
|
বিদেশের মাটিতে পাহাড়ি ঈদ ও রোমাঞ্চকর অনুভূতি
প্রকাশ:
৩০ মে, ২০২৬, ১২:১৭ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
সকাল থেকেই শুরু হয়েছিল ঈদের নামাযের প্রস্তুতি। মনটা ক্ষণিকের জন্য উদাস হয়ে উঠেছিল। দেশে থাকলে হয়তো এতক্ষণে বাবা চাচাদের কাছ থেকে সালামি নেওয়ার ধুম পড়ে যেত। তবে এবার সেই শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ করলেন ওস্তাদ রাশেদুল হক সাহেব। তিনি সবাইকে ঈদের সালামি দিলেন। অবশ্য আমি আগেভাগেই পাকিস্তানের দির নামক পাহাড়ি শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ায় তা আর হাত পেতে নেওয়া হয়নি। রাজকীয় আতিথেয়তা ও নিরাপত্তার চাদর দির শহরে পা রাখতেই এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। এখানকার ছোট ছোট মেয়েরা চঞ্চল পায়ে এগিয়ে এসে আমার কাছে সালামি চাচ্ছিল যাকে ওদের স্থানীয় ভাষায় বলে ঈদী। পরবাসের বুকে এই চেনা আবদার মনটাকে এক নিমেষে ভালো করে দিল। এই পাহাড়ি শহরে আমাদের প্রতি স্থানীয়দের আতিথেয়তার কথা না বললেই নয়। আমি এবং আমার সফরসঙ্গী আব্দুল্লাহ বিন ইউনুস আমরা দুইজন এখানে এসেছি। অথচ আমাদের নিরাপত্তার খাতিরে আমরা যেখানেই যাচ্ছি আমাদের গাড়ির সামনে থাকছে পুলিশের স্কট পাইলট গাড়ি। প্রটোকলের এখানেই শেষ নয়। পুলিশ কর্মকর্তারা এসে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলছেন আপনাদের যথাযথ খেদমত করতে পারলাম না আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমাদের সার্বিক দেখাশোনার জন্য এমনকি পাকিস্তানের ইন্টেলিজেন্সের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে গেছেন এবং যেকোনো প্রয়োজনে তাদের জানাতে বলেছেন। শহরের সাধারণ মানুষের আন্তরিকতাও আমাদের মুগ্ধ করেছে। যার সাথেই দেখা হচ্ছে সেই পরম আপ্যায়নে জিজ্ঞেস করছে কী খাবেন? বলুন! অল্প কিছু হলেও আমাদের এখানে গ্রহণ করুন। আমরা যে বন্ধুর বাসায় উঠেছি তার গাড়ি নিয়েই আমাদের ঘুরে বেড়ানো। ভদ্রতাবশত তাকে বলেছিলাম ঘোরাঘুরি তো করব তবে পেট্রোল খরচ কিন্তু আমার। শুনে সে হেসে উত্তর দিল পেট্রোল খরচ তো দূরের কথা আমাদের এখানে মেহমান আসলে কার গাড়িতে চড়বে তা নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে মারামারি লেগে যায়। এক বন্ধু বলে আমার গাড়িতে চড়বে অন্যজন বলে আমারটায়। এই অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় যেকোনো মানুষ মুগ্ধ হতে বাধ্য। ঈদের দিন ও ভিন্ন সংস্কৃতির কুরবানি ঈদের নামায শেষে চমৎকার এক পরিবেশ তৈরি হলো। বাংলাদেশের মতোই চেনা আমেজে সবাই একে অপরের সাথে কোলাকুলি করছে। খুব ইচ্ছে ছিল এখানে গরু জবাই ও কুরবানির ব্যস্ততা দেখব। কিন্তু শুনলাম এই পাহাড়ি এলাকায় সবাই নিজ নিজ বাড়ির ভেতরেই কুরবানি