
|
মমতার কেন এই বিপর্যয়, বিজেপির কেন এই উত্থান?
প্রকাশ:
০৭ জুন, ২০২৬, ০৭:৩৫ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
গাজী ইয়াকুব কলকাতায় পড়াশোনার সময় সেই অবুঝ বয়স থেকেই মমতা ব্যানার্জিকে চিনতাম, যখন রাজ্য বিধানসভায় কংগ্রেসের পরে সিপিএম দীর্ঘ ৩৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। তিনি তখন কংগ্রেসের একজন লড়াকু যুবনেত্রী। যিনি সোমেনদাকে চ্যালেঞ্জ করে তাঁর জীবদ্দশাতেই কংগ্রেসের বিপরীতে গড়ে তোলেন তৃণমূল কংগ্রেস এবং বনে যান পার্টির চেয়ারম্যান। রাজ্য বিধানসভায় তেমন জায়গা করতে না পারলেও দিল্লি লোকসভায় বেশকিছু সিট নিয়ে তিনি এগোতে থাকেন। দিল্লিতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির সাথে জোট বেঁধে অটল বিহারী বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভায় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। কিছুদিন পর তেহলেকা ডট কম কাণ্ডের বিরোধে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে তিনি আবারো বাংলার রাজপথে চলে আসেন। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সিপিএমের বিরুদ্ধে কংগ্রেসকে টপকিয়ে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন। সিপিএমের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বাবু পরলোকগমনে ক্ষমতাসীন হন কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এই কমরেডকে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসেন কলকাতার কালীঘাটের টালিতে থাকা,হাওয়াই চটি পরা, সাদা কাপড়ে আবৃত চিরকুমারী শ্রী শ্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার হিন্দু মুসলিম সকলকে নিয়ে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন সেখানে বেশকিছু মুসলিম মন্ত্রীও ছিলেন। মহিলাদেরকে দেন লক্ষী ভান্ডার, ক্লাবে ক্লাবে বাজেট, স্কুলের বাচ্চাদেরকে সাইকেল, সরকারি বৃত্তি, মন্দির মসজিদ প্যাগরায় সরকারি ভাতা প্রদান। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ঘর বানানো। কলকাতায় নতুন মেট্রো রেল, রাজারহাট মুসলিম এরিয়াকে ইউরোপের আদলে দক্ষিণ সিটি বানানো ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু মহিলাটা বড্ড জেদি অনেকটা একরোখা। রাজনীতিতে নিজের ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জিকেও নিয়ে আসেন। বিধানসভার সদস্য না করে সরাসরি দিল্লি লোকসভার সদস্য বানান এবং দায়িত্ব দেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সেক্রেটারি হিসেবে। ভাইপো তোলাবাজিতে সবার মুখেমুখে নাম্বার ওয়ান। সর্বত্র একক আধিপত্য বিস্তার যা রাজনীতিতে ন্যাক্কারজনক সেদিন থেকেই সাথে থাকা অন্যান্য সহকর্মীরা পিসি ভাইপোর এই পারিবারিক রাজনীতি মেনে নিতে পারছিলেন না। আজকের মুখ্যমন্ত্রী সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিশির অধিকারীর ছেলে শুভেন্দু অধিকারীও মমতার দক্ষিণ হস্ত এবং দুই দুইটা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। ভাইপোর অতিসক্ষতা মেনে না নিয়ে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে পদত্যাগ করে সরাসরি বিজেপিতে যোগদান করেন। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে মমতাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে সেখানে বিজেপির পদ্মফুলের প্রার্থী হয়ে দু হাজার ভোটে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে হারিয়ে দিল্লি নেতৃত্বের দৃষ্টি কুড়াতে সমর্থ হন। পাড়া মহল্লায় হিন্দুত্ববাদকে জাগিয়ে তোলে হিন্দুদের ত্রাণকর্তা হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেন। প্রচন্ড ধর্মপাগল হিন্দুরাও তাকে আপন করে নেতা হিসেবে মেনে নেন। বাংলাদেশের কোন ঘটনা, পশ্চিমবাংলার ছোট থেকে ছোট ধর্মীয় ইসুতে প্রতিবাদী মুখর হয়ে হিন্দু জনগোষ্ঠীর মন কেড়ে নেন। স্বপ্ন দেখান এই এলাকাতে গো'মাতা তথা গরুকে হত্যা করতে দেওয়া হবে না এবং হিন্দু হোমল্যান্ডর প্রতিষ্ঠায় তিনি অনড় আপসহীন। ২০২১ থেকে ২৬ চলে আসলো, কেন্দ্রীয় বিজেপি হাই কমান্ড বারবার বাংলায় আসলেন, মুদি থেকে অমিত শাহ, নাড্ডা থেকে যোগী আদিত্যনাথ, সকলেই বাংলায় এসে ভোটের প্রচারণায় হিন্দুত্ববাদকে জাগিয়ে তুলেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পশ্চিমবাংলায় মুসলিম এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ৯০ লক্ষ ভোট বাতিল করে দেন তার একটা বিশাল প্রভাব পড়ে যায় ২৬ এর ভোটে। মমতা এদিক থেকে অনেকটা পিছিয়ে তিনি শুধু ফিল্ম পাড়ার সস্তা জনপ্রিয়তার অধিকারী নায়ক নায়িকা এবং উত্তর প্রদেশের মোলায়েম সিং যাদবের ছেলে অখিলেশ যাদবকে একবার প্রচারণায় নিয়ে আসছিলেন। তাতে হালে পানি পাওয়া যায়নি! অভিষেকের অতি মাতব্বরি জনগণের কাছে বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে। কলকাতা সেন্ট্রাল রোডে ঈদের জামাত,মুসলিমদের সাথে অতিরিক্ত খাতির যত্ন, মেটিয়াবুরুজের বিধায়ক ফরহাদ হাকিমকে কলকাতার মেয়র নির্বাচন এবং মুসলমানদের মাঝে মমতার উপস্থিতি হিন্দু ধর্মীয় জনগোষ্ঠী ভালোভাবে নেয়নি। এদিকে ২০২১ নির্বাচনে ফুরফুরার আব্বাস সিদ্দিকী মমতাকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে গঠন করেন আই এস এফ (ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট)। বামপন্থী সিপিএম এবং ভারতীয় রাজ্য কংগ্রেসকে নিয়ে মোর্চাও করেন। বিধায়ক নির্বাচিত হন তার আপন চাচাতো ভাই নওশাদ সিদ্দিকী। আবার পশ্চিমবাংলার মুসলমানদের আবেগ নিয়ে খেলা করা মুর্শিদাবাদের তৃণমূলের রাজ্যে বিধায়ক হুমায়ুন আইয়ুব ২৬ এর নির্বাচনের আগে নতুনভাবে বাবরি মসজিদ নির্মাণের জন্য কোটি কোটি টাকা তোলে নিজেও জাতীয় উন্নয়ন পার্টি নামে নতুন দল গঠন করে ১৯৮ টি আসনে প্রার্থীও ঘোষণা করে দেন। মুসলিমদের ভাগ তিন ভাগে বিভক্ত হওয়ায় যা মমতার জন্য ক্যান্সারের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায়। এত বছর ক্ষমতা থাকার পরেও মিডিয়া,হিন্দু ধর্ম গুরু, জয় শ্রীরাম স্লোগানের পরিবর্তে জয় বাংলা নানা কারণে বিষিয়ে ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মন। চলে আসলো ২০২৬ ইভিএম পদ্ধতি নির্বাচন, মমতার ভাষায় রাজ্যপাল, প্রধান নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন সবাই তার বিরুদ্ধে ঐক্যজোট হয়েছে। নির্বাচনের আগে বুথ ফেরত সমীক্ষা মমতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিল এবার পশ্চিমবঙ্গে হাওরে বাওরে জলে স্থলে পদ্মফুলই ফুটছে। মমতা ও তার দল সেগুলোকে মিডিয়ার কারসাজি বলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেই আবারও সরকার গঠন করবেন এই বিশ্বাসে অবিচল ছিলেন। কিন্তু না! সব জল্পনা কল্পনা উড়িয়ে হিন্দুদেরকে স্বপ্ন দেখানো দিল্লির