
|
ইবরাহিমি চেতনায় ভাস্বর হোক পবিত্র কুরবানি
প্রকাশ:
১৯ মে, ২০২৬, ০২:৫৫ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| মুফতি সিদ্দিকুর রহমান || ইসলাম—‘ফিতরাত’ তথা মনস্তাত্ত্বিক ধর্ম। মানবিক চাহিদা অনুধাবনে—এ ধর্ম সর্বাপেক্ষা উপযোগী, গোছালো ও সুশৃঙ্খল। মানুষের স্বভাবজাত এই চাহিদা পূরণার্থে ইসলাম উপহার দিয়েছে—বছরে দুটো ঈদ। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। সময়ের চাকা ঘুরে প্রতিবছরের মতো এবারও দরজায় কড়া নাড়ছে ইসলামের সেই অনন্য উপহার—ঈদুল আজহা। চন্দ্রবর্ষের শেষ মাস জিলহজের দশম তারিখে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় এ ঈদ। মুসলিমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে নিজেদের প্রিয় পশু কুরবানির মাধ্যমে উপভোগ করে ঈদুল আজহার আনন্দ। এ দিন উপলক্ষে শহর-বন্দর থেকে গ্ৰাম-গঞ্জ—সবখানেই শুরু হয় কুরবানির গবাদি পশুর হাট। নানা পশুর বিচিত্র ধ্বনিতে মুখরিত চারদিক। সর্বত্রই ঈদকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি। শিশু-কিশোরদের আনন্দের দৃশ্যটা ভিন্নরকম। হইহুল্লোড়, চিৎকার-চেচামেচি আর গরু-ছাগলের পেছনে দলবেঁধে ছোটাছুটি—ঈদ-আনন্দের মাধুর্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। ইসলাম আনন্দ উদযাপন নিষিদ্ধ করেনি। তবে, তার অনুসারীদের একেবারে ছেড়েও দেয়নি লাগামহীন; বরং বেঁধে দিয়েছে সুনির্দিষ্ট সীমানা ও বিধিনিষেধের গিঁট। ইবরাহিমি চেতনার এই অমর ও ঐতিহাসিক দিনকে ঘিরে, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি বিশেষ ইবাদতেরও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ধনবান মুসলিমদের কুরবানির আদেশ করেছেন। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে— فصل لربك وانحر অর্থাৎ হে নবী, আপনি আপনার রবের জন্য নামাজ পড়ুন এবং কুরবানি করুন । (সুরা কাউসার, আয়াত: 0২) আমাদের কুরবানি নিছক আনন্দের না-হওয়া চাই। হওয়া চাই—লৌকিকতা বিবর্জিত, ইখলাসপূর্ণ ও হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইল আ.-এর ত্যাগ বিজড়িত। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে—لن ينال الله لحومها ولا دماءها ولكن يناله التقوى منكم অর্থাৎ আল্লাহর কাছে কুরবানি পশুর গোশত কিংবা রক্ত কোনটিই পৌঁছে না। বরং, তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের মধ্যকার তাকওয়া। (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)
এ দিনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নবী ইবরাহিম ও পুত্র ইসমাইল আ.-এর কুরবানির ঘটনা। আল্লাহ তাআলা প্রিয় বন্ধু ইবরাহিম আ. কে নির্দেশ দিয়েছিলেন নিজ পুত্র ইসমাইল আ. আল্লাহর তরে কুরবানি করতে। ইবরাহিম আ.-এর জন্য সেটা ছিল কঠিন এক পরিস্থিতি। যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আ. কে পরীক্ষা করেছিলেন পুত্রের প্রেম ও মুহাব্বত বেশি নাকি প্রভুর? হজরত ইবরাহিম আ. সে পরীক্ষায় সফল হয়েছিলেন। আত্মত্যাগের যে অমলিন দৃষ্টান্ত তিনি বিশ্ব দরবারে পেশ করেছেন—ইতিহাসের পাতায় তা আজও ভোরের আলোর মতো প্রস্ফুটিত।
শৈশব-কৈশোর আর যৌবনের রোদ-ঝলমলে দিন পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বে তখন দিনাতিপাত আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের। হায়াতের বেলা ডুবিডুবি করছে। জীবনের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে ছিয়াশির বার্ধক্যে উপনীত তিনি। কিন্তু যৌবনের এতগুলো বসন্ত পেরোলেও পিতৃত্বের সাধ তাঁর অধরা। তবু তিনি নিরাশ নন; কোনো এক নতুন ভোরে অরুণোদয়ের তীর্থ প্রতীক্ষা তার চোখজুড়ে। মনজুড়ে খেলা করতে থাকে আগামীর স্বপ্ন। সঙ্গে মহান রবের দরবারে অকাতরে দোয়া-মোনাজাত রোনাজারি। বার্ধক্যের ছাপ সর্বাঙ্গে ফুটে ওঠেছে। যৌবনের কুচকুচে কালো কেশগুচ্ছ বিধবার ধবধবে সাদা শাড়িতে আবৃত হচ্ছে। সাথে আছে নিঃসঙ্গতার হাহাকার! সর্বদা সন্তান-শূন্যতার হাহাকার হৃদয়টা দুমড়ে মুচড়ে দেয়। বুক ফেটে বেরিয়ে আসে নিঃশব্দ বিলাপ। বাবা ডাক না-শোনেই বুঝি জীবন-তরী যাবে ডুবি! হৃদয়ের সমস্ত যাতনা ঢেলে তিনি মহান প্রভুর রহমতের আশায় আকাশপানে হাত তোলেন—ছিয়াশির্ধ্ব হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম—رب هب لي من الصالحين ‘হে প্রভু আমার, নেককার সন্তান দান কর আমায়।’(সুরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০০) নবীর এই দোয়া আল্লাহ কবুল করে জবাব দেন—فبشرناه بغلام حليم ‘আমি তাঁকে সহনশীল এক শিশুর সুসংবাদ দিলাম। (প্রাগুক্ত, ১০১) যার প্রতীক্ষায় বুকভরা আশা নিয়ে কেটে গেল বহুকাল, তাকে দেখে আজ নেচে উঠল বৃদ্ধ-হৃদয়। যে শূণ্যতার হাহাকারে বুক পরিণত হয়েছিল ধুধু মরুতে, সে মরু সজীব হলো, পূর্ণতা পেল স্নিগ্ধতায়। মন চায় ছিয়াশির বার্ধক্যকে পিছু ফেলে ফিরে যেতে তারুণ্যের বসন্তে। নতুন পৃথিবীর দেখা মিলেছে তাই তাকে রাঙাতে হবে নতুন রঙে। দিন যতই এগুচ্ছে স্নেহ,মায়া-মমতা আর পিতৃত্বের দুর্বল আঁচল ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন পৃথিবীটাকে মন চায় সারাক্ষণ বুকে আগলে রাখতে। যেন এক পলকের জন্যও চোখের আড়াল না হয়। সুখ পাখিটা যখন ডানা মেলতে শিখেছে। শিখেছে আব্বু আব্বু ধ্বনিতে হৃদয়রাজ্যকে মুখরিত করে তুলতে। শিখেছে হামাগুড়ি খেয়ে বাবার শরীর বেয়ে গাঁয়ে জড়াতে। কোমল হাতে মুষ্টি মেরে মধ্যমা আঙ্গুলি ধরে বাবার পিছু-পিছু আলতো কদমে হাঁটতে শিখেছে। শিখেছে বাবার কাজের সহযোগিতা করতে। বৃদ্ধ পিতার স্নেহের ছায়া ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে নতুন পৃথিবীটা ঘিরে। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে পৃথিবীর কোলে। স্বর্গের সব সুখ যেন আবির্ভূত হচ্ছে নতুন এ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে। আর ঠিক তখনই নেমে এলো আসমানি পয়গাম, হে ইবরাহিম! তোমার হৃদয়ের মণিকোঠায় যত্নে রাখা প্রিয় পৃথিবীটাকে আমার জন্য কুরবানি করো। বৃদ্ধ বাবার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সরে যায় স্বপ্নের মেঘ-ছায়া। দৃঢ় কদমে এসে থমকে দাঁড়ান তিনি প্রিয় পুত্রের কাছে। আসমানি পয়গামের বর্ণনা দিয়ে বলেন—‘পুত্র আমার, রাতে আমি এক স্বপ্ন দেখেছি, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, তার জন্য তোমাকে কুরবানি করতে!’ (প্রাগুক্ত ১০২) এক দিকে দাঁড়িয়ে আছে খলিলুল্লাহ আর অপর দিকে জবিহুল্লাহ। গোটা পৃথিবী সে দিন নির্বাক হয়ে অবলোকন করছিল পিতা-পুত্রের ত্যাগের বিরল দৃশ্য। পৃথিবীর বুকে ভূমিষ্ঠ হতে যাচ্ছে এমন এক দুর্লভ, বিরল, দৃষ্টান্তহীন ও অভিনব ইতিহাস—যা এর আগে কখনোই দেখেনি এই সৃষ্টিকুল। পুত্র অকপটে বলে দিলো—‘শ্রদ্ধেয় পিতা, নিশ্চিন্তে আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়ন করুন। নিশ্চয়ই আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’ (প্রাগুক্ত ১০২) পুত্র ইসমাইলের চোখ-মুখে কোনো ভাবনান্তর নেই, নেই উৎকণ্ঠা আর প্রাণ হারাবার ভয়। এক কথায় এক বাক্যে প্রস্তুত হয়ে গেল খোদার তরে নিজেকে বিলিয়ে দিতে। কী দৃঢ় কদম, অনড়, অবিচল আর অটুট আপন সিদ্ধান্তে! মহান প্রভুর সন্তুষ্টির তরে পিতা—পুত্রের এমন ত্যাগ ও কুরবানি আল্লাহর কাছে এতটাই গৃহীত হলো যে, তা পৃথিবীবাসীর জন্য চির স্মরণীয় করে রাখলেন। ইসমাইল আ. -এর পরিবর্তে আসমানি পশু কুরবানি হলো। মুসলিম উম্মাহ যার অনুসারে অদ্যাবধি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কুরবানি করে যাচ্ছে এবং কেয়ামত অবধি করে যাবে। লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ। জেডএম/ |