স্মৃতির পাতায় নিভৃতচারী মনীষী, দাদাজান মাওলানা তমীজুদ্দীন রহ.
প্রকাশ: ২৬ মে, ২০২৬, ০৩:১১ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| মাওলানা বুরহানুদ্দীন বিন সাদ ||

বড়দের জীবনী পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আদর্শ ও অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে এমন অনেক মনীষী ছিলেন যারা এ-দেশের মানুষের ইমান-আমল ও নীতি-নৈতিকতা শেখাতে নিজের জীবনকে কোরবান করে দিয়েছেন। এমনি এক মনীষী আমার শ্রদ্ধেয় দাদাজান, কুমিল্লার নাঙ্গলকোট কামিল মাদরাসার সাবেক মুহাদ্দিস—মাওলানা তমীজুদ্দীন (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)। তিনি ছিলেন আকাবির-আসলাফের বহু সিফাত বা গুণের নীরব বাহক। আজীবন যদিও তিনি পড়িয়েছেন সরকারি মাদরাসায়, তবে চিন্তা-চেতনায় ছিলেন দেওবন্দি মাসলাকের অনুসারী। দাওয়াত ও তাবলিগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তাবলিগের মেহনত নিয়ে বিশ্বের দেশ-বিদেশে সফর করেছেন। ফেদায়ে মিল্লাত মাওলানা আসআদ মাদানি (রহ.)-সহ বহু আকাবির বুজুর্গের সান্নিধ্য পেয়েছেন তিনি।

কিছুদিন আগে নানাজান মুফতি আব্দুল আজিজ (রহ.)-এর স্মারকের কাজের তাগিদে গিয়েছিলাম—বিদগ্ধ আলেমে দীন মুফতি হিফজুর রহমান (দা.বা.)-এর কাছে। তিনি নানাজানের জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার দাদা কে? দাদার পরিচয় কী?’

আমি দাদাজানের পরিচয় দিলাম। শোনে তিনি বললেন, ‘তোমার দাদার জীবনীটাও সংরক্ষণ করার চেষ্টা করো। মনে হচ্ছে তাঁর জীবনেও শিক্ষণীয় অনেক বিষয় আছে।’

আমি আব্বুকে বললাম বিষয়টা। তিনি উৎসাহ দিলেন। বললেন, ‘ঠিক আছে, তুই কাজ শুরু কর। আমি আছি পাশে।’

বড় দোটানায় দিন কাটে আমার—কী থেকে কী লেখি দাদাজানকে নিয়ে! তাঁকে নিয়ে ভালো কিছু লেখার সাধ্য তো আছে তাদেরই—যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, উপলব্ধি করেছেন তাঁর আচরণবিধি ও জীবনাচার। দাদাজান যখন আমাদের ছেড়ে চলে যান, তখন আমি অবোঝ। তাঁকে বোঝার বা উপলব্ধি করার বয়সটুকুই হয়নি। তবে সেই ছোট্ট থেকে বড়দের মুখে তাঁর হৃদয়জাগানিয়া গল্প শোনে আমার বেড়ে ওঠা।

দাদাজানের স্মৃতি যদিও আমার তেমন একটা মনে নেই। তবুও যে-টুকু মনে পড়ে—চোখ বন্ধ করলে, হৃদয়ের ক্যানভাসে তাঁর ছবি ভেসে ওঠে। একজন গুরুগম্ভীর সাদাসিধে আল্লাহঅলা মানুষ। যাঁর জীবন ছিল সংসারের প্রতি যত্ন আর পল্লী মাটির প্রতি গভীর প্রেমের মোড়কে মোড়ানো রত্ম। আব্বু-আম্মু, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের মুখে তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যতই জেনেছি, মুগ্ধ হয়েছি। আজও গ্রামের বহু মানুষের কাছ থেকে দাদার একটি বিশেষ গুণের কথা শুনতে পাই—দাদাজান নাকি সবসময় রাস্তার ডানপাশে দৃষ্টি অবনত করে চলতেন। ছোট-বড় সবাইকে নিজেই প্রথমে সালাম দিতেন।

দাদাজানের যে-সব স্মৃতি আমার হৃদয়ে আজও জ্বলজ্বল করতে থাকে, তা তুলে ধরছি—

নামাজের ইহতিমাম

দাদাজান (রহ.) প্রতিদিন ফজরের নামাজে যাওয়ার আগে গলায় খাঁকারি দিয়ে আব্বুকে নাম ধরে গম্ভীর কণ্ঠে ডাকতেন—‘আবু সালেহ, নামাজ... নামাজ...’ !

