কওমি ও আলিয়ার সিলেবাস নিয়ে দুটি কথা
প্রকাশ: ১১ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:১০ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

|| মুহাম্মাদ আশরাফ ||

আলিয়ার সিলেবাস আমাদের কওমি সিলেবাসের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সহজ এবং ফলপ্রসূ। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো— এখানে অধিকাংশ বইই শাস্ত্রীয় আঙ্গিকের; একটি নির্দিষ্ট বইকে কেন্দ্র করে পুরো বিষয়কে আবদ্ধ না রেখে বিষয়ভিত্তিক ও দক্ষতাভিত্তিক পাঠদানের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী কোনো একটি কিতাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রের মৌলিক ধারণা, মূলনীতি, পরিভাষা, প্রয়োগ ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়গুলোতে একটি সামগ্রিক ধারণা লাভ করতে পারে।

অবশ্য শুধু সিলেবাস ভালো হলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। দক্ষতার সঙ্গে পাঠদান করা এবং শিক্ষার্থীদেরও গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে অধ্যয়ন করা—এই দুটো বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ পদ্ধতিতে পাঠদান করা হলে এবং ছাত্ররা বিষয়গুলো বুঝে, চিন্তা করে ও প্রয়োগের মানসিকতা নিয়ে পড়লে আলিয়া সিলেবাসের মাধ্যমেও দক্ষ ও শাস্ত্রজ্ঞ আলেম তৈরি করা সম্ভব। বাস্তবেও এর কিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন অনেক আলেম তৈরি হয়েছেন, যারা আলিয়া বা জেনারেল ধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পড়াশোনা করেও সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছেন।

অন্যদিকে, আমাদের কওমি সিলেবাসের বড় একটি অংশ নির্দিষ্ট কিতাবকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। একটি নির্দিষ্ট কিতাব পড়ানো, তার ইবারত বিশ্লেষণ করা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও হাশিয়া-শরাহ পড়া— এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করে। এই পদ্ধতিরও নিজস্ব শক্তি ও ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু এর একটি অনিবার্য দুর্বলতা হলো—অনেক সময় আমাদের ছাত্ররা শাস্ত্রের পরিবর্তে কিতাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা একটি কিতাব খুব ভালোভাবে পড়তে পারে, তার কঠিন ইবারত বুঝতে পারে, বহু কাওয়ায়িদ মুখস্থ বলতে পারে; কিন্তু সেই জ্ঞানকে বৃহত্তর শাস্ত্রের কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করা কিংবা নতুন কোনো বিষয়ের ওপর তা প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা থেকে যায়।

ফলে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন ছাত্র নাহু-সরফ, বালাগাত কিংবা ফিকহের বহু কিতাব পড়েছে; অসংখ্য কায়দা-কানুন মুখস্থ করেছে এবং পরীক্ষায় সেগুলো সুন্দরভাবে উপস্থাপনও করতে পারে। কিন্তু যখন তাকে নতুন কোনো ইবারত দেওয়া হয়, কোনো বাক্যের ইরাব করতে বলা হয়, নিজের ভাষায় একটি বিষয় বিশ্লেষণ করতে বলা হয় কিংবা বাস্তব কোনো সমস্যায় অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে বলা হয়, তখন তার সক্ষমতা প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রকাশ পায় না। মানে ইলম অর্জন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই ইলমের প্রয়োগক্ষমতা যথেষ্ট তৈরি হয়নি। শাস্ত্রজ্ঞ আলেম তৈরির পথে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।

আমার মনে হয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার এই জায়গাটিতেই—কিতাব পড়ার পাশাপাশি শাস্ত্র শেখানো এবং মুখস্থ জ্ঞানের পাশাপাশি প্রয়োগক্ষমতা তৈরি করা। একটি কিতাবের ইবারত পড়ানোর সময় ছাত্রকে শুধু সেই ইবারতের অর্থ বা ব্যাখ্যা বোঝানোই যথেষ্ট নয়; বরং সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রের মূলনীতি কী, এই আলোচনার সঙ্গে শাস্ত্রের অন্যান্য অধ্যায়ের সম্পর্ক কী, একই নীতি অন্য কোথায় কীভাবে প্রয়োগ হবে—এসব বিষয়ও তাকে বোঝানো প্রয়োজন।

