার মনের আশা পূরণ হওয়া সম্ভব। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আমার এ আশা পূরণ হওয়া ছিল অসম্ভব। অন্যদিকে গ্রামের মাদরাসার সকল উস্তাদের সাথে ছিল আমার গভীর সম্পর্ক। তাই যাদের সান্নিধ্যে থেকে আমি এতটুকু আসতে পারলাম, তাদের ছেড়ে চলে আসা আমার জন্য ছিল এক কঠিন পরীক্ষা।

আল্লাহ তাআলার কারিশমা কে বুঝতে পারে?

রমজানের পূর্বে মাদরাসার আভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার কারণে উস্তাদগণের পরামর্শক্রমে রমজানের পর মাদরাসার জালালাইন থেকে উপরের জামাতগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এতে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঢাকা যাওয়ার একটি বাধা দূর হয়ে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, মাদরাসা যদি পরিবর্তন করতেই হয়, তাহলে ঢাকা গিয়ে শায়খুল হাদিস রহ. এর প্রতিষ্ঠিত জামিআ রাহমানিয়ায় ভর্তি হবো। কিন্তু আর্থিক অসুবিধা এত বেশি ছিল যে, ভর্তির টাকা যোগাড় করা আমার জন্য ছিল দুস্কর। তাই পুরো রমজান সালাতুল হাজত ও দুআয় মশগুল রইলাম। এদিকে মাদরাসা খোলার তারিখ ঘনিয়ে এসেছে, অথচ আমার ঢাকা যাওয়ার ভাড়াও যোগাড় করা সম্ভব হয়নি। তবুও আমি হাল ছাড়িনি বরং প্রতিজ্ঞা করেছি, যেভাবে হোক আমাকে ঢাকা যেতেই হবে (ইনশাআল্লাহ)। তাই নিয়ত করলাম কারো থেকে ভাড়ার টাকা ঋণ নিয়ে রাহমানিয়ায় চলে যাব এবং হযরত শায়খুল হাদিস রহ. এর কদম মুবারক চেপে ধরে হলেও হযরতের নিকট দু-চার সবক পড়ার সুযোগ করে নিব।

শাওয়ালের ৯ তারিখ আমার ঢাকা যাওয়ার কথা। সকালে আমি এক বন্ধুর নিকট কর্জে হাসানার জন্য যাই- কিন্তু তাকে না পেয়ে নিরাশ হয়ে ঘরে ফিরে আসি। কিন্তু আল্লাহর কুদরত কে বুঝতে পারে। আমার আম্মাজানও আমার মনের অবস্থা জানতেন তাই আল্লাহর দরবারে আমার আশা পূরণের জন্য কেঁদে কেঁদে দুআ করছিলেন। আল্লাহ পাক বলেছেন انما امره اذا اراد شيئا أن يقول له كن فيكون iii 

ঘরে প্রবেশ করে আম্মাকে হাসিমুখে দেখতে পাই। আম্মাজান বললেন, বাবা আল্লাহ পাক তোমার মনের আশা পূরণ করেছেন। তোমার পাশের বাড়ির জহিরুল ইসলাম কাকা কুমিল্লা থেকে এসেছিল। তোমাকে এক হাজার পাঁচশত টাকা দিয়ে গেছে। এ কথা শোনার সাথে সাথে আমার চোখে পানি এসে গেল। আমি প্রাণভরে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করলাম সেই সঙ্গে হিতাকাঙ্খী জহিরুল ইসলাম চাচার জন্যও প্রাণখুলে দুআ করলাম। তিনি এখনো বেঁচে আছেন। আল্লাহ তাআলা তার নেক হায়াত দারাজ করুন (আমিন)। 