দাদাজানের দরাজ কণ্ঠের এই ‘ডাক’  আমার কানে এখনো বাজে। মনে হয়, এই তো সেদিনও তিনি ছিলেন আমাদের মাঝে। নামাজের জন্য ডাকছেন রোজ রুটিন করে!

আব্বু থেকে বহুবার শুনেছি, দাদা নামাজের ব্যাপারে গাফলতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারতেন না।

দাদার স্নেহ ও অগাধ ভালোবাসা

দাদাজান আমাদের অনেক আদর-স্নেহ করতেন। এখনো মনে পড়ে, একবার আমি চেহারায় আঘাত পাই। দাদাজি আমাকে শ্রীফলীয়া বাজার আব্দুল কাদির ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।

এলাকার জনগণের আশার আলো

এখনো মনে পড়ে—দাদাজান প্রতিদিন সকালে জেঠাদের ঘরের সামনের রুমে বসতেন। নানাজন তাঁর কাছে নানান সমস্যা নিয়ে আসতো। তিনি মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন। পরামর্শ দিতেন। সাধ্যনুযায়ী সহযোগিতা করতেন। ‘খেদমতে খালক’ (সৃষ্টির সেবা) হিসেবে লোকজনকে তাবিজও দিতেন। ওই সময় কোনো-কোনো দিন আম্মু আমাকে দাদার কাছে পাঠাতেন—খাবার খাওয়ার জন্য ডেকে আনতে।

শেষ প্রহরে

দাদা খুবই অসুস্থ। তাঁর সে অসুস্থতার কিছু আবছা স্মৃতি এখনো মনে পড়ে। আব্বু, জেঠাসহ আরো অনেকে দাদাকে ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় নিয়ে গেলেন। সবার আশা দাদা আবার আমাদের মাঝে ফিরবেন সুস্থ দেহে। কিন্তু, সবার আশা রূপান্তরিত হলো হতাশায়। সবার মনে ব্যথা জাগিয়ে খবর এলো—দাদাজান, মাওলানা তামীজুদ্দীন আর নেই। রবের ডাকে সারা দিয়ে তিনি পরপারের বাসিন্দা। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমি তখন আম্মুর সঙ্গে ছিলাম রান্নাঘরে। আম্মুকে হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখে—কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলো আমার শিশু মন। লাশবাহী গাড়িতে চেপে দাদা এলেন বাড়ি। খাটিয়ায় করে তাকে নামানো হলো গাড়ি থেকে। আত্মীয়-স্বজন ও তাঁর ভক্তবৃন্দ সবাই তাঁকে একনজর দেখার ইচ্ছায় ভিড় জমায় আমাদের বাড়ি।

আব্বু আমাকে জড়িয়ে ধরে সেদিন কী যে কান্না করেছেন! সবই এখন স্মৃতি হয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর দাদাকে জীবনের শেষ গোসল করানো হলো, কাফন পরানো হলো। মনে আছে, শ্রদ্ধেয় বড়ভাই মুফতি উমর ফারুক আনোয়ারী-সহ আরও কয়েকজন দাদাকে জীবনের শেষ গোসল দিয়ে বরের সাজে সাজিয়ে দিলো। জানাজার আগমুহূর্তে আমি আম্মুর সঙ্গে দাদাকে শেষবারের জন্য এক পলক দেখতে যাই। গিয়ে দেখি—সাদা কাফনে মোড়া প্রিয় মুখ। চেহারায় অসুস্থতার কোনো ছাপ নেই। ফকফকে সাদা মুখে যেন হাসি ফুটে আছে। মনে হলো—তিনি শান্তির নিদ্রায় আচ্ছন্ন, যেন জান্নাতের পরশ পেয়েছেন। আত্মীয়-স্বজনের চোখে অশ্রুধারা, বুকভাঙা হাহাকার।

দাদাজান আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর স্মৃতি, তাঁর শিক্ষা, তাঁর আদর্শ আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। তাঁর জীবন আমাদের জন্য শিক্ষা, আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা, আমাদের চলার পথে আলোকবর্তিকা। তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা চিরকাল অটুট থাকবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—إذا مات الإنسان انقطع عنه عمله إلا من ثلاثة: إلا من صدقة جارية، أو علم ينتفع به، أو ولد صالح يدعو له.

‘মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস ছাড়া—সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যার থেকে উপকার পাওয়া যায়, আর সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’

লেখক: উস্তাযুল হাদিস ওয়াল ফিকহ, জামিয়া দারুল ঈমান, বেগম মসজিদ কমপ্লেক্স, নতুন বাজার সদর চাঁদপুর।

ফিকহ ও ইফতা, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা।

জেডএম/