বিশেষ করে নাহু, সরফ ও বালাগাতের ক্ষেত্রে তাতবিক বা প্রায়োগিক পাঠদানের গুরুত্ব অনেক বেশি। আমাদের ছাত্ররা নাহু-সরফ-বালাগাতের বহু কিতাব পড়ছে, অসংখ্য কাওয়ায়িদ কণ্ঠস্থ করছে এবং অনর্গল সেগুলো বলতে পারছে। কিন্তু সেই কাওয়ায়িদ বাস্তব ইবারতের মধ্যে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যেই দুর্বলতা থেকে যায়। অথচ একটি শাস্ত্রের প্রকৃত দক্ষতা কেবল তার সংজ্ঞা ও কায়দা মুখস্থ থাকার মধ্যে নয়; বরং প্রয়োজনের সময় সঠিক কায়দাটি চিনতে পারা এবং যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারার মধ্যেই তার প্রকৃত সার্থকতা।

এখানে আলিয়া বা জেনারেল সিলেবাসের আরেকটি বিষয় আমাদের জন্য বিশেষভাবে চিন্তার হতে পারে। তাদের পাঠ্যক্রমে অনেক ক্ষেত্রে তাতবিক বা প্রায়োগিক পাঠদান এবং সে অনুযায়ী পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা থাকে। শুধু ছাত্র বিষয়টি জানে কি না, তা যাচাই করা হয় না; বরং সে বিষয়টি বুঝেছে কি না, প্রয়োগ করতে পারে কি না এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে সক্ষম কি না— সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে শুরু থেকেই প্রয়োগভিত্তিক চিন্তাভাবনা তৈরি হয়।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও যদি কিতাবভিত্তিক পাঠদানের পাশাপাশি শাস্ত্রভিত্তিক পাঠদান এবং প্রায়োগিক শিক্ষাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া যায়, তাহলে এর ফল অত্যন্ত ইতিবাচক হতে পারে। প্রতিটি শাস্ত্রের মৌলিক কাঠামো, উদ্দেশ্য, গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা, মূলনীতি ও প্রয়োগক্ষেত্র শিক্ষার্থীদের সামনে স্পষ্ট করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিতভাবে এমন অনুশীলন ও পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে, যেখানে ছাত্রকে মুখস্থ সংজ্ঞা বা কায়দা বলার পরিবর্তে বাস্তব ইবারত, নতুন উদাহরণ, বিশ্লেষণ, প্রয়োগ ও সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে তার দক্ষতা প্রকাশ করতে হবে।

এতে ছাত্ররা কেবল একটি নির্দিষ্ট কিতাবের পাঠক হবে না; বরং ধীরে ধীরে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রের ছাত্র হয়ে উঠবে। কিতাব তখন তার কাছে লক্ষ্য না হয়ে শাস্ত্র বোঝার একটি মাধ্যম হবে। আর এভাবেই তৈরি হতে পারে এমন একজন আলেম, যিনি শুধু পূর্বনির্ধারিত কিতাবের আলোচনাই সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন না; বরং নতুন কোনো বিষয় সামনে এলে শাস্ত্রীয় মূলনীতির আলোকে সেটিকে বিশ্লেষণ করতে, বুঝতে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন।

আমাদের কওমি শিক্ষাব্যবস্থার রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য, গভীরতা এবং শক্তিশালী শাস্ত্রীয় ভিত্তি। তাই প্রয়োজন এই ঐতিহ্যকে বাদ দেওয়া নয়; বরং এর শক্তির সঙ্গে আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির কার্যকর দিকগুলো যুক্ত করা। নির্দিষ্ট কিতাবের গভীর অধ্যয়ন থাকবে, একই সঙ্গে কিতাবের বাইরেও শাস্ত্রের বিস্তৃত পরিসর সম্পর্কে ধারণা তৈরি হবে। মুখস্থবিদ্যা থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে অনুধাবন, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ। এতে আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু কিতাবপাঠে দক্ষ হবে না; বরং প্রকৃত অর্থে শাস্ত্রজ্ঞ, দক্ষ ও যুগোপযোগী আলেম হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।

আমার মনে হয়, আমাদের সিলেবাস ও পাঠদান-পদ্ধতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্তত এই দুই জায়গায় আরও গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করা দরকার— প্রথমত, নির্দিষ্ট কিতাবের গণ্ডি অতিক্রম করে শাস্ত্রভিত্তিক পাঠদান; দ্বিতীয়ত, তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি তাতবিক বা প্রায়োগিক শিক্ষার বিস্তৃতি। এই দুই বিষয়ে আমরা যত বেশি মনোযোগী হতে পারব, আমাদের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান তত বেশি গভীর, সুসংহত ও কার্যকর হবে। তখনই কওমি শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহ্য ও শক্তিকে অক্ষুণ্ণ রেখে  একটি আধুনিক প্রজন্ম তৈরি করা সম্ভব হবে।

লেখক: তরুণ লেখক, অনুবাদক ও চিন্তক

আইও/