আমরা কেন মওদুদি সাহেবের বিরোধিতা করি-১
প্রকাশ: ০৯ জুন, ২০২৬, ০৬:৩৯ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

|| মাওলানা আতাউল করীম মাকসুদ ||

খেলাফত ও মুলুকিয়াত বইয়ে মাওলানা আবুল আলা মওদুদি সাহেব লেখেন, আরো একটি ঘৃণ্য বিদআত হজরত মুআবিয়ার শাসনকালে শুরু হলো। তিনি স্বয়ং এবং তার নির্দেশে সকল আঞ্চলিক প্রশাসক মসজিদের মিম্বরে বসে জুমার খুতবায় হজরত আলির বিরুদ্ধে গালমন্দের ঝড় বইয়ে দিতেন। এমনকি মসজিদে নববিতে রাসুল সা.-এর মিম্বরে বসে রওজা শরিফকে সামনে রেখে তারই প্রিয়তম পাত্রকে গালমন্দ করা হতো। হজরত আলির সন্তান ও তার নিকটজনকে নিজ কানে তা শুনতে হতো। শরিয়েতের কথা বাদ দিলে নিছক নৈতিক দৃষ্টিকোন থেকেও কারো মৃত্যুর পর তাকে গালমন্দ করা হৃদয়হীন অমানবিকতা ছাড়া কিছু নয়। [পৃষ্ঠা: ১৬১]

এই দাবি পুরোটা মিথ্যা, অসার ও বাস্তবতা বিবর্জিত। মওদুদি সাহেব যেসব কিতাবের সূত্রে তার দাবি উল্লেখ করেছেন, আমি সবগুলো ঘেটে দেখেছি। সেখানে তার দাবির স্বপক্ষে কোনো লেশ মাত্র নেই। হজরত মুআবিয়া রা. আলিকে গালি দিয়েছেন, অথবা গালি দেওয়ার জন্য কাউকে আদেশ করেছেন, এমন একটা সহিহ ও সরিহ বর্ণনা নেই। কোনো বাপের বেটা প্রমাণ করতে পারবে না।

মাওলানা মওদুদি সাহেবকে যারা ফলো করেন, তার আদর্শ অনুসরণ করেন, তারা এবিষয়ে দু একটি বর্ণনা সামনে এনে তা প্রমাণ করার ব্যর্থ কসরত করে থাকেন। জোড়া তালি, গোজামিল দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু, এটা তাদের অসত্য উচ্চারণ।

তারা যেসব বর্ণনা দ্বারা প্রমাণ করতে চান, এমন একটি বর্ণনা সম্পর্কে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি বলেন, ‘সহিহ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত, মুআবিয়া রা. হজরত আলি রা. এবং আহলে বাইতকে খুব সমীহ করতেন, তাদের মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন। বনু উমাইয়া কর্তৃক মিম্বরে দাঁড়িয়ে আলি রা.কে গালাগালির ঘটনা যেমন বাস্তবতার সঙ্গে যায় না, তেমনি বিবদমান দল দুটির দীনি মেজাজও তা স্বীকার করে না। আমরা বনু উমাইয়া যুগের নিকটতম সময়ে লেখা গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করলে দেখি, সেসব গ্রন্থে এগুলোর কোনো উল্লেখই নেই। এসব কল্পকাহিনি সাধারণত আব্বাসি যুগে রচিত ইতিহাসে এসেছে। তারা মানুষের কাছে বনু উমাইয়াকে কলঙ্কিত করার উদ্দেশ্যে এসব করেছেন।

ভিত্তিহীন এসব কল্পকাহিনি মাসউদি তার ‘মুরুজুজ জাহাব’ গ্রন্থে এবং অন্যরা তাদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এখান থেকেই এসব নষ্ট প্রচারণা আহলুস সুন্নাতের গ্রন্থসমূহে সংক্রমিত হয়েছে। কিন্তু এসব বর্ণনার কোনোটিই সুস্পষ্ট ও সহিহ নয়। এ দাবি সত্যায়নের জন্য জরাহ তাদিলের মানদণ্ড যাচাইকৃত বিশ্বস্ত সনদ ও মতনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু গবেষকদের কাছে তো এসব দাবির ওজন জানাশোনা ব্যাপার। মুআবিয়া রা. ছিলেন এমন অপবাদ থেকে নিরাপদ ও পবিত্র। তার সিরাত ছিল প্রশংসনীয়। অনেক সাহাবি ও তাবিয়ি তার প্রশংসায় গুণকীর্তন করেছেন। তার দীনদারি, ইলম, ন্যায়পরায়ণতা, সহনশীলতাসহ আরও অনেক গুণের স্বীকৃতি দিয়েছেন। এসব গুণ মুআবিয়ার ব্যাপারে প্রমাণিত সত্য। এধরনের সিরাত ও কৃতিত্বের ধারক ব্যক্তির পক্ষে এটা অসম্ভব যে, মিম্বরে দাড়িয়ে আলির মত ব্যক্তিকে গালাগাল ও অভিশাপ দিতে উসকানি দিবেন; যেখানে তিনি ছিলেন সম্মান ও মর্যাদার অবিভাজ্য অবস্থানে। এগুলো মূলত তার সুমহান চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের অপপ্রয়াস মাত্র। [মুআবিয়া ইবনু আবি সুফিয়ান : ৩১০।]

প্রিয় পাঠক, আলি সাল্লাবি কেবল এতটুকু বলে ক্ষান্ত হননি। তিনি তার দাবির স্বপক্ষে মজবুত পাঁচটি যুক্তি তুলে ধরেছেন। সংশ্লিষ্ট স্থানে দেখে নেয়ার অনুরোধ থাকল।

শুধু সাল্লাবি নয়, ইমাম নববি থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত অনেক মুহাদ্দিস ফকিহ এমনই লেখেছেন।

বর্তমানে যারা জামায়াতে ইসলামী করেন, তারা অনেকটা বিবেক বিবর্জিত, বাস্তবতা অনুধাবনে অক্ষম। ফাজিল, কামিল পাস অনেক ভাই দু লাইন আরবি ইবারত সহিহভাবে পড়তে সক্ষম নন। তাই, হাদিস ও তারিখের গভীর জ্ঞান নেই। ফলে প্রত্যাখ্যাত, বিবর্জিত, রাফেজিদের তৈরি বর্ণনার কাছে ধোঁকা খেয়ে যান তারা।

আল্লাহ আমার ভাইদের ক্ষমা করুন। হক গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন।

লেখক: মাদরাসা পরিচালক, লেখক ও চিন্তক

প্রতিনিধি/আইও