অল্প সময়ের মধ্যেই সবকিছু গুছিয়ে আম্মাজানের কাছ থেকে দুআ নিয়ে বাড়ি থেকে রওয়ানা হলাম। মনে একটাই আশা জামিআ রাহমানিয়ায় ভর্তি হব এবং শায়খুল হাদিস রহ. এর সান্নিধ্য লাভ করব। দীর্ঘ সফর শেষে রাতে জামিআ রাহমানিয়ায় পৌঁছলাম। ইতোপূর্বে আমি ঢাকায় আসিনি, তাই সবকিছুতেই অপরিচয়ের একটা দূরত্ব আমাকে পীড়া দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল জগতে আমার চেয়ে অসহায় আর কেউ নেই। নিজেকে তখন এই বলে প্রবোধ দিলাম যে, শায়খুল হাদিস রহ. কে দেখলে হয়ত আমার এ অবস্থা কেটে যাবে। তাই তাঁকে একনজর দেখার জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে থাকলাম।

ছাত্রভাইদের থেকে জানতে পারলাম, আগামীকাল সকাল দশটায় মাদরাসায় ভর্তির কার্যক্রম শুরু হবে। তখন শায়খুল হাদিস রহ. আজিমপুরের বাসা থেকে মাদরাসায় আসবেন। রাতে অল্প সময় ঘুমালাম। সকাল দশটায় ভর্তিফরম বিতরণ শুরু হল। আমিও একটি ফরম সংগ্রহ করে পূরণ করলাম। একটু পরেই শুনতে পেলাম, শায়খুল হাদিস রহ. মাদরাসার দফতরে এসেছেন। 

হুজুরকে এক নজর দেখে আমি আমার হৃদয়ের জ্বালা মেটানোর জন্য জামিআর দফতরের দিকে এগোতে লাগলাম, কিন্তু ভর্তিচ্ছু ছাত্রদের ভিড়ের কারণে হুজুরের সঙ্গে মুসাফাহা করার সুযোগ পেলাম না। দরজা থেকে কেবল তাঁকে এক নজর দেখার সৌভাগ্য হল। আল্লাহর নিকট দুআ করলাম, ইয়া আল্লাহ, তোমার কুদরত দ্বারা যেভাবে শায়খুল হাদিস রহ. কে দেখার সুযোগ আমায় করে দিয়েছ, তেমনিভাবে আমাকে রহমানিয়ায় ভর্তির সুযোগ করে দিয়ে হুজুরের নিকটতম হওয়ার ও তাঁর খেদমত করার সুযোগ করে দিয়ো। এভাবেই শুরু হয় শায়খুল হাদিস রহ. এর সাথে আমার দৃষ্টির সম্পর্ক। যাক, তিনদিন পর ভর্তি পরীক্ষা, তাই সাত মসজিদের প্রতিটি গম্বুজের নিচে শুরু হল দুআ ও কান্না। মিনতি একটাই, আল্লাহ পাক যেন আমাকে রহমানিয়ায় ভর্তির সুযোগ করে দিয়ে শায়খুল হাদিস রহ, এর নৈকট্য অর্জন করার তওফিক দান করেন।

আল্লাহ বলেন لا تقتتوامن رحمة الله আল্লাহ পাকের অশেষ রহমত ও করুণায় জামিআ রাহমানিয়ায় ভর্তি হলাম এবং শায়খের শিস্যত্বলাভের গৌরব অর্জন করলাম। এজন্য আল্লাহর দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোন কিছু লেখার ইচ্ছা নেই, তাই ভর্তির সময়ে আমার আর্থিক কষ্টের কথাগুলো এখানে লিখছি না। আল্লাহ পাকের ফয়সালা হল والذين جاهدوا فينا لنهدينهم سبلنا ফারসী রা. কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ লাভের জন্য ৯০ বছর গোলামি করিয়েছেন আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একজন প্রকৃত আশেক, শায়খুল হাদিস রহ. এর পরশ ও সান্নিধ্য লাভের জন্য আমার কষ্ট ও কুরবানি যতই হোক না কেন, তা খুবই সামান্য ও নগণ্য।

ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি জালালাইন জামাতে দাখেল হই। ঐ বছরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় শায়খুল হাসিদ রহ, বিমানবন্দর ঘেরাও কর্মসূচী দিলেন। একারণে কয়েক মাস শায়খকে জেল খাটতে হল। ঐ বছর হুজুরের সাথে দু-তিনবার মুছাফাহা করার সৌভাগ্য হয়। এভাবে কেটে যায় রাহমানিয়ায় আমার প্রথম বছরটি। ১৯৯৪ সালে রমজানের পর আল্লাহ পাক মেশকাত জামাতে ভর্তির সুযোগ করে দিলেন।

বছরের শুরু থেকেই মনে মনে ফিকির করছিলাম, কিভাবে হুজুরের খেদমত করার সুযোগ পাওয়া যায়। তখন হুজুর প্রতিদিনই বাসা থেকে আসতেন এবং সবক পড়ানোর পর অন্যান্য প্রোগ্রামে চলে যেতেন; মাদরাসায় রাত্রিযাপন করতেন না, আমার যতটুকু মনে পড়ে, ঐ বছর হুজুর তিন বা চারদিন মাদরাসায় রাত্রি যাপন করেছিলেন। আমি একটি তেলের বোতল কিনে হুজুরের মাথায় তেল দিয়ে খেদমত করত: হুজুরের নিকটতম হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকি। মেশকাত জামাতে সবক চলাকালেই শায়খ রহ. দাওরায়ে হাদিসের সবক পড়িয়ে চলে যেতেন। তাই খেদমতের সুযোগ পাওয়াটা ছিল খুবই দুষ্কর। নিজেকে এই বলে আশ্বাস দিলাম যে, তোমার নিয়ত যদি সহিহ হয়, তাহলে আল্লাহ পাক সুযোগ করেই দিবেন।

একদিন সবক শেষে ছাত্রদের বিশ্রামের সময় আমি অফিস রুমে গিয়ে দেখলাম শায়খুল হাদিস রহ একাকী বসে বসে মাদরাসার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে দস্তখত করছেন। আমি এই সুযোগকে গনিমত মনে করে জলদি তেলের বোতল নিয়ে এসে দফতরের পিছন দিক দিয়ে হুজুরের কাছে বসলাম। এরপর শায়খের টুপিটি আলতোভাবে খুলে পাশে রাখলাম। শায়খুল হাদিস রহ, ঘাড় ফিরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তিনি কিছু বলার আগেই আমি বললাম, হুজুর আপনার মাথায় একটু তেল দিব। শায়খ কিছু না বলে নিজের কাজ শুরু করলেন। আমার দিলের মধ্যে তখন খুশির জোয়ার। 

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আল্লাহ তাআলা আমি অধমকে যুগশ্রেষ্ঠ আলেমেদ্বীন শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর খিদমত করার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাই দিলে দিলে অসংখ্যবার আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করলাম। মাথায় তেল দিতে গিয়ে আমার কিছুটা ভুল হচ্ছিল। মা যেমন ছোট ছেলেকে ভাতের লোকমা খাওয়ানো শিখিয়ে দেয়, উস্তাদ যেমন ছাত্রকে কলম ধরিয়ে লেখা শিখিয়ে দেন, ঠিক তেমনিভাবে শায়খুল হাদিস রহ, আমার মাথার টুপি খুলে আপন হাতে মাথায় তেল দেওয়ার নিয়ম শিক্ষা দিলেন। তখন থেকেই শুরু হয় আমার উপর শায়খুল হাদিস রহ. এর হাতের স্নেহ শীতল বরকতছায়া, যা আমার উপর অব্যাহত ছিল শায়খুল হাদিস রহ. এর মৃত্যু পর্যন্ত।
ঐ সময় হুজুর আমার নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করে মুখস্ত করে নিলেন, যা ইন্তেকাল পর্যন্ত ভুলেননি। এর প্রমাণ হল, শায়খুল হাদিস রহ. ইন্তেকালের দশদিন পূর্বে যখন বারডেম হাসপাতালে ভর্তি, তখন আমি আমাদের মাদরাসার সভাপতি ও ছাত্র নূরুল আলমসহ সাতজন শায়খকে দেখতে যাই। তখন শায়খের অবস্থা বড় করুণ। চোখ খুলে তাকাবার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন। কারো দিকে তাকিয়ে দেখেন না। 

