জুলাই বিজয়ে কওমী ক্যানভাস: এক নজরে আলেম সমাজের অবদান
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট, ২০২৬, ০৩:৪০ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

​২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এই যুগান্তকারী অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার পাশাপাশি আলেম-উলামা এবং কওমী মাদরাসা শিক্ষার্থীরা অনন্য ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। জুলাই বিপ্লবে ৭৭ জন মাদরাসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শাহাদাত বরণ করেছেন এবং হাজারের অধিক আহত হয়েছেন।

​স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সংহতি

​কওমী আলেমসমাজ বা মাদরাসা শিক্ষার্থীরা নিজস্ব কোনো ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে নয়, বরং সব ধরনের জুলুম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ইসলামের নীতির সঙ্গে মিল রেখে যৌক্তিক আন্দোলনে শরিক হন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের অভিভাবক মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুরের ‘জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রাম’ ঘোষণার ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালেও রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছেন আলেম ও মাদরাসা শিক্ষার্থীরা।

​আন্দোলনের শুরু থেকেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং এর অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ জোরালো ভূমিকা পালন করে। ১৮ জুলাই চরমোনাই পীর বাইতুল মোকাররমের উত্তর গেটে প্রতিবাদ সমাবেশে সরাসরি অংশ নেন। এরপর হাটহাজারী মাদরাসা, ঢাকার যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসা, চট্টগ্রামের নানুপুর ও পটিয়া মাদরাসাসহ দেশের বিভিন্ন কওমী মাদরাসার শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন।

​যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা রিদওয়ান হাসান ও ‘সাধারণ আলেম সমাজ’-এর ব্যানারে দেশের বরেণ্য আলেম ও গবেষকগণ—মাওলানা মূসা আল-হাফিজ, মুফতি হাবিবুল্লাহ মেসবাহ, মাওলানা আবদুল্লাহ আল-মাসউদ, মাওলানা উসামা সিরাজ, মাওলানা তানজিল আরেফিন আদনান ও মাওলানা আশরাফ মাহদি—বুক চিতিয়ে সংহতি সমাবেশ করেন। এমনকি ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সঙ্গে মিলিয়ে আলেম সমাজ ফারসি শব্দে ‘গাশত কর্মসূচি’ ঘোষণা করে বিপ্লবে একাকার হয়ে যান।

​মানবিক সেবা ও ঐতিহাসিক ভূমিকা

​বারিধারা মাদরাসার মানবিক সহায়তা: ১৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির সময় বারিধারা মাদরাসার প্রিন্সিপাল মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী মাদরাসার গেট উন্মুক্ত করে দেন। প্রায় ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবী ছাত্র আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পানি, শরবত, স্যালাইন এবং বিশ্রাম ও ওজুর ব্যবস্থা করেন।

​আহতদের চিকিৎসাসেবা: আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ আহত রোগীদের চিকিৎসায় ৫ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। ২০ আগস্ট বার্ন ইনস্টিটিউটে আহতদের দেখতে যান তিনি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।

​গ্রাফিতি শিল্প: লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়া মাদরাসার ছাত্র মাওলানা উসাইদ মুহাম্মদ ‘স্বাধীনতার সূর্যোদয়’সহ নান্দনিক আরবি-বাংলা ক্যালিগ্রাফি ও গ্রাফিতি এঁকে বিপ্লবকে বিশ্ববাসীর কাছে ফুটিয়ে তোলেন।

​সাহিত্যিক দলিল: কওমী আলেম ও গবেষক মাওলানা আবদুল্লাহ আল মাসউদ আন্দোলনের প্রামাণ্য ইতিহাস নিয়ে ২২৪ পৃষ্ঠার ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থান : স্মৃতিচারণ ও ইতিহাস’ নামক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

​শহীদ ও বীরত্বগাথা

​এই আন্দোলনে বেফাক কর্মকর্তা মাওলানা শিহাব উদ্দীন এবং যাত্রাবাড়ীর আলেমসমাজসহ বহু মাদরাসা শিক্ষার্থী ও শিক্ষক শহীদ হন। ৫ আগস্ট কারফিউ ভেঙে মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করিমসহ লক্ষাধিক জনতা বিজয়ের উল্লাসে রাজপথে নেমে আসেন।

​জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, দেশের সংকটময় মুহূর্তে কওমী আলেম সমাজ ও মাদরাসা শিক্ষার্থীরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সবসময় আপামর জনগণের পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে থাকে।

লেখক: বিভাগীয় সম্পাদক, দৈনিক কুমিল্লার জমিন (ধর্মীয় পাতা)

এসএইচ/