সংস্কার অবহেলায় জরাজীর্ণ ৪০০ বছরের পুরোনো ‘জিন মসজিদ’
প্রকাশ: ২৩ মে, ২০২৬, ১১:০২ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার শিবপুর গ্রামে ইতিহাস ও লোককথার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন ‘জিন মসজিদ’ খ্যাত তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

স্থানীদের বক্তব্য, শত শত বছর পার হয়ে গেলেও মসজিদটি সংরক্ষণ বা মেরামতের জন্য সরকারি বা বেসরকারি কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অনেকেই এসে পরিদর্শনের পর আশ্বস্ত করে যান, কিন্তু পরে আর খোঁজ নেন না। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও বাস্তবে এর সুরক্ষায় কোনো কাজ হয়নি।

মসজিদের ইমাম নূর ইসলাম বেপারী বলেন, আমি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এখানে ইমামতি করছি। এটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং আধ্যাত্মিক ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ একটি মসজিদ। সরকারের কাছে আমাদের আকুল দাবি, দ্রুত সংস্কার করে এই ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হোক।

শরীয়তপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদটি কে বা কখন নির্মাণ করেছিলেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মসজিদসংলগ্ন তালুকদার পরিবারের বংশ পরম্পরার তথ্যমতে এর বয়স প্রায় ৪০০ বছর। আবার অনেকের মতে, এই স্থাপত্যের বয়স ৪৫০ বছরেরও বেশি।

মসজিদটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মাঝে রয়েছে নানা রহস্যময় লোককথা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, কোনো এক ব্যক্তি মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু করলেও তা শেষ হওয়ার আগেই তিনি মারা যান। পরে এক রাতের মধ্যেই অলৌকিকভাবে (জিনেরা এসে) এই অসমাপ্ত নির্মাণকাজ শেষ করে দেয়। এমনকি এখানে জিনেরা নামাজ, জিকির ও ইবাদত-বন্দেগি করত বলেও লোকমুখে শোনা যায়। সেই লোকবিশ্বাস থেকেই স্থানীয়দের কাছে এটি ‘জিন মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়।

চার শতাংশ জমির ওপর নির্মিত চতুর্ভুজাকৃতির এই মসজিদে রয়েছে একটি বড় মূল গম্বুজ এবং চারপাশে চারটি চিকন খুঁটির ওপর ছোট খিলানাকৃতির মিনার ও গম্বুজ। মসজিদের ভেতরের দেয়ালের কারুকাজে এখনো মোগল স্থাপত্যশৈলীর স্পষ্ট নিদর্শন চোখে পড়ে। চারটি প্রবেশপথবিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৩০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমার জামাত আদায় করে আসছেন স্থানীয়রা। মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি বড় পুকুর ও পাকা ঘাট, যা স্থানীয়দের মতে সেই সময়েই তৈরি করা হয়েছিল।

মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক সালাম তালুকদার বলেন, আমাদের পূর্ব পুরুষদের মুখে শুনেছি, এই মসজিদ এক রাতে অলৌকিকভাবে তৈরি হয়েছে। সেই বিশ্বাস থেকেই সবাই এটাকে জিন মসজিদ বলে। তবে আমাদের পারিবারিক সূত্রে এটি তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদ হিসেবেই পরিচিত।

গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুশরাত আরা খানম বলেন, প্রাচীন এই মসজিদটি এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহন করছে। এর যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রত্নতত্ত্ব বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ইতিহাস, অনন্য স্থাপত্যশৈলী ও লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধনে গড়া এই ‘জিন মসজিদ’ এখন শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং শরীয়তপুর জেলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে দ্রুত এর রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ না নিলে, অচিরেই কালের গহ্বরে হারিয়ে যাবে শত বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক নিদর্শন।

জেডএম/