
|
শিকড়হীন পরগাছা নয়, কওমি মাদরাসা এক অবিনশ্বর সভ্যতার বাতিঘর
প্রকাশ:
২৪ মে, ২০২৬, ০৮:৩১ রাত
নিউজ ডেস্ক |
|| জহীর রাইহান || সমালোচনার মেঘ কখনো কখনো সত্যের সূর্যকে আড়াল করতে চায়, কিন্তু মহাকালের স্রোতে তা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না। সাম্প্রতিককালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা আধুনিক মননশীলতার দাবিদার কিছু মহলে অত্যন্ত হালকা চালে একটি কুৎসিত উপমা ছুড়ে দেওয়া হয়—‘ব্যাঙের ছাতা’। কওমি মাদরাসাগুলোর বিস্তার ও অস্তিত্বকে বোঝাতে এই রূপকটি যারা ব্যবহার করেন, তারা হয়তো ইতিহাসের ধূলিধূসরিত পাতা ওল্টানোর ফুসরত পাননি, কিংবা সমকালীন সমাজবাস্তবতায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শিকড়ের গভীরতা পরিমাপ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ব্যাঙের ছাতা জন্মায় বর্ষার কর্দমাক্ত ক্ষণস্থায়ী আবর্তে, যার কোনো সুদৃঢ় মূল নেই, নেই কোনো কালজয়ী ঐতিহ্য। পক্ষান্তরে, কওমি মাদরাসা হলো সেই বটবৃক্ষ, যার শিকড় প্রোথিত রয়েছে সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগের মদীনার সুফফায় এবং যার কাণ্ডটি বলীয়ান হয়েছে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে। এটি কোনো আকস্মিক বা কৃত্রিম সৃষ্টি নয়; বরং এটি একটি সুসংহত ইতিহাস, একটি অবিনশ্বর ঐতিহ্য এবং একটি জীবন্ত সংস্কৃতির নাম। ঐতিহাসিক উৎস ও দেওবন্দের চেতনা: যখন ভারতবর্ষ পরাধীন কওমি মাদরাসার ইতিহাস বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে উনিশ শতকের মধ্যভাগের ভারতবর্ষে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর এই উপমহাদেশের মুসলিম সমাজ যখন এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এদেশের হাজার বছরের ইসলামী সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শিক্ষাব্যবস্থাকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য মেকলে শিক্ষানীতি চাপিয়ে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই জন্ম নেয় ‘দেওবন্দ আন্দোলন’। ১৮৬৬ সালের৩০ মে, উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক এক প্রান্তিক পল্লীতে, একটি ডালিম গাছের নিচে যে মাদরাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, তাই আজ বিশ্বজুড়ে ‘কওমি মাদরাসা’ বা ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ নামে পরিচিত। হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.) ও তাঁর সহযোগীদের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের মূল দর্শনই ছিল ‘কওম’ বা জনগণের স্বকীয়তা রক্ষা করা। তৎকালীন সময়ে আলিয়া মাদরাসাগুলো যখন ব্রিটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ অনুদান ও নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছিল, তখন দেওবন্দের মনীষীগণ সরকারি অনুদানকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তাঁরা জানতেন, সরকারের দেওয়া অর্থ মানেই হলো তাদের গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ হওয়া। এই স্বাধীনচেতা ও আপসহীন মনোভাবই কওমি মাদরাসার মূল চালিকাশক্তি। এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক অভিনব সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ দুর্গ। ‘কওমি’ শব্দের অন্তর্নিহিত দর্শন: জনগণের অংশীদারিত্ব ‘কওমি’ শব্দের উৎপত্তি ‘কওম’ থেকে, যার অর্থ জাতি বা সাধারণ জনগণ। এই একটিমাত্র শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এই ধারার শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কওমি মাদরাসা কোনো রাজা-বাদশাহের খামখেয়ালিপনায় কিংবা কোনো পুঁজিপতির কর্পোরেট সার্থেকেন্দ্রিক অনুদানে গড়ে ওঠেনি। এ দেশের রিকশাচালক, দিনমজুর, প্রান্তিক চাষী থেকে শুরু করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের দেওয়া এক টাকা, দুই টাকার চিলতে অনুদান আর ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এই বিশাল সৌধ। এখানেই কওমি মাদরাসার অনন্যতা। এটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বোঝা না হয়েও, কোটি কোটি সন্তানকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা, বাসস্থান এবং খাদ্যের জোগান দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে সন্তানের উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা দুঃসাধ্য, সেখানে কওমি মাদরাসাগুলো সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও এতিম শিশুদের বুকে টেনে নিয়ে তাদের সুনাগরিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে। একে ‘ব্যাঙের ছাতা’ বলা কেবল অজ্ঞতাই নয়, বরং এ দেশের আপামর মেহনতি মানুষের আত্মত্যাগ ও অবদানকে চরমভাবে উপহাস করার শামিল। কওমি মাদরাসার পাঠ্যক্রম: এক বহুমাত্রিক জ্ঞানজগৎ অনেকের ধারণা, কওমি মাদরাসায় কেবলই কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শেখানো হয়। এই ধারণাটি চরম বিভ্রান্তিকর। কওমি মাদরাসার উচ্চতর পাঠ্যক্রম (দর্সে নেজামী) গভীর মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একাধারে ভাষা, সাহিত্য, আইন, দর্শন এবং সমাজবিজ্ঞানের এক অপূর্ব মহাসঙ্গম। এখানে আরবি সাহিত্যের প্রাচীন ও ধ্রুপদী কাব্যগ্রন্থসমূহ (যেমন: সাবআ মুআল্লাহকা, দিওয়ানে