
|
কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রয়েছে পরিবেশ বান্ধব সমাধান
প্রকাশ:
৩১ মে, ২০২৬, ০৮:১৯ রাত
নিউজ ডেস্ক |
|| মিনহাজ উদ্দীন আত্তার || ঈদুল আজহার আনন্দের রেশ এখনও বাতাসে ভাসছে। ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ, কোলাহল আর ত্যাগের মহিমায় মুখর চারপাশ। কিন্তু এই উৎসবের পরপরই আমাদের চেনা পরিবেশের চিত্র কিছুটা বদলে যায়। কোরবানির পশুর চামড়া শুকানোর গন্ধ, অলিগলি কিংবা ড্রেনে পড়ে থাকা হাড়, রক্ত ও বর্জ্যের স্তূপ—সব মিলিয়ে ঈদের পরবর্তী দিনগুলো এক ধরনের নাগরিক অস্বস্তির জন্ম দেয়। অথচ একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, উৎসবের সমান্তরালে যে বিপুল পরিমাণ জৈব বর্জ্য তৈরি হয়েছে, তা কোনো আবর্জনা নয়; বরং একটি মূল্যবান সম্পদ। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এই বর্জ্য দিয়েই দেশের হাজার হাজার একর জমির জন্য উন্নত মানের জৈব সার উৎপাদন করা সম্ভব। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা প্রতিবছর এই সম্ভাবনাময় সম্পদকে অবহেলায় নষ্ট করি, যার ফলে একদিকে পরিবেশ দূষিত হয়, অন্যদিকে কৃষির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হারিয়ে যায়। ঈদুল আজহা আমাদের শুধু ত্যাগের শিক্ষা দেয় না, দায়িত্ববোধেরও শিক্ষা দেয়। আর এই উৎসবের পর মাটি ও প্রকৃতির প্রতি আমাদের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৃষি ও নিরাপদ খাদ্যের চিরন্তন সংকট : নিরাপদ খাদ্যের মূল ভিত্তি হলো সুস্থ মাটি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক নির্ভরতার কারণে আমাদের অনেক কৃষিজমির উর্বরতা ও জৈবগুণ কমে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় জৈব সারের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। আমি কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাদ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। ‘কতকিছুর হাট’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক, খামারি ও ভোক্তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছি—মানুষ এখন শুধু খাদ্য চায় না, চায় নিরাপদ খাদ্য। কিন্তু নিরাপদ খাদ্যের শুরু বাজারে নয়, শুরু মাটিতে। যে মাটি সুস্থ, সেই মাটি থেকে জন্ম নেয় নিরাপদ ফসল। আর সেই সুস্থ মাটি গঠনের অন্যতম ভিত্তি হলো জৈব সার ও প্রাকৃতিক কৃষি ব্যবস্থা। ঈদের এই সময়ে যে বিপুল পরিমাণ পশুর বর্জ্য, গোবর ও জৈব উপাদান উৎপন্ন হয়, সেগুলোকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কম্পোস্টে রূপান্তর করা গেলে আমরা পেতে পারি উচ্চমানের জৈব সার। এটি শুধু মাটির স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনবে না, ফসলের গুণগত মানও বৃদ্ধি করবে এবং পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সময় এসেছে সনাতন ভাবনার পরিবর্তনের : তরুণ উদ্যোক্তারা যদি কৃষিকে শুধু চাষাবাদ হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক খাত হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে এই খাত থেকে কর্মসংস্থান, নিরাপদ খাদ্য এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি—তিনটিই অর্জন করা সম্ভব। কোরবানির বর্জ্যকে কেন্দ্র করে জৈব সার উৎপাদনও হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় গ্রিন বিজনেস মডেল। পরিশেষ: মাটির টানে, প্রাণের টানে : জৈব সার উৎপাদন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং তরুণদের কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। তখন ঈদের ত্যাগ শুধু ধর্মীয় অনুশীলনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পরিবেশ, কৃষি ও সমাজের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনবে। মাটি যাকে ডাকে, সে কখনো বেকার থাকে না। আসুন, মাটির প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করি। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলি। কারণ মাটি বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। লেখক: কৃষি উদ্যোক্তা, সংগঠক ও প্রশিক্ষক |