দীনি লেবাস ও নৈতিকতার বিতর্ক: বাস্তবতা বনাম ন্যারেটিভ
প্রকাশ: ১২ জুন, ২০২৬, ০৫:৫৩ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

|| জামালুদ্দীন মুহাম্মাদ খালিদ ||

দুনিয়ার কোন মানুষ ফেরেশতা না। লেবাসী, দীনদার, হুজুর সবাই-ই মানুষ। সুরত দিয়ে বা প্রফেশন দিয়ে কখনো চরিত্র মাপা যায় না। এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত জীবন আর অভ্যন্তরীণ চিন্তার অংশ। দীনি পরিবেশ বা উলামায়ে কেরাম চেষ্টা করেন এমন লাইফ স্টাইল ও ইনভায়রনমেন্ট তৈরি করতে, যেটা ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ শেখাতে বা সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে সহযোগিতা কলে। এর মানে সব লেবাসী, সব হুজুর, সব আলেম বিলকুল ফেরেশতা হয়ে যাবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই।

এখন আলেমের সংখ্যা পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। এখন দীনী লিবাসী মানুষের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে আলহামদুলিল্লাহ। মেয়েদের মধ্যে হিজাব, নিকাব পরার অভ্যস্ততাও পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যখন কোয়ান্টিটি বাড়ে, তখন কোয়ালিটি সমভাবে থাকে না। এটাই নিয়ম। কারণ সবাই তাকওয়ার নিয়তে লেবাস ধরে না। কেউ পারিপার্শ্বিক কারণে ধরে, কেউ ফ্যাশন হিসেবে আবার কেউ তো বদ নিয়তে। ফলে পোশাক দেখেই ইন জেনারেল একটা হুকুম দিয়ে ফেলার সুযোগ নেই।

আবার একটু চিন্তা করে দেখুন। আপনার চারপাশে হুজুর, দীনি লেবাসের, হিজাব/নিকাবী প্রচুর মানুষ আছে। আপনার বাসায় বাবা-মা, আপনার মসজিদের ইমাম, আপনার নিকটাত্মীয়, আপনার বন্ধু-বান্ধব। তো এদের মধ্যে কয়জন লেবাসধারী আর কয়জন প্রকৃত লেবাসী এটা কি কখনো চিন্তা করেছেন? আপনার মা-বাবার চরিত্র কি খারাপ দেখেন? আপনার মসজিদের ইমামের চরিত্র খারাপ হলে তার পিছনে নামায পড়তেন? আপনার নিকটাত্মীয় যে দ্বীন প্রেক্টিস করতে চেষ্টা করে, সে কি বাকি অনেকের চেয়ে ভাল নয়? আপনার বন্ধুদের মধ্যে আলেম, হুজুর, লেবাসী, হিজাবী ছেলেমেয়েরা কি সবাই চরিত্রহীন ভণ্ড, নাকি তাদের অধিকাংশই সাধারণ হিসেবে অন্যদের তুলনায় বেশ ভাল?

আগেই বলেছি পোশাক বা প্রফেশন দিয়ে চরিত্র মাপা যায় না। তাই আমি বলছি না শুধু দ্বীনি লাইনের বা দ্বীনি পোশাকের মানুষরাই ভাল। বাহ্যিকভাবে প্র্যাক্টিসিং মুসলিম না, কিন্তু চারিত্রিকভাবে দৃঢ় এমন মানুষের সংখ্যাও হিউজ। আর চারিত্রিক শুদ্ধতার জিনিসটা আর্থ-সামাজিক অবস্থানের সাথেও জড়িত। নিম্নমধ্যবিত্তের যে অপরাধ সবার চোখে পড়ে, আপার ক্লাসের লোকদের ক্ষেত্রে সেটাকে স্বাভাবিক মনে হয়। এটা আমাদের মাইন্ডসেট। আমাদের দেশের হুজুর বা দ্বীনি কমিউনিটি শ্রেণী হিসেবে নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তকে বিলং করে, সাধারণভাবে। এই আর্থ-সামাজিক দিকটাও মাথায় রাখবেন।