নেতৃত্বকে মন যোগানো সেই শুভেন্দু অধিকারী বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে পশ্চিমবাংলাকে হিন্দু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপির হাতে তুলে দেন। বিজেপি নেতৃত্বও উদার,বিনয়ী, ঠান্ডা মাথার রাজনীতিবিদ রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য, আরেক কট্টর গেরুয়া শিবিরের অধিকারী সাবেক সভাপতি দিলীপ ঘোষ, মুম্বাইয়ের প্রসিদ্ধ নায়ক মিঠুন চক্রবর্তী, বিজেপির পরীক্ষিত মহিলা নেত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে না দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন শুভেন্দু অধিকারীকে। ক্ষমতা হারানোর একমাস না যেতে যেতেই মমতার ৮০ জন বিধায়কের ৬০ জনকে নিয়ে বহিষ্কৃত ঋতব্রত আরেকটি বিরোধীদল গঠন করেন। অভিষেকের মাথার উপরে চোর চোর বলে ডিম নিক্ষেপ করা হয়। আরেকদিকে বারাসাত ব্লকের দিল্লি লোকসভার এমপি ডক্টর কাকলি ঘোষ দস্তিদার ১৮ জন এমপি নিয়ে মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। বিধানসভা এবং লোকসভা সর্বত্রই তার বিরুদ্ধে অনাস্থা তৈরি করে আরেকটি তৃণমূল গঠিত হয়। তাসের ঘরের মত তছনছ হয়ে গেল মমতার দেড় দশকের সাজানো বাগান। তারপরও মমতা দমে না গিয়ে ভাতিজা অভিষেককে আগের দায়িত্বে বহাল রেখে রাজ্যে নতুন করে তৃণমূলের কমিটি ঘোষণা করেন। পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে এনালাইসিস করে দেখা যায় যে, একবার যারা ক্ষমতা থেকে চলে যায় দ্বিতীয়বার তারা ক্ষমতায় আসতে পারেন না। সেই ছাত্র জীবন থেকে অদ্যবধি আমার ক্ষুদ্র গবেষণায় যা বুঝতে পেরেছি , পশ্চিমবাংলায় বিজেপির পর সহসায় নিকটকালে কোনো সরকার আসতে পারবে না। সত্যি কথা বলতে কী, মমতার রাজনৈতিক কোনো আদর্শ নেই, নেই সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা। শুধু ব্যক্তিনির্ভর দল ভারতীয় উপমহাদেশে নয় পৃথিবীর কোথাও টিকে নাই। বিজেপির ক্ষমতা শেষ হতে হতে মমতারও হায়াত শেষ হয়ে আসবে। বিজেপি শুধু দিল্লিতে নয় ভারতের লোকাল ২০টি রাজ্যেও ক্ষমতায় আছে। তারা আঞ্চলিক দলগুলোকে শেষ করে দিয়েই ক্ষমতায় আছেন। প্রত্যেকের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে দ্বিতীয়বার আর ক্ষমতার স্বপ্ন দেখা সম্ভবপর নয়। আরেকদিকে প্রধানমন্ত্রী দামোদার দাস নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব অধিকাংশ হিন্দুদের কাছে অবতারের ন্যায়। তাদের মাঝে এই অন্ধবিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, মোদীজিই পারবে ভারতকে বিশ্ব দরবারে এগিয়ে নিতে এবং সর্ব ভারতে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করতে। পশ্চিমবাংলার মুসলিম সমাজই নয় পুরো ভারতের মুসলমানদেরকেই এখন নিজেদেরকে নিয়ে ভাবতে হবে তারা কি স্রোতে মিশে যাবে? না নীরব থাকবে! পশ্চিমবাংলার শতদা বিভক্ত মুসলিমরা এক না হলে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে তাদের বিপদের শেষ থাকবে না। মাইকে আজান, প্রকাশ্যে গরু কোরবানি, সরকারি অনুমতিবিহীন দারুল উলুম দেওবন্দ পরিচালিত মাদ্রাসা সবকিছুর উপরেই নিষেধাজ্ঞা চলে আসতেছে। ৭০ হাজার ইমাম মুয়াজ্জিনের ভাতা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সব মিলিয়ে যেটা বলবো মমতার সাম্রাজ্য সহসায় ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। লেখক: দাঈ ও সমাজসেবক আরএইচ/ |