
|
মাদরাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ না করলে পড়তে পারে যেসব বিরূপ প্রভাব
প্রকাশ:
১৭ মে, ২০২৬, ০৮:৪৮ রাত
নিউজ ডেস্ক |
যাকারিয়া মাহমুদ, সাব-এডিটর— মুসলমানদের বড় ধর্মীয় উৎসব—পবিত্র ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ। এ দিন এলেই চারদিকে পড়ে আনন্দের হিড়িক ও পশু জবাইয়ের মহোৎসব। তবে যুগ যুগ ধরে এ আনন্দ বিসর্জন দিয়ে আসছে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা। ঈদের দিনে বাবা-মা, পরিবার-পরিজন ছেড়ে তারা আনন্দ খুঁজে ফেরে জবাইকৃত পশুর রক্তমাখা চামড়ার ভেতর। দিনভর চামড়া সংগ্রহ। সন্ধ্যা গড়াতেই সেগুলো নিরাপদে ট্যানারিতে স্থানান্তর। তারপর ঘরের পথ। দেশ ও দশের সেবাই তাদের প্রধান লক্ষ। রাষ্ট্রের উন্নয়ন তাদের অঙ্গীকার। তা সত্ত্বেও, তাদের এই বিসর্জনকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে গত এক দশক ধরে। দিনভর ঘামঝরা খাটুনি খেটেও তারা পাচ্ছে না চামড়ার ন্যায্যমূল্য। লাভের বিপরীতে হচ্ছে বিপুল লোকসান। রাষ্ট্রও যেন তাদের এড়িয়ে যাচ্ছে আলগোছে। কিন্তু কথায় আছে—দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বিড়ালও নেকড়ে হয়ে ওয়ে ওঠে। কওমি মাদরাসাগুলোর এখন যেন এ প্রবাদেরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তারা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে—এখন সময় প্রতিবাদের। শ্রম-সাধনার অবমূল্যায়নের এই দুঃসময়ে মুখ বুজে বসে থাকলে ভবিষ্যৎ হয়ে উঠবে আরও দূর্বিসহ। এবং সাধুর রূপধারী অসাধু সিন্ডিকেটকারীদের আঙ্গুল রাতারাতি ফুলে হবে কলাগাছ। সম্প্রতি সিলেটসহ দেশের বেশ কিছু এলাকার বিভিন্ন কওমি মাদরাসা প্রতিবাদ জানিয়ে এ বছর চামড়া সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের দাবি—যে অবধি চামড়ার ন্যায্যমূল্য তাদের প্রদান করা না হবে, চামড়া সংগ্রহ তারা করবে না। জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই প্রতিবাদের ফল কী হতে পারে? এভাবে একে একে যদি বহুসংখ্যক কওমি মাদরাসা চামড়া সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকে, তাহলে কি দেশের বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা আছে? কীইবা সেই ক্ষতি? সে ক্ষতির তালিকাই উঠে এসছে আওয়ার ইসলামের আজকের এই প্রতিবেদনে— পরিবেশ দূষণ ও রোগবালাইয়ের বিস্তার বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশে পশু জবাইয়ের সংখ্যা প্রায় কোটি। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ লাখ চামড়া সংগৃহীত হয়। যার সিংহভাগ সংগ্রহ করা হয় কওমি মাদরাসাগুলোর অধীনে। বিশেষজ্ঞদের মতে মাদরাসাগুলোর এই সংগ্রহের পরিমাণ—শতকরা ৫০ শতাংশেরও বেশি। সম্প্রতি সারাদেশের মাদরাসাগুলোর জন্য ২০ কোটি টাকার লবণ বরাদ্দ ঘোষণা—এরই প্রমাণ বহন করে। এখন এই বিশাল পরিমাণ চামড়া যদি মাদরাসাগুলো সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ এগুলো নিয়ে পড়বে চরম ভোগান্তিতে। কোথায় রাখবে, কী করবে, জানবে না। এর ফলে দেরি হবে চামড়া পরিশোধন ও প্রক্রিয়াকরণে। পচন ধরাও বিচিত্র কিছু নয়। শহর- গ্রামের অলিতে-গলিতে জমবে পচা চামড়ার স্তূপ। ছড়াবে তীব্র দুর্গন্ধ। চিকিৎসাশাস্ত্র বলছে, বর্ষাকালে বা গরমের দিনে পচা চামড়া থেকে বাতাসে ও পানিতে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে ডেঙ্গু, ডায়রিয়া এবং নানা ধরনের চর্মরোগের মহামারি দেখা দিতে পারে। চামড়ার অপচয় ব্যবসায়ীদের তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়—ঠিক সময়ে সংগ্রহ করতে না-পারার কারণে। যদি মাদরাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকে তাহলে লোকবল সংকট দেখা দেবে এবং ঠিক সময়ে সম্ভব হবে না প্রাথমিক প্রক্রিয়া ও চামড়া সংগ্রহ। ফলে যে পরিমাণ চামড়া নষ্ট ও অপচয় হবে, শতাংশের হারে তা প্রায় ৫০-এরও বেশি। ট্যানারি