আমি যখন মাথার পাশে গিয়ে সালাম করে চোখের পানি ছেড়ে বসে বললাম, হুজুর আমি আনিছুর রহমান। সাথে সাথে গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত একজন মানুষকে ডাকলে যেমনিভাবে তাকায়, ঠিক তেমনিভাবে হুজুর অনেক কষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন এবং আমার চোখের পানি দেখে মনে হয় মুখ নেড়ে এই কথা বলতে চেয়েছিলেন যে, কেঁদো না, তোমার সঙ্গে জীবনের প্রথম সাক্ষাতে আমি এক নজর তাকিয়ে মায়ার যে বন্ধন কায়েম করেছিলাম আজও তা অটুট রয়েছে। হয়ত আজ তোমার সঙ্গে আমার জিন্দেগির আখেরি মোলাকাত কিন্তু আমার রেখে যাওয়া দ্বীনের কাজগুলো পূর্ণ জিম্মাদারির সাথে আদায় করে আসলে কেয়ামতের ময়দানে তোমার সাথে আবার দেখা হবে। আল্লাহ পাকের নিকট দোআ করি, আল্লাহ যেন শায়খুল হাদিস রহ. এর রেখে যাওয়া কর্মজীবনের কাজগুলো আমাকে সঠিকভাবে সম্পন্ন করার তাওফিক দান করেন।

এভাবে শুরু হয় শায়খুল হাদিস রহ. এর সাথে আমার জীবনের সর্বপ্রথম খেদমতের মাধ্যমে মায়া-মুহব্বতের বন্ধন। আল্লাহ তাআলা শায়খুল হাদিস রহ. এর সাথে আমার এই বন্ধনকে কেয়ামত পর্যন্ত বাকি রাখুন এবং তাঁকে আমার নাজাতের উসিলা হিসেবে কবুল করুন।
এখানে উল্লেখ্য যে, ২০০৬ সালে শায়খুল হাদিস বহ কওমি মাদরাসার সরকারী স্বীকৃতির জন্য যখন টানা পাঁচদিন মুক্তাঙ্গনে অবস্থান করেছিলেন, তখন সেই আন্দোলনে আমি অধমকে আল্লাহ তাআলা কিছু মেহনত করার সুযোগ দিয়েছিলেন। একসময় হুজুর আমাকে ডেকে এনে বললেন, তুইতো অনেক মেহনত করছিস। তোর জন্য কি দুআ করব। আমি বললাম কেয়ামতের ময়দানে ও জান্নাতে যখন আপনি
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে থাকবেন, আমি যেন তখন আপনার সাথে থাকতে পারি সেই দুআ চাই। 

শায়খুল হাদিস রহ. কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, তুই তো আমাকে বেশি মহব্বত করছস। এই কথার দ্বারা আমি বুঝলাম যে, হুজুর এর দ্বারা ঐ হাদিসের দিকেই المرأ مع من أحب ইঙ্গিত করেছেন আল্লাহ তাআলা যেন আমাকে শায়খুল হাদিস রহ. এর সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসলিসে থাকার তাওফিক দান করেন। আমিন।

লেখক: প্রিয়ছাত্র, শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ:, খলিফা: শাইখ আব্দুল হাফিজ মাক্কী, প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ও শাইখুল হাদিস: জামিয়া বাবুস সালাম উত্তরা, ঢাকা