
|
কোরবানির গোশত বণ্টন ও কিছু জরুরি মাসআলা
প্রকাশ:
২৫ মে, ২০২৬, ১১:০৪ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| মুফতি তাফাজ্জুল হক || কোরবানি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত—যা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন, তাকওয়া এবং সামাজিক সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার এক বিরাট মাধ্যম। এর মাধ্যমে যেমন আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের বিকাশ ঘটে, তেমনই এর গোশত বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে—ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও মানবিক মূল্যবোধ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তাই কোরবানির গোশত বণ্টন সম্পর্কে ইসলাম সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ অর্থাৎ, ‘সুতরাং (হে মুসলিমগণ!) সেই পশুগুলি থেকে তোমরা নিজেরাও খাও এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্তকেও খাওয়াও।’ (সুরা হজ, আয়াত: ২৮) অন্য আয়াতে এসেছে- فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ অর্থাৎ, তখন তার গোশত থেকে নিজেরাও খাও এবং ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্তকেও খাওয়াও এবং তাকেও, যে নিজ অভাব প্রকাশ করে। (সুরা হজ, আয়াত: ৩৬) এসব আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, কোরবানির গোশত কেবল নিজের জন্য সংরক্ষণ করার বিষয় নয়; বরং তা দরিদ্র, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াও ইসলামের মহান শিক্ষা। ইসলাম এমন এক সমাজব্যবস্থা চায়, যেখানে ঈদের আনন্দ ধনী-গরিব সবার মাঝে বণ্টিত হয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একসময় মদিনায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করতে নিষেধ করেছিলেন। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তিনি বলেন: كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ لُحُومِ الْأَضَاحِيِّ فَوْقَ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ، فَكُلُوا وَادَّخِرُوا অর্থাৎ,‘ আমি তোমাদেরকে তিন দিনের চেয়ে বেশি কোরবানির গোশত (সংরক্ষণ) থেকে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা তা খাও এবং সঞ্চয় করো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১৬০) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, কোরবানির গোশত সংরক্ষণ করা জায়েজ এবং বণ্টনের ক্ষেত্রেও নমনীয়তা রয়েছে। ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন, ‘কোরবানির গোশত তিন ভাগে বণ্টন করা উত্তম—এক ভাগ নিজের ও পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের জন্য এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়; বরং মুস্তাহাব বা উত্তম পদ্ধতি। প্রসিদ্ধ ফকিহ ইমাম কাসানি (রহ.) ‘বাদায়ে আস-সানায়ে’ গ্রন্থে লিখেছেন: والأفضل أن يتصدق بالثلث، ويتخذ الثلث ضيافة لأقاربه وأصدقائه، ويدخر الثلث অর্থাৎ, ‘উত্তম হলো, এক-তৃতীয়াংশ সদকা করা, এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয় ও বন্ধুদের আপ্যায়নের জন্য রাখা এবং এক-তৃতীয়াংশ নিজের জন্য সংরক্ষণ করা।’ ('বাদায়ে আস-সানায়ে' ৫/৮১) তবে কারও পারিবারিক প্রয়োজন বেশি হলে অধিকাংশ গোশত নিজের জন্য রাখা জায়েজ, আবার কেউ চাইলে অধিকাংশ বা পুরো গোশত গরিবদের মাঝেও বণ্টন করতে পারেন। শরিয়ত এ বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেনি। *কিছু জরুরি মাসআলা- ১. কোরবানির গোশত শরিকদের মধ্যে ওজন করে সমানভাবে বণ্টন করা আবশ্যক। আন্দাজে ভাগ করা জায়েজ নয়, যদিও শরিকরা কম-বেশিতে সন্তুষ্ট থাকে। তবে গোশত বণ্টনের সময় কোরবানির পশুর অন্যান্য অংশ যেমন মাথা, পা ইত্যাদিও গোশতের সঙ্গে মিলিয়ে ভাগ করে দেওয়া হলে, তখন ওজন করে ভাগ করা জরুরি থাকবে না; বরং আন্দাজে কম-বেশিসহ বণ্টন করাও জায়েজ হবে। এছাড়া, বড় পশুতে কয়েকজন শরিক থাকলে এবং তারা সবাই একই পরিবারের সদস্য হয়, অথবা শরিকরা নিজেদের অংশ আলাদা নিতে না-চান, তাহলে এ ধরনের যৌথ কোরবানির পশুর গোশত শরিকদের মধ্যে আলাদাভাবে বণ্টন করা শরিয়তসম্মতভাবে আবশ্যক নয়। (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩১৭) ২. কোরবানিদাতার জন্য পশুর গোশত অমুসলিমকে দেওয়া জায়েজ। চাই তা সদকা হোক বা হাদিয়া। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়্যাহ ৫/৩০০, হাশিয়াতুত তহাবি আলাদ্দুররুল মুখতার ৪/১৬৬ , ইলাউস সুনান ১৭/২৬২) ৩. কসাইকে কোরবানির গোশত পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নয়। তবে তাকে দান বা হাদিয়া হিসেবে গোশত দেওয়া যাবে। এজন্য কসাইকে তার কাজের নির্ধারিত পারিশ্রমিক আলাদাভাবে দিতে হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩১৭, আদ্দুররুল মুখতার মাআশ শামি: ৯/৪৭৫, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া ১৭/৪৪২) ৪. বিয়েশাদিতে কোরবানির গোশত দিয়ে মেহমানদের আপ্যায়ন জায়েজ। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়্যাহ: ৪/৪৪৯, কিতাবুন নাওয়াজিল: ১৪/২৪০) ৫. কোরবানির গোশত বিক্রি করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। কেউ বিক্রি করলে, তার মূল্য সদাকাহ (দান) করা ওয়াজিব। (আদ্দুররুল মুখতার মাআশ শামি: ৫/২০৯; আল বাহরুর রায়েক: ৮/১৭৮; কিতাবুন নাওয়াজিল: ১৪/৩৯৪) ৬. কোনো ব্যক্তি যদি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি করে, আর মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় ওসিয়ত করে না-যান, তাহলে কোরবানিদাতা সেই গোশত খেতে পারবে এবং অন্যদেরও খাওয়াতে পারবে। কিন্তু যদি মৃত ব্যক্তি ওসিয়ত করে যান, তাহলে সেই কোরবানির গোশত পুরোটা সদকা করে দিতে হবে। কোরবানিদাতা নিজে বা ধনী ব্যক্তি তা খেতে পারবে না। গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে। (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩২৬; বাযযাযিয়াহ আলাল হিন্দিয়্যাহ ৬/২৯৫; কিতাবুন নাওয়াজিল: ১৪/৩৯২) ৭. কোরবানির গোশত বছরব্যাপী খাওয়ার জন্য শুকিয়ে সংরক্ষণ করে রাখা জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার: ৫/২০৮; তাবয়িনুল হাকায়িক ৬/৮; আল-বাহরুর রায়েক: ৮/১৭৮) লেখক: সাবেক মুহাদ্দিস, জামিয়া কাসিমিয়া মহাখালী টিএন্ডটি কলোনি ঢাকা। ফিকহ ও ইফতা, মারকাজুল ফিকরিল ইসলামী বাংলাদেশ বসুন্ধরা ঢাকা। জেডএম/ |