মুতানাব্বী) পড়ানো হয়, যা একজন শিক্ষার্থীর নান্দনিক ও সাহিত্যিক বোধকে জাগ্রত করে। এখানে পড়ানো হয় ‘উসূলে ফেকাহ’ বা ইসলামী আইনশাস্ত্রের মূলনীতি, যা আধুনিক আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এক পরম বিস্ময়। শুধু ধর্মীয় জ্ঞানই নয়, যুক্তিবিদ্যা (মানতিক), দর্শন (ফালসাফা) এবং ইতিহাসের মতো জটিল বিষয়গুলোও এখানে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যবচ্ছেদ করা হয়। আর হাদিস শাস্ত্রের পঠন-পাঠনে (যেমন: বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী) কওমি মাদরাসার যে গভীরতা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ পদ্ধতি, তা সমকালীন পৃথিবীর যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গবেষণার সমকক্ষ। একজন কওমি গ্র্যাজুয়েট যখন ইলমে দ্বীনের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন, তখন তিনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই নন, বরং তিনি একজন ভাষাবিদ, একজন আইনজ্ঞ এবং একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। নৈতিকতার প্রাচীর এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা বর্তমান আধুনিক সমাজ যখন নৈতিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, দুর্নীতি আর পারিবারিক বন্ধনহীনতার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে, তখন কওমি মাদরাসাগুলো এ দেশে নৈতিকতার এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা সমাজকে কী দিচ্ছে, তা বুঝতে হলে একবার অপরাধের পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো প্রয়োজন। এ দেশের কারাগারগুলোতে তাকালে দেখা যাবে, খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি কিংবা কোটি কোটি টাকার ব্যাংক জালিয়াতির মামলায় কওমি মাদরাসার কোনো ছাত্র বা শিক্ষকের নাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তারা সমাজকে অস্থির করে না, বরং শান্ত রাখে। শেষ রাতে যখন পুরো শহর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন এই মাদরাসার ছোট ছোট শিশুরা আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে চোখের জল ফেলে দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য মোনাজাত করে। সমাজের প্রতিটি স্তরে—তা বিবাহ-শাদী, জানাজা, খুতবা কিংবা আপদকালীন দুর্যোগই হোক না কেন—সর্বপ্রথম এই কওমি মাদরাসার আলেম সমাজই মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়। করোনাকালীন সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা কি আমরা ভুলে গেছি? যখন আপন সন্তানেরা বাবার লাশ ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল, তখন এই কওমি মাদরাসার যুবকেরা, আলেম ও ছাত্ররা নিজেদের জীবনের পরোয়া না করে সেই বেওয়ারিশ লাশগুলোর গোসল, কাফন ও দাফনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। এটি কোনো লৌকিকতা ছিল না, এটি ছিল কওমি ঐতিহ্যের সেই খাঁটি মানবতাবোধ। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও দেশপ্রেমে কওমি আলেমদের রক্তক্ষয়ী অবদান কওমি মাদরাসার দেশপ্রেম নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন, তারা ইতিহাসবিমুখ। এই উপমহাদেশের স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল আলেমদের রক্তের বিনিময়ে। দিল্লির রেশমি রুমাল আন্দোলন থেকে শুরু করে শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান (রহ.)-এর মাল্টার বন্দিজীবন, হযরত মাদানী (রহ.)-এর আপসহীন নেতৃত্ব—সবই ছিল কওমি ধারার আলেমদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও কওমি আলেমদের অবদান অনস্বীকার্য। হযরত মাওলানা আতহার আলী (রহ.) থেকে শুরু করে হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) কিংবা শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)—তাঁদের দেশপ্রেম এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। সুতরাং, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরগাছা ভাবা রাষ্ট্র ও দেশের ইতিহাসের সাথে এক প্রকার বিশ্বাসঘাতকতা। বাতিঘরের অবিনশ্বর যাত্রা একটি সমাজকে ধ্বংস করতে হলে তার সংস্কৃতি ও বাতিঘরগুলোকে ভেঙে দিতে হয়। কওমি মাদরাসাগুলো হলো এ দেশের মুসলিম সংস্কৃতির সেই অতন্দ্র প্রহরী। একে ‘ব্যাঙের ছাতা’ বলে অবজ্ঞা করার অর্থ হলো নিজের অস্তিত্বের শিকড়কে অস্বীকার করা। কওমি মাদরাসা কোনো সাময়িক উত্তেজনার ফসল নয় যে, ঝোড়ো হাওয়ায় তা উড়ে যাবে। এটি শত বছরের ঝড়-ঝাপটা, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মাড়িয়ে আজ এক সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। আজ সময় এসেছে এই প্রাচীন ও গৌরবময় শিক্ষাব্যবস্থাকে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বৃত্ত থেকে বের করে এনে এর প্রকৃত মূল্য অনুধাবন করার। কওমি মাদরাসা এ দেশের মাটির গন্ধ মাখা, এ দেশের মানুষের হৃদয়ের স্পন্দনে গড়ে ওঠা এক অবিনশ্বর বাতিঘর। কোলাহল আসবে, সমালোচনা মিলিয়ে যাবে; কিন্তু কওমি মাদরাসা তার নিজস্ব মহিমায়, তার সুউচ্চ জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মশাল জ্বেলে যুগ যুগ ধরে এই সমাজকে আলোড়িত করে যাবে—এটাই এর চিরন্তন নিয়তি। লেখক : মুহাদ্দিস ও নায়েবে মুফতি, দারুল উলুম ঢাকা, মিরপুর-১৩ আইও/ |