
|
জ্ঞানসাগরের ডুবুরিরা
প্রকাশ:
২৬ মে, ২০২৬, ০৭:০৯ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
|| হযরত মাওলানা আনওয়ার শাহ আযহারী || কোনো কিতাব একবার পড়ে শেষ করে দেওয়াই ইলম অর্জনের প্রকৃত পদ্ধতি নয়; বরং একটি কিতাব বারবার পাঠ করা, তার ইবারত নিয়ে চিন্তা করা, মুসান্নিফের উদ্দেশ্য অনুধাবন করা এবং প্রতিটি পুনঃপাঠে নতুন নতুন ফায়েদা আহরণ করাই হলো প্রকৃত তালিবুল ইলমের বৈশিষ্ট্য। ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, ওলামায়ে কেরামের বহু মনীষী এমন ছিলেন, যারা একটি কিতাব শতবার, এমনকি হাজারবার পর্যন্ত পাঠ করেছেন। কেউ সহীহ বুখারী বারবার পড়েছেন, কেউ ইমাম শাফেয়ীর রিসালা, কেউ বা গাজ্জালীর ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন কিংবা ইবনু মালিকের আলফিয়্যা অসংখ্যবার অধ্যয়ন করেছেন। তাঁদের এই পুনঃপাঠ কেবল মুখস্থ করার জন্য ছিল না; বরং প্রতিবার পাঠে তাঁরা নতুন জ্ঞান, সূক্ষ্ম তাৎপর্য ও গভীর উপলব্ধির দরজা উন্মুক্ত হতে দেখেছেন। কারণ ইলম এমন এক নূর, যা ধৈর্য, মুজাহাদা ও ধারাবাহিক মুতালাআ ছাড়া অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। একটি কিতাবের সঙ্গে দীর্ঘ সঙ্গই মানুষকে সেই কিতাবের ভাষা, রূহ ও মাকসাদের সঙ্গে পরিচিত করে তোলে। বর্তমান যুগে আমাদের বড় একটি দুর্বলতা হলো—আমরা অনেক কিতাব স্পর্শ করি, কিন্তু খুব কম কিতাব গভীরভাবে পড়ি। ফলে জ্ঞানের বিস্তৃতি কিছুটা অর্জিত হলেও গভীরতা সৃষ্টি হয় না। অথচ আমাদের আকাবির ও আসলাফের পদ্ধতি ছিল ঠিক তার বিপরীত। তাঁরা অল্প কিতাব নিয়ে দীর্ঘ সময় কাটাতেন, বারবার পাঠ করতেন, নোট লিখতেন, আলোচনা করতেন এবং সেই কিতাবকে জীবনের অংশ বানিয়ে নিতেন। অতএব, আমাদেরও উচিত ওলামায়ে কেরামের এই বরকতময় পথ অনুসরণ করা। একটি উপকারী কিতাব নির্বাচন করে তা বারবার পড়া, গুরুত্বপূর্ণ অংশ দাগিয়ে রাখা, নোট নেওয়া এবং প্রতিটি পুনঃপাঠে নতুন উপলব্ধি অর্জনের চেষ্টা করা। কেননা পুনরাবৃত্ত পাঠই ইলমকে মজবুত করে, স্মৃতিকে স্থায়ী করে এবং একজন তালিবুল ইলমকে গভীর গবেষণা ও প্রজ্ঞার পথে এগিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইলমের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করার এবং সালাফে সালেহীনের এই মহান ধারাবাহিকতা বজায় রাখার তাওফিক দান করুন। আমীন। নিম্নে ওলামায়ে কেরামের একই কিতাবকে বারবার পাঠ করার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা পেশ করা হলো ▪️ ইবনু হিশাম «আলফিয়্যাতু ইবন মালিক» এক হাজার বার পাঠ করেছিলেন! ▪️ গালিব ইবন আতিয়্যা আল-মুহারিবি «সহীহ আল-বুখারী» সাতশত বার পাঠ করেন। ▪️ আবু বকর আল-আবহারি (মৃত্যু ৩৭৫ হি.) «মুখতাসার ইবন আবদিল হাকাম» পাঁচশত বার পাঠ করেছিলেন। ▪️ ইমাম নববী গাজ্জালীর «আল-ওয়াসীত» চারশত বার অধ্যয়ন করেন। ▪️ আবু সাঈদ আল-বারদাঈ মুহাম্মদ ইবন হাসানের «আল-জামি‘ আল-কাবীর» চারশত বার পাঠ করেন। ▪️ ইয়েমেনি সুলাইমান আল-আলাভী «সহীহ আল-বুখারী» দুইশত আশি বার পাঠ করেন। ▪️ বাগদাদের ইবন আল-বাত্তী «জুয্ আল-বানিয়াসি» দুইশত বার পাঠ করেন। ▪️ নাফীসুদ্দীন আল-আলাভী (মৃত্যু ৮২৫ হি.) «সহীহ আল-বুখারী» একশত পঞ্চাশ বার পাঠ করেন। ▪️ মুসনিদ মুসাঈদ বশীর «সহীহ আল-বুখারী» একশত ত্রিশ বার পাঠ করেন। ▪️ আসীলুদ্দীন আল-হারাভী «সহীহ আল-বুখারী» একশত বিশ বার পাঠ করেন। ▪️ আহমদ আল-উলাওনা «আল-আ‘লাম» (যারকালীর রচনা) একশত বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবদুল্লাহ ইবন আকীল «তাফসীরুল ঈজি» একশত বার অধ্যয়ন করেন। ▪️ শাইখ হাম্মাদ আল-আনসারী যাহাবীর «মীযানুল ই‘তিদাল» একশত বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবু ইসহাক আল-হুয়াইনি ইবন আবি হাতিমের «আল-ইলাল» একশত বার পাঠ করেন। ▪️ মুহাম্মদ ইবন মুকবিল আত-তাজির «সহীহ আল-বুখারী» পঁচানব্বই বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবু ইসহাক আল-হুয়াইনি «মুযাক্কারাতুশ শাযলী ফি হারব অক্টোবর» নব্বই বার পাঠ করেন। ▪️ ইবন আতীফ (মৃত্যু ৮৮৬ হি.) «আল-কাফী» আশি বার পাঠ করেন। ▪️ আলী আল-কুরায়দী (মৃত্যু ৮৮৬ হি.) «আল-কাফী» আশি বার পাঠ করেন। ▪️ তাঁদের একজন «আল-আসাদিয়্যা» পঁচাত্তর বার পাঠ করেছিলেন। ▪️ আল-মুযানী ইমাম শাফিঈর «আর-রিসালা» সত্তর বার পাঠ করেন। ▪️ ইবন মুহাররিয আল-আবনাসী «আত-তাওযীহ» সত্তর বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবু ইসহাক আল-হুয়াইনি মু‘আল্লিমীর «আত-তানকীল» সত্তর বার পাঠ করেন এবং নিজ হাতে নকলও করেন! ▪️ হাজ্জার ইবন আশ-শিহনা «সহীহ আল-বুখারী» সত্তর বার পাঠ করেন। সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী ইবনুল মুকাফফা রচিত «কালিলা ওয়া ধিমনা» 70 বার পাঠ করেছেন ▪️ ইমাম ইবন বায ইমাম নববীর «শরহ সহীহ মুসলিম» ষাট বার পাঠ করেন। ▪️ ইবন আর-রাফ্ফা আশ-শাফিঈ «জুয্ ইবন আরাফা» ষাট বার পাঠ করেন। ▪️ মুহাম্মদ আল-জামানী (মৃত্যু ১১৭০ হি.) «মুখতাসার খলীল» ষাট বার পাঠ করেন। ▪️ আবু সাঈদ আল-হিল্লী «মাকামাতুল হারীরী» ষাট বার পাঠ করেন। ▪️ বুরহানুদ্দীন আল-হালাবী «সহীহ আল-বুখারী» ষাট বার পাঠ করেন। ▪️ ইবন আল-কালাওতাতী (মৃত্যু ৮৩৫ হি.) «সহীহ আল-বুখারী» ষাট বার পাঠ করেন। ▪️ আল-কিরমানী «সহীহ আল-বুখারী» ষাট বার পাঠ করেন। ▪️ সিবত ইবন আল-আজামী «সহীহ আল-বুখারী» ষাট বার পাঠ করেন। ▪️ মূসা ইবন সা‘আদাহ (মৃত্যু ৫১৪ হি.) «সহীহ আল-বুখারী» ষাট বার পাঠ করেন। ▪️ আবদুল গনী আবদুল খালিক ইমাম শাফিঈর «আর-রিসালা» পঞ্চাশ বার পাঠ করেন। ▪️ আলী ইবন আবদুর রহমান আল-হুসাইনি গাজ্জালীর «ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন» পঞ্চাশ বার পাঠ করেন। ▪️ আবদুল্লাহ আল-লুগবী আল-আবদালী «তাহযীব সীরাহ ইবন হিশাম» পঞ্চাশ বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ ওয়ালিদ আস-সাঈদান «আর-রাওদুল মুরাব্বা‘» ঊনপঞ্চাশ বার পাঠ করেন। ▪️ ইবন আসাকির আল-কূসী গাজ্জালীর «আল-ওয়াসীত» আটচল্লিশ বার পাঠ করেন। ▪️ আবু বকর আল-আবহারি ইমাম মালিকের «আল-মুয়াত্তা» পঁয়তাল্লিশ বার পাঠ করেন। ▪️ ইমাম ইবন বায ইবনুল কাইয়্যিমের «আ‘লামুল মুওয়াক্কিঈন» চল্লিশ বার পাঠ করেন। ▪️ আবদুর রহমান আল-আইদারূস (মৃত্যু ৯২৩ হি.) গাজ্জালীর «ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন» চল্লিশ বার পাঠ করেন। ▪️ আলী আস-সালিম আলে জুলায়দান «আর-রাওদুল মুরাব্বা‘» চল্লিশ বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ মাশহুর হাসান সালমান ইবনুল কাইয়্যিমের «আ‘লামুল মুওয়াক্কিঈন» ত্রিশ বার পাঠ করেন। ▪️ ইবনুস সিরাজ আস-সিজিলমাসী (মৃত্যু ১০৫৭ হি.) «তাফসীরুল কাশশাফ» ত্রিশ বার পাঠ করেন। ▪️ সাহিত্যিক আলী আত-তানতাভী «আল-ফারাজ বা‘দাশ শিদ্দাহ» ত্রিশ বার পাঠ করেন। ▪️ সাহিত্যিক আলী আত-তানতাভী মানফালুতীর «আন-নাযারাত» ত্রিশ বার পাঠ করেন। ▪️ আর-রবী‘ ইবন সুলাইমান ইমাম শাফিঈর «আর-রিসালা» ত্রিশেরও অধিক বার পাঠ করেন। ▪️ আবদুর রহমান ইবন আলী আল-হুসাইনি গাজ্জালীর «ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন» পঁচিশ বার পাঠ করেন। ▪️ ইবন আল-আজামী আল-কালবী শিরাজীর «আল-মুহায্যাব» পঁচিশ বার পাঠ করেন। ▪️ ইবন ঈসা আল-আন্দালুসী «কিতাবু সীবাওয়াইহ» চব্বিশ বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবু ইসহাক আল-হুয়াইনি যাহাবীর «সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা» চব্বিশ বার পাঠ করেন। ▪️ ইরাকের ফকীহ আয-যারীরানী ইবন কুদামাহর «আল-মুগনী» তেইশ বার পাঠ করেন, আর প্রতিবারই তাতে টীকা লিখতেন! ▪️ শাইখ হাম্মাদ আল-আনসারী ইবন হাজরের «ফাতহুল বারী» বিশ বার পাঠ করেন। ▪️ আল-মারগীনানী (মৃত্যু ৫৯৩ হি.) «আল-হিদায়াহ» আঠারো বার পাঠ করেন। ▪️ ডক্টর আহমদ মা‘বাদ ইবন হাজরের «ফাতহুল বারী» আঠারো বার পাঠ করেন। ▪️ আহমদ ইবন মুহাম্মদ আল-হাদী (মৃত্যু ১০৪৫ হি.) গাজ্জালীর «ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন» চৌদ্দ বার পাঠ করেন। ▪️মুফতি আজম ফয়জুল্লাহ ইন্তেকালের বৎসর বুখারী শরীফ 13 বার পাঠ করেছেন ▪️ শাইখ আবদুল আজীয ইবন মুকাইরিন «তাফসীর ইবন কাসীর» দশ বার পাঠ করেন। ▪️ মুহাম্মদ আল-গাইসী আত-তাব্বাঈ শিরাজীর «আল-মুহায্যাব» নয় বার পাঠ করেন। ▪️ আহমদ হুতাইবাহ ইবন কুদামাহর «আল-মুগনী» আট বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ সালিহ আল-লুহাইদান আসফাহানীর «আল-আগানী» সাত বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবদুস সালাম হারূন জাহিযের «আল-হাইওয়ান» সাত বার পাঠ করেন। ▪️ ইমাম ইবন বায ইবন কাসীরের «আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ» সাত বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবদুল্লাহ ইবন সা‘দান «আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ» সাত বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবদুল করীম আল-খুদাইর আহমদ আমীনের «হায়াতী» ছয় বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ নাসির উদ্দিন আল-আলবানী «মুসনাদে ইমাম আহমদ» ছয়বার খতম করেন। ▪️ আমীর শাকীব আরসালান আসফাহানীর «আল-আগানী» পাঁচ বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ বকর আবু যায়দ «আসারুল বশীর আল-ইবরাহীমী» পাঁচ বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ বকর আবু যায়দ যারকালীর «আল-ই‘লাম» পাঁচ বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবদুল করীম আল-খুদাইর ত্বাহা হুসাইনের «আল-আইয়াম» পাঁচ বার পাঠ করেন। ▪️ ড. আবদুর রহমান ইবন মু‘আযাহ আশ-শাহরী «তাফসীরুল কুরতুবী» পাঁচ বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবদুল আজীয আল-উওয়াইদ যাহাবীর «সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা» পাঁচ বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ বকর আবু যায়দ হামাভীর «মু‘জামুল বুলদান» চার বার পাঠ করেন। ▪️ সাহিত্যিক আলী আত-তানতাভী আসফাহানীর «আল-আগানী» তিন বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবদুল আজীয আল-উওয়াইদ «উলামাউ নাজদ» তিন বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ মুহাম্মদ আল-গালাওয়ী ইবন হাজরের «ফাতহুল বারী» তিন বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ মাহমুদ শাকির «লিসানুল আরব» তিন বার পাঠ করেন। ▪️ শাইখ আবিদ আস-সিন্দীর প্রতি মাসে “কুতুবে সিত্তাহ” খতমের অভ্যাস ছিল। ▪️ আবু আবদুল্লাহ আল-ইউনায়নী (মৃত্যু ৭০১ হি.) প্রতি মাসে «সহীহ আল-বুখারী» পাঠ করতেন। মহান গ্রন্থ একবার পড়লেই তার হক আদায় হয় না; পুনরাবৃত্তিই জ্ঞানকে হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। যে বলে—“আমি পড়ি, কিন্তু কিছুই মনে থাকে না”, তাকে বলা হয়: “তাঁদের মতো বারবার পড়ো; তবেই জ্ঞান স্থায়ী হবে।” লেখক: সিনিয়র শিক্ষক, জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম আইও/এমএম |