এই লম্বা ভূমিকা টানার কারণ হচ্ছে, ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়া ও মেইনস্ট্রিমের একটা প্রবণতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। জানি না এটা পরিকল্পিত নাকি দৈবক্রমে হচ্ছে। হঠাৎ করে দেখবেন মাদরাসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় পেশার লোকজনকে জড়িয়ে প্রচুর পরিমাণে চারিত্রিক অবনতির ঘটনা সামনে আসছে। নিউজগুলোকে এমনভাবে ধারাবাহিকতা দেওয়া হচ্ছে এবং সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে এমনভাবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে- যেন মাদরাসা মানেই বলাৎকারের আঁতুড়ঘর, হুজুর মানেই বলাৎকারকারী, হিজাবী মানেই তলে-তলে নৌকা চালায় ইত্যাদি। এমনকি হালালা সেন্টারের ঘটনায় একটা মহিলার কমেন্ট খুব চাউর হয়েছে যে, "আলেম বিয়ে করে বিপদে পড়েছি"।

এই যে ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে এটা অনেকটা বিএনপি বলতেই চাঁদাবাজ, জাশি বলতেই গুপ্ত/ রাজাকার এই ধরণের একটা প্রবণতা মনে হচ্ছে না? এটা কখন হচ্ছে হিসেব করেছেন? আসেন একটু চিত্র দেখাই-

  • গত এক দশকে কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে দীনি পোশাক কী হারে বেড়েছে খেয়াল করেছেন?
  • স্কুল-কলেজগুলোতে হিজাব/নিকাব যে মূল ড্রেসে পরিণত হয়েছে, ভেবে দেখেছেন?
  • হিফজ মাদরাসা ও ধর্মীয় স্কুলগুলোর কারণে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে, এটা খেয়াল করেছেন?
  • জুলাই অভ্যুত্থান, ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতে মাদরাসা শিক্ষার্থী বা ধর্মীয় ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রতিনিধিত্ব মোটামুটি সর্বোচ্চ বলা যায়।
  • সামাজিক শক্তি হিসেবে তো আগে থেকেই ছিল, ইদানীং রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও ডানপন্থা বা লোকাল ধর্মীয় প্রবণতা যথেষ্ট শক্তিশালী পক্ষ হয়ে উঠেছে।

এভাবে আরো সিরিয়াল করা যাবে। তো এগুলোকে ঠেকাতে হলে কী করতে হবে? প্রথম কাজ হবে ধর্মীয় মোড়ল গোষ্ঠীর মোরাল ব্যালিডিটি বা নৈতিক বৈধতা/পবিত্রতার উপর প্রশ্ন তৈরি করে দিতে হবে। এ কাজটা খুব বেশি কঠিনও হচ্ছে না। কারণ উপরেই বলেছি সংখ্যা বাড়লে মানে পতন ঘটে। ফলে বিপক্ষ শক্তি চাইলেই প্রচুর উদাহরণ সামনে নিয়ে আসতে পারবে ও পারছে।

আমি লেখাটা এজন্য লিখছি না যে, ধর্মীয় শ্রেণির চারিত্রিক শুদ্ধতার পক্ষে জোরালো অবস্থান তৈরি করতে হবে। বরং আমি এজন্য লিখছি যে, মানবিক দুর্বলতা কিছু মানুষের মধ্যে বা অনেক মানুষের মধ্যে পাওয়া গেলেই একথা প্রমাণিত হয় না যে, সেটা শ্রেণী ভিত্তিক সমস্যা। বরং শুদ্ধি অভিযান যেমন জরুরি, তেমনি কোন পক্ষ যেন ভুলভাল ন্যারেটিভ তৈরি করে আমাদের সামাজিক নৈতিক বাঁধকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে কিংবা রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক প্রতিবিপ্লব ঘটানোর চেষ্টায় সফল হতে না পারে, সে দিকেও নজর রাখতে হবে।

লেখক: তরুণ আলেম, চিন্তক ও ঢাবি শিক্ষার্থী

আইও