শিল্পের আয় ধস বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (BTA), বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চামড়া সেল-এর তথ্যানুযায়ী সারাদেশে সরকারি নিবন্ধিত মোট ট্যানারির সংখ্যা ২৫০। মূল ট্যানারি (যা কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে) ছাড়াও বাংলাদেশে জুতা, ব্যাগ ও অন্যান্য চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রায় ৩,৫৯০টি ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের বড় প্রতিষ্ঠান প্রায় ৯০টি। মাদরাসাগুলো যদি প্রাথমিকভাবে চামড়া সংগ্রহ থেকে বিরত থাকে তাহলে এই ট্যানারি ও কোম্পানিগুলো কী পরিমাণ চামড়া সংকটে পড়বে তা বলাই বাহুল্য। দেশীয় কাঁচামাল ও রপ্তানি আয় খাতে ধস চামড়াশিল্প—বাংলাদেশের দ্বিতীয় আয় খাত। তৈরি পোশাক খাতের পরেই বৃহত্তম ও প্রধান রপ্তানি খাত এটি। অর্থসূত্র বলছে, বাংলাদেশে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রতিবছর গড়ে ১ বিলিয়ন থেকে ১.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়। টাকার হিসেবে যা প্রায় ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার ৮০০ কোটি। এছাড়া, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও প্রতিবছর প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বা সাড়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকার চামড়াজাত পণ্যের বেচাকেনা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের বার্ষিক চাহিদার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কাঁচামাল আসে শুধু কুরবানির ঈদ থেকে। মাদরাসাগুলো মাঠপর্যায় থেকে এই চামড়া সংগ্রহ না করলে ট্যানারিগুলো সস্তায় কাঁচামাল পাবে না, ফলে বিলিয়ন ডলারের চামড়া রপ্তানি খাত ধ্বসে পড়বে। সিন্ডিকেটকারীদের আধিপত্য বিস্তার সিন্ডিকেটকারীদের উপদ্রব এ দেশের প্রতিটা স্তরে আঠার মতো লেপ্টে আছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সমাজের মাছ বা কাঁচাবাজার পর্যন্ত—সর্বত্রই এর আধিপত্য। তবে চামড়াশিল্পে এই অসাধুদের আধিপত্য যেন অনেকটা বেশিই। মাদরাসাগুলো যদি চামড়া সংগ্রহ থেকে বিরত থাকে তাহলে তারা চামড়ার বাজারমূল্য বৃদ্ধির ব্যাপক অজুহাত পাবে। সুযোগে বহু পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করবে। ফলে জুতা, ব্যাগ, সুয়েটার, মানিব্যাগসহ চামড়াজাত সব পণ্যের দাম হবে আকাশছোঁয়া। জনসাধারণ পড়বে চরম ভোগান্তিতে। জনদু্র্ভোগ ও মাদরাসাগুলোর আর্থিক সংকট বৃদ্ধি কওমি মাদরাসাগুলো দেশের এতিম অসহায় ও দরিদ্র মুসলিম শিক্ষার্থীদের শেষ আশ্রয় বললে ভুল হবে না। যুগ যুগ ধরে নামকাওয়াস্ত খরচে বা সম্পূর্ণ বিনা খরচে এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করছে হাজার হাজার গরিব-অসহায় শিক্ষার্থী। সম্পূর্ণিই বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত সবকটা কওমি মাদরাসা। যার বড় অংশ আসে কুরবানির চামড়া থেকে। জনসাধারণ তাই তাদের প্রতি বড় আন্তরিক। জবাইকৃত পশুর চামড়া ফ্রিতেই দিয়ে থাকে মাদরাসায়। ফলে পরিবহন ও আনুষাঙ্গিক খরচের পর লভ্যাংশের সবটাই ঢোকে মাদরাসার ফান্ডে। এ আয় থেকেই পরিচালিত হয় শত-সহস্র দারিদ্রের পড়াশোনা ও দীন শেখার ব্যয়ভার। কিন্তু তীব্র দরপতনের কারণে যদি, মাদরাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ থেকে বিরত থাকে তাহলে শুধু দেশ বা সমাজেই না; বরং দুর্ভোগ নেমে আসবে অসংখ্য অসহায়ের জীবনে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে মূর্খতার মহামারি। এছাড়াও আরও বহু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে মাদরাসাগুলোর চামড়া সংগ্রহবিরোধী পদক্ষেপে। এসব ক্ষতি থেকে দেশ, দেশের অর্থনীতি ও জনসাধারণকে রক্ষা করতে চামড়ার ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের বিকল্প নেই। আইও/ |