
|
জুমার দিনে যেসব আমল করব
প্রকাশ:
০৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৩:১৯ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| শরিফ হাসানাত || শুক্রবার সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। আল্লাহ তাআলা এ দিনকে সম্মানিত ও বরকতময় করেছেন। এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের দিন; ইবাদত, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির দিন। এ দিনেই আমাদের আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং পরবর্তীতে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে। আবার কিয়ামতও সংঘটিত হবে এই শুক্রবারেই। তাই একজন মুমিনের উচিত এ দিনের ফজিলত উপলব্ধি করে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী দিনটি অতিবাহিত করা। ১. ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা ফজরের নামাজ দিয়েই শুরু হোক শুক্রবারের দিন। মসজিদে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা একজন মুমিনের ঈমান ও তাকওয়ার পরিচায়ক। মুমিন কখনো অলস ঘুমে বিভোর থাকতে পারে না। বিশেষ করে শুক্রবারের ফজরের গুরুত্ব আরও বেশি। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নামাজ হলো শুক্রবারের ফজরের জামাতের নামাজ।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৫৬) ২. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা নবী করিম (সা.) আমাদের একমাত্র আদর্শ ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। নবীপ্রেমে মগ্ন থাকা একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ নিজে তাঁর হাবিবের ওপর দরুদ পাঠ করেন এবং ফেরেশতারাও নবীজি (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করেন। তাই তাঁর উম্মত হিসেবে আমাদের নিয়মিত দরুদ পাঠ করা কর্তব্য। বিশেষ করে শুক্রবারে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা সুন্নত। আওস ইবনে আওস আস-সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শুক্রবার আসরের পর নির্দিষ্ট একটি দরুদ পাঠ করলে ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হয়—এ মর্মে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। দরুদটি হলো- আরবি: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ وَعَلَى آلِهِ وَسَلِّمْ تَسْلِيمًا বাংলা উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি, ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাল্লিম তাসলিমা।” অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি উম্মি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতিও রহমত বর্ষণ করুন। আর তাঁদের প্রতি পরিপূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা দান করুন।” ৩. সূরা কাহফ তিলাওয়াত করা শুক্রবারের অন্যতম আমল হলো সূরা কাহফ তিলাওয়াত করা। এটি ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। নিয়মিত সূরা কাহফ তিলাওয়াত করলে ঈমান দৃঢ় হয়। এ সূরায় ঈমান, ধৈর্য, দুনিয়ার মোহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর ওপর ভরসার শিক্ষা রয়েছে। সূরা কাহফের প্রথম বা শেষ দশ আয়াত মুখস্থ ও পাঠ করা দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার কারণ হবে বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। তাই মুমিনের জন্য বিশেষ করে জুমার দিনে সূরা কাহফ তিলাওয়াত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় আমল। আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জুমার দিনে সূরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত একটি নূর থাকবে।” (আল-মুস্তাদরাক, হাদিস: ৩৩৯২) ৪. গোসল, সুগন্ধি ও পরিচ্ছন্নতা শুক্রবারের নামাজে যাওয়ার আগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে গোসল করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং উত্তম পোশাক পরিধান করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) শুক্রবারের গোসলের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য (পরিচ্ছন্নতা ও উত্তম পোশাক) গ্রহণ করো।” (সূরা আল-আরাফ: ৩১) ৫. আগে আগে মসজিদে যাওয়া যত আগে মসজিদে যাওয়া যায়, তত বেশি সওয়াব লাভ হয়। প্রতিটি কদমে রয়েছে নেকি। লক্ষ্য করা যায়, অনেক দূরের মুসল্লিরা সময়মতো মসজিদে পৌঁছে যান, অথচ কাছের অনেক মুসল্লি দেরি করেন। এটি এক ধরনের অবহেলা ও অলসতা। অথচ আগে মসজিদে যাওয়ার মধ্যেও রয়েছে বড় ফজিলত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রথম সময়ে জুমার জন্য মসজিদে যায়, সে যেন একটি উট আল্লাহর পথে কোরবানি করল; এরপরের ব্যক্তির সওয়াব ক্রমান্বয়ে গরু, ভেড়া, মুরগি ও ডিম দানের সমতুল্য।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮১) ৬. মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা জুমার খুতবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। খুতবার সময় কথা বলা, মোবাইল ব্যবহার করা কিংবা অন্যকে চুপ থাকতে বলাও অনুচিত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দেন, তখন যদি তুমি তোমার সঙ্গীকে বলো, ‘চুপ থাকো’, তাহলেও তুমি অনর্থক কাজ করলে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫১) ৭. জুমার নামাজ গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করা জুমার নামাজ প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও মুকিম মুসলিম পুরুষের জন্য ফরজ ইবাদত। বড়দের দেখে শিশুরাও নামাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। তাই গুরুত্বের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।” (সূরা আল-জুমুআ: ৯) ৮. দোয়া কবুলের সময়কে কাজে লাগানো জুমার দিন অত্যন্ত বরকতময় ও ফজিলতপূর্ণ দিন। এ দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন বান্দার দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না। উলামায়ে কেরামের একটি শক্তিশালী মত হলো—আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টি এ বিশেষ মুহূর্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, যখন কোনো মুসলিম বান্দা আল্লাহর কাছে কল্যাণের দোয়া করলে তিনি তা কবুল করেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫২) ৯. বেশি বেশি জিকির, তাওবা ও ইস্তিগফার করা শুক্রবারকে শুধু জুমার নামাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারাদিন আল্লাহর স্মরণে অতিবাহিত করা উচিত। তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির, ইস্তিগফার ও কুরআন তিলাওয়াত হৃদয়কে প্রশান্ত করে এবং ঈমানকে শক্তিশালী করে। শুক্রবার একজন মুমিনের জন্য সাপ্তাহিক আত্মপর্যালোচনার দিন। সপ্তাহজুড়ে করা ভুল-ত্রুটি স্মরণ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, ভবিষ্যতের জন্য নতুন অঙ্গীকার করা এবং নেক আমলের পরিকল্পনা করা অত্যন্ত উপকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।” (সূরা আল-বাকারা: ১৫২) শুক্রবার আমাদের আত্মিক উন্নতির বিশেষ সুযোগ। এ দিনের প্রতিটি মুহূর্ত কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ, জিকির, দোয়া, জুমার নামাজ ও নেক আমলে ব্যয় করলে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের আশা করা যায়। তাই আসুন, শুক্রবারকে অলসতায় না কাটিয়ে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে অর্থবহ ইবাদতের দিনে পরিণত করি। কারণ একটি বরকতময় শুক্রবারই হতে পারে আমাদের জীবনের পরিবর্তনের এক পুণ্যময় অধ্যায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন। লেখক: আলেম ও কবি এসএইচ/ |