নামাজে গিয়ে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে দিশেহারা প্রতিবন্ধী মোশাররফ!
প্রকাশ: ০৭ জুন, ২০২৬, ১০:৫৫ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

মাগরিবের নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলেন মসজিদে। কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে দেখেন, নেই তার জীবিকার একমাত্র সম্বল। মসজিদের সামনে রেখে যাওয়া ভ্যানটি চুরি হয়ে গেছে। সেই থেকে দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক মো. মোশাররফ হোসেন।

৬১ বছর বয়সী মোশাররফের কাছে একটি ভ্যান শুধু যানবাহন ছিল না; সেটিই ছিল তার পরিবারের খাবার, ওষুধ আর বেঁচে থাকার ভরসা। প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত অসুস্থ মা, অসুস্থ স্ত্রী ও নিজের চিকিৎসাসহ পুরো সংসার।

গত ২ জুন উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া বড় জামে মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়তে যান তিনি। মসজিদের বাইরে ভ্যানটি রেখে ভেতরে প্রবেশ করেন। নামাজ শেষে বেরিয়ে দেখেন, প্রায় ৬৫ হাজার টাকা মূল্যের ভ্যানটি উধাও। এরপর সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান পাননি। পরে কুমারখালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোশাররফ বলেন, ‘চার দিন ধরে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। চেয়ারম্যানের কাছে গেছি, থানায় গেছি, নেতাদের কাছেও গেছি। কিন্তু ভ্যানের কোনো খোঁজ নেই। ওই ভ্যানটিই ছিল সংসারের সব। এখন ঘরে চাল আছে, কিন্তু তরকারি নেই। নুন-পানি আর পান্তা খেয়ে দিন পার করছি।’

তিন বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাঁ পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে অন্য কোনো কাজও তার পক্ষে সম্ভব নয়। ভ্যান চালিয়েই প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করতেন।

খয়েরচারা বাজার-ফুলতলা সড়কের পাশে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করেন মোশারফ। ছোট্ট সেই ঘরেই তার বৃদ্ধ মা নবিরন নেছা, স্ত্রী আলেয়া খাতুন এবং বেকার ছেলেকে নিয়ে কোনোমতে চলছে জীবন।

বৃদ্ধ মা নবিরন নেছা ছেলের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘নামাজ পড়তে গেছিল, ফিরে এসে দেখে ভ্যান নেই। তারপর থেকে ছেলেটা শুধু কাঁদে। ভ্যানটাই ছিল তার সবকিছু। পা ভাঙা, অন্য কোনো কাজও করতে পারে না।’

স্ত্রী আলেয়া খাতুনের অবস্থাও ভালো নয়। দুইবার স্ট্রোক করা এই নারী বলেন, ‘ওই ভ্যানের আয় দিয়েই ওষুধ কিনতাম, বাজার করতাম। এখন কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো ওষুধও খেতে পারছি না। সংসারের সবকিছুই থেমে গেছে।’

প্রতিবেশীরাও বলছেন, ভ্যান হারানোর পর পরিবারটি চরম সংকটে পড়েছে। নতুন ভ্যান কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য মোশারফের নেই। স্থানীয়দের মতে, একটি ভ্যানের ব্যবস্থা হলে আবারও নিজের শ্রমে সংসার চালাতে পারবেন তিনি।

এদিকে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, মাগরিবের নামাজের সময়ই ভ্যান চুরির ঘটনাটি ঘটে। মসজিদের সিসিটিভি ক্যামেরায় ঘটনাটি ধরা পড়েছে, তবে ফুটেজে চোরের পরিচয় স্পষ্ট নয়। তারপরও বিষয়টি নিয়ে সহযোগিতার চেষ্টা চলছে।

জেডএম/