করে। আর ঘরের ভেতর মা বোনরা থাকায় আমাদের পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কুরবানির কাটাকাটি দেখতে না পেরে প্রথমে কিছুটা মন খারাপ হয়েছিল। পরে এক স্থানীয় ব্যক্তির কাছে জানতে পারলাম পাহাড়ি অঞ্চলের বাড়িগুলো বেশ বড় বড় হওয়ায় তারা ঘরের ভেতরেই কুরবানি সারেন। অবশ্য রাজধানী ইসলামাবাদের দিকে বাংলাদেশের মতোই রাস্তাঘাটে কুরবানি দেওয়া হয়। দুপুর একটার দিকে আমরা গাড়ি নিয়ে একটা দূরবর্তী দর্শনীয় স্থানের উদ্দেশ্যে বের হই। সেখানে গিয়ে দেখি সবাই উৎসবের আমেজে ছবি তুলছে। তখন নিজের দিকে তাকিয়ে একটু খটকা লাগছিল। আমার নিজের ভালো জামাটি ময়লা হয়ে যাওয়ায় অন্য একজনের একটা জামা ধার করে পরেছিলাম। জামাটা আমার গায়ে ঠিকঠাক না বসায় মনের ভেতর মৃদু একটু আক্ষেপ কাজ করছিল। তবে চারপাশের রূপ খোদাই করা প্রকৃতির মাঝে সেই আক্ষেপ বেশিক্ষণ টিকল না। বরফগলা জলের স্পর্শ ও রোমাঞ্চকর পথ আমরা সাথে করে কিছু পানীয় নিয়ে গিয়েছিলাম যা রোদের তাপে ততক্ষণে প্রায় গরম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নদীর পানি এতটাই ঠাণ্ডা ছিল যে ক্যানের বোতলগুলো পানিতে ডুবিয়ে রাখার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা একদম চিলড ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মধ্যদুপুরের কড়া রোদের মাঝেও দূরের পাহাড়ের চূড়ায় জমে থাকা বরফ দেখা যাচ্ছিল। মন চাচ্ছিল ছুটে গিয়ে সেই বরফ ছুঁয়ে আসি কিন্তু দুর্গম পথ আর সেখানে যাওয়ার অনুমতি না থাকায় কেবল দূর থেকেই সেই মনমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে হলো। আমাদের ফেরার পথটি ছিল পাহাড়ের ঠিক মাঝখান দিয়ে একেবারে আঁকাবাঁকা এবং পেঁচানো। ড্রাইভ করার সময় সামান্যতম ভুল হলেই কয়েকশো ফুট নিচে ছিটকে পড়ার ভয়ংকর ঝুঁকি। রোমাঞ্চকর সেই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখের সামনে ভেসে উঠছিল অজস্র ছোট বড় ঝরনা। আজ এমন একটি ঝরনা দেখলাম যার পানি সরাসরি পাহাড় থেকে নেমে রাস্তার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে অন্য একটি খালে মিশছে। পাহাড়ের গা বেয়ে অনবরত নামতে থাকা এই মিষ্টি পানির উৎসগুলোকে স্থানীয় মানুষ দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছে। বহু জায়গায় পাহাড়ের গায়ে চিকন পাইপ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে যা দিয়ে দিন রাত অবিরাম পানি ঝরছে। এক জায়গায় দেখলাম পাইপের মুখে একটা কাঁচের গ্লাস ঝুলানো। যার তৃষ্ণা পাচ্ছে সে-ই গাড়ি থামিয়ে পরম তৃপ্তিতে ঠাণ্ডা ও সুপেয় পাহাড়ি পানি পান করে চলে যাচ্ছে। প্রকৃতির এই অপার বিস্ময় আর মানুষের এমন সহজ সরল জীবনযাত্রা সত্যিই আমাদের ভীষণভাবে অবাক ও বিমোহিত করেছে। মাহমুদুল হাসান, |