
|
সোশ্যাল মিডিয়া: নেকির মাধ্যম নাকি গুনাহের ফাঁদ?
প্রকাশ:
২৭ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৫১ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| শরিফ হাসানাত || বর্তমানে প্রতিটি সেক্টরে প্রযুক্তির সরব উপস্থিতি দেখা যায়। পৃথিবীকে বেশ দ্রুত সময়ে বদলে দিয়েছে এই সোশ্যাল মিডিয়া। পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। সহজতর হয়েছে মানুষের যোগাযোগ মাধ্যম। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তে তথ্য আদান প্রদান করা যায়। অডিয়ো, ভিডিয়োতে কথা বলা যায়। জ্ঞান, শিক্ষা, ব্যবসা, দাওয়াহ ও মানবিক সহায়তা—সবকিছুর জন্য এটি এক বিস্ময়কর মাধ্যম। একই সঙ্গে মিথ্যা, অশ্লীলতা, অপবাদ, বিদ্বেষ ও সময় অপচয়েরও এক উন্মুক্ত দরজায় হিসেবেও পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির নিজস্ব কোনো নৈতিকতা নেই; নৈতিকতা নির্ধারণ করে ব্যবহারকারী। একটি ছুরি যেমন শল্যচিকিৎসকের হাতে জীবন বাঁচায়, আবার অপরাধীর হাতে প্রাণ কেড়ে নেয়—সোশ্যাল মিডিয়াও ঠিক তেমনি। এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের হাতে থাকা এই মাধ্যমটি কি আল্লাহর কাছে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে? লিপীবদ্ধ হচ্ছে প্রত্যেকটি কথা মানুষের কৃত কর্মকাণ্ডের যেমন হিসেব হবে, তেমনি হিসেব রাখা হবে তার কথাবর্তারও। ইসলাম এ কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁর বান্দাকে। আগে যেমন আমরা মুখে কথা বলতাম। এখন আঙুলের স্পর্শে বিভিন্ন লেখা টাইপ করি। স্ট্যাটাস লিখি, মন্তব্য করি, অন্যের লেখা শেয়ার করি। কিন্তু আমরা কি জানি? এসবও আমাদের আমলনামার অংশ। এরও হিসেব রাখা হয়। কয়েক মিনিটের একটি পোস্ট লিখে আমরা ভুলে গেলেও ফেরেশতারা কিন্তু তা ভুলেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন,“মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে একজন তৎপর প্রহরী তা লিপিবদ্ধ করার জন্য উপস্থিত থাকে।” (সূরা কাফ, ৫০:১৮) একটি পোস্টও হতে পারে সদকায়ে জারিয়া এক ক্লিকে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে আমাদের কথা বা লেখা। সেটি যদি হয় কুরআন-হাদিসের বাণী, উপকারী জ্ঞানের কথা কিংবা সৎ উপদেশ ইত্যাদি। এসব উত্তম কথামালা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। আলোকিত করতে পারে অন্ধকারে ডুবে কিছু হৃদয়কে। আপনার একটি ভালো পোস্ট যদি কাউকে নামাজে উদ্বুদ্ধ করে, কোনো যুবককে হারাম থেকে ফিরিয়ে আনে, কিংবা কাউকে কুরআনের দিকে আকৃষ্ট করে-তাহলে সেই পূণ্যের ধারাবাহিকতা আপনার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,“যে ব্যক্তি কল্যাণের দিকে আহ্বান করে, সে তা অনুসরণকারীদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে; তবে তাদের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না।”—সহিহ মুসলিম একটি শেয়ারও হতে পারে গুনাহের কারণ অপরদিকে, একটি মিথ্যা সংবাদ, অশ্লীল ভিডিয়ো, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য কিংবা কারও সম্মানহানিকর কনটেন্ট শেয়ার করাও বড় গুনাহের কারণ হতে পারে। বর্তমান সমাজে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়, অসংখ্য মানুষ না-জেনেই ভুয়া সংবাদ ছাড়াচ্ছেন। এসব মিথ্যা পোস্ট কারও সম্মান বিনষ্ট করছে। কখনো সমাজে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে। বিপদে ফেলছে নিরপরাধ কোনো না কোনো মানুষকে। আল্লাহ তাআলা বলেন,“হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও।” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৬) গীবত কেবল আড্ডায় নয়, টাইমলাইনেও হয় আগে মানুষ গল্পাড্ডায় বসে পরনিন্দা করতো। গীবত করতো মুখোমুখি বসে রসিয়ে রসিয়ে। এখন হয় ইনবক্সে, লাইভে কিংবা ভিডিয়োর নিচে কমেন্টে । কাউকে ব্যঙ্গ করা, অপমানজনক মিম বানানো, চরিত্রহনন করা কিংবা ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়ানো—এসব কেবল সামাজিক অপরাধ নয়; ইসলামের দৃষ্টিতেও গুরুতর পাপ। আল্লাহ তাআলা বলেন,“তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২) চোখ, কান ও হৃদয়েরও আছে জবাবদিহি সোশ্যাল মিডিয়ায় শুধু আমরা কী লিখছি, তা-ই নয়; আমরা কী দেখছি, কী শুনছি এবং কী অনুসরণ করছি—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। অশ্লীল কনটেন্ট, অনৈতিক বিনোদন, ঈমান দুর্বল করে এমন বিষয় কিংবা অন্তরে হিংসা সৃষ্টি করে এমন প্রদর্শন—এসব থেকে নিজেকে রক্ষা করাও একজন মুমিনের দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন,“নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এগুলোর প্রত্যেকটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হব”(সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬) সোশ্যাল মিডিয়া নিজে জান্নাতের পথও নয়, জাহান্নামের নয়। এটি একটি মাধ্যম মাত্র। এই মাধ্যমকে কোন পথে পরিচালিত করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত আমাদের। আমাদের প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি লাইক, প্রতিটি মন্তব্য এবং প্রতিটি শেয়ার—সবকিছুই একদিন আল্লাহর দরবারে উপস্থাপিত হবে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশের আগে যদি আমরা নিয়ত করি, “আমি এখানে এমন কিছুই করব, যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে,” তাহলে এই ডিজিটাল জগতও ইবাদতের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। মনে রাখুন, আপনার আঙুলের এক স্পর্শে যেমন একটি গুনাহ ছড়িয়ে পড়তে পারে, তেমনি ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন একটি নেকি, যার সওয়াব আপনার মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকবে। লেখক: আলেম ও কবি এসএইচ/ |