
|
তাওহিদের পথে ত্যাগ ও ভালোবাসার ইতিহাস
প্রকাশ:
২৪ মে, ২০২৬, ০৮:১৪ সকাল
নিউজ ডেস্ক |
|| মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী || পৃথিবীর বুকে এমন কিছু দৃশ্য আছে, যা কেবল চোখে দেখা যায় না; হৃদয় দিয়েও অনুভব করতে হয়। তেমনই এক মহিমান্বিত দৃশ্য ও অনিন্দ্য সুন্দর অনুভূতির নাম—হজ্ব। যেখানে মুছে যায় ভাষা, বর্ণ, দেশ, জাতি আর আত্মপরিচয়ের সব ব্যবধান। মানুষ ফিরে আসে তার রবের দরবারে। বিস্তীর্ণ আসমানের সামিয়ানার নিচে, শুভ্র ইহরামের সরল আবরণ গায়ে জড়ো হয় লাখো লাখো মুসলিম। 'লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক' ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠে আকাশ-বাতাস। তখন মনে হয়, মানবসভ্যতার সব পথ এসে যেন মিলিত হয়েছে এই রব্বে কা'বার ছায়াতলে। হজ্ব কেবল একটি ইবাদত-ই নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর সর্ববৃহৎ সম্মিলনও বটে। এখানে রাজা-প্রজা আর সাদা-কালো, সব একই কাতারে মিশে যায়। সকল কণ্ঠে একই ঘোষণা—আমরা তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছি, হে আল্লাহ! আমাদের মালিক তুমি, আমাদের আশ্রয় তুমি, আমাদের প্রত্যাবর্তনও তোমারই দিকে। হজ্বের এই মহিমান্বিত রূপের নেপথ্যে রয়েছে এক মহামানবের দীর্ঘ সংগ্রাম। আছে অটল বিশ্বাস আর হৃদয়বিদারক ত্যাগের এক অসাধারণ ইতিহাস। তিনি হলেন আল্লাহর খলিল, মুসলিম জাতির পিতা নবী ইবরাহিম 'আলাইহিস সালাম। তাঁর জীবন ছিল পরীক্ষা দিয়ে ঘেরা৷ তাওহিদের ডাক দেওয়ার অপরাধে তাঁকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের ভেতর। চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা, কাফিরদের নিষ্ঠুর উল্লাস, আর মাঝখানে অবিচল নবী ইবরাহিম। নির্ভিক তাঁর মন। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসায় টইটম্বুর হৃদয়। দেখিয়ে দিলেন তিনি—যার পাশে আল্লাহ আছেন, দুনিয়ার কোনো আগুনের কী সাধ্য যে তাঁকে স্পর্শ করে! তবে এই পরীক্ষাই তাঁর শেষ পরীক্ষা নয়। বরং আরও বেদনাবিধুর পথ উন্মুক্ত হলো তাঁর সামনে। আল্লাহর আদেশে তিনি আপন স্ত্রী হাজেরা 'আলাইহাস সালাম এবং শিশু পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামকে রেখে এলেন এক নির্জন মরুপ্রান্তরে। চারদিকে জনমানবহীন উপত্যকা, নেই পানি, নেই খাদ্য, নেই কোনো দৃশ্যমান সহায়। একজন পিতা হিসেবে এ দৃশ্য কতটা কঠিন ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা সহজ নয়। কিন্তু নবীর হৃদয় ছিল আল্লাহর নির্দেশের সামনে সম্পূর্ণ নত। তিনি জানতেন— যে রব আদেশ করেছেন, তিনিই খুলে দেবেন রিজিকের দরজা। সেই নির্জন প্রান্তরে হাজেরা 'আলাইহাস সালামের সাফা ও মারওয়ার মাঝে ছুটে চলা কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। তা ছিল এক মায়ের হৃদয়-চেরা আকুতি। রব্বে কারীমের প্রতি তাঁর এক অনুগত বান্দীর নির্ভরতার অমর স্মৃতিকথা। আর শিশু ইসমাইল আলাইহিস সালামের পায়ের কাছে যখন বয়ে গেল জমজমের ধারা, তখন মরুভূমির বুকেই উন্মোচিত হলো বারাকাহ'র এক চিরন্তন দরজা। নীরব আর জনমানবহীন মরুপ্রান্তর পরিণত হলো তাওহিদের কেন্দ্রভূমি, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের কিবলায়। এরপর এল আরেক অগ্নিপরীক্ষা—যা মানব-ইতিহাসে ত্যাগের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম স্বপ্নে নির্দেশ পেলেন প্রিয় পুত্রকে কুরবানি করার। একদিকে সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসা, অন্যদিকে রবের আদেশ। পাহাড়ের চেয়েও দৃঢ় ঈমানী শক্তি নিয়ে তিনি পুত্রকে জানালেন আল্লাহর নির্দেশের কথা। ইসমাইল আলাইহিস সালামও ছিলেন আদর্শ সন্তান। তাঁর কণ্ঠেও ফুটে উঠল রবের প্রতি আত্মসমর্পণের বাণী—আব্বাজান, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা-ই করুন; ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। এ কেবল পিতা-পুত্রের নিছক কোন ঘটনা নয়। এটি ছিল ঈমান আর তাওয়াক্কুলে পরিপূর্ণ এক মহাসমুদ্র, যেখানে আল্লাহর আদেশের সামনে মাথা নত করেছে দুনিয়াবি ভালোবাসা। ছুরি প্রস্তুত, পুত্র শায়িত, পিতা দৃঢ় সংকল্পে অগ্রসর। ঠিক সেই মুহূর্তে নেমে এলো আল্লাহর কুদরত। ইসমাইল আলাইহিস সালামের পরিবর্তে কুরবানি হয়ে গেল দুম্বা। আর মানুষের জন্য প্রস্ফুটিত হলো এক মহান শিক্ষা—আল্লাহ তা'আলা রক্ত চান না। তিনি চান হৃদয়ের অদৃশ্য তাকওয়া। বান্দার পরিপূর্ণ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণই তার সর্বোত্তম যোগ্যতা। লেখক: বিশিষ্ট ইসলামি স্কলার ও ওয়ায়েজ জেডএম/ |