
|
শুভ্রতার খোঁজে এক সন্ধ্যা
প্রকাশ:
১৭ মে, ২০২৬, ১০:৩৯ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| মাওলানা হাবীবুর রহমান খান || প্রফেসর হযরত। শব্দবন্ধনটি ইতিপূর্বে আর কার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে আমার জানা নাই। কিন্তু আমাদের 'মুহাম্মদ হামীদুর রহমান রহ.' কে এই নামের যথোপযুক্ত হিসেবেই পেয়েছি এবং দেখেছি। অবশ্য দেখাটা খুব কম ই হয়েছে। কাছে যাওয়ার সুযোগ একটু ছিল। কিন্তু দেখার সেই চোখ ছিল না। দেখেছি এবং দেখে চলছি তাঁর স্নেহধন্য ব্যক্তিদের চোখে। সে দেখার তৃষ্ণা আগেও মিটেনি, এখন বরং আরো বাড়ছে। রহিমাহুল্লাহু ওয়া হাফিজাল্লাহু যুররাইয়াতাহু ওয়া যাওয়িহ: আল্লাহ তাআলা তাঁকে রহম করুন এবং তাঁর সন্তান-সন্ততি ও সংশ্লিষ্ট সকলকে সব রকমের ফিতনা ফাসাদ থেকে রক্ষা করুন। হযরত যতদিন জীবিত ছিলেন তাঁর উপস্থিতি আমাদের জন্য ছিল প্রশান্তির মাধ্য। মজলিসে বসলে, কাছে গেলে, কথা বললে আত্মিক এক সুকুন অনুভূত হত। গত সন্ধ্যায় তাঁর প্রিয়জনদের মজলিসেও সেই সুকুন ও শান্তি যেন আকাশ থেকে পড়ছিল—পেঁজা তুলোর মতো মেঘ অথবা অন্য কোনো অজানা, অব্যক্ত উপমার সদৃশ। আত্মার জগতের সবাইকে পরমাত্মীয়ের চেয়েও কাছের মনে হচ্ছিল। সূত্র প্রফেসর হযরত। সম্ভবত এ ধরনের ক্ষেত্রেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত হাদীসটি প্রযোজ্য। অর্থ: রূহসমূহ সুসজ্জিত বাহিনীর মতো। তাদের মধ্যে যাদের পরিচয় (রূহের জগতে) হয়েছে, তারা (দুনিয়াতে) পরস্পর সম্প্রীতি লাভ করে। আর যাদের পরিচয় হয়নি, তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন থাকে।- সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৫৯ ১০ মে’র মজলিসটি ছিল প্রফেসর হযরত রহ. এর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা মজলিস। 'প্রকাশনা উৎসবের' স্থলে 'প্রকাশনা মজলিস' শব্দটি বরাবরের মত হযরতের জামাতা-খলীফা এবং স্মারকগ্রন্থের প্রকাশক মুফতী হাবীবুর রহমান খান দাবা. এর আভিজাত্য, সতর্কতা ও বিনয়ের প্রকাশ ঘটাল। আমি শব্দটি দেখে চলে গিয়েছিলাম হযরত রহ. এর আরেকটি শব্দের কাছে। মাদ্রাসা-মক্তবের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী মাহফিলে 'সান্ত্বনা পুরস্কার' শব্দটি হযরত রহ. এড়িয়ে চলতেন, বলতেন, 'উৎসাহ পুরস্কার'। শব্দ চয়নে, ডাকের মধ্যে এবং চাহনিতে কি যে আদর ও মায়া ছিল তা কিভাবে লেখে প্রকাশ করি? মাগরিবের নামাজের বেশ আগেই পৌঁছেছিলাম উত্তরা মডেল টাউন মসজিদ আলমাগফিরায়। বুয়েট আজাদ মসজিদের ইমাম সাহেবের সৌজন্যে কেমিক্যালের ড. শাওকত স্যারের গাড়িতে করে আসা-যাওয়াটা ছিল বেশ আরামদায়ক। মসজিদে প্রবেশ মাত্রই মাওলানা উবায়দুর রহমান খান সাদ বিশেষ অতিথি এর বিতাকা দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। এক ভাই জুতা রাখার জন্য পলিথিন এগিয়ে দিলেন। অনুষ্ঠান শেষে আমাদের মত অসতর্ক ব্যবহারকারীদের পলিথিনগুলো মসজিদ থেকে তোলার জন্য কেউ থাকলে পলিথিনের ব্যবস্থাপনাটা আরো দিলকাশ হত। এরপর গিয়ে বসি দক্ষিণে সামনের কাতারে। আলোচকদের নূরানী চোখে প্রফেসর হযরতকে দেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সামনের চেয়ারগুলো বাধা হচ্ছিল। চেয়ারগুলো পূর্বমুখী করে দিলে উত্তর-দক্ষিণের লোকদের দেখতে হয়ত সুবিধা হত। আরো সুবিধা হত যদি মিহরাবে শুধু আলোচক, ব্যবস্থাপক, সভাপতি ও সঞ্চালক থাকতেন এবং পশ্চিমে লোকজন উঠাবসা একটু কম করতেন। অবশ্য এ দুই-তিনটি বিষয় ছিল অনুষ্ঠানের তিলকস্বরূপ। মাগরিবের আগে বুয়েটের ডক্টর লুৎফুল কবির স্যারের বক্তব্য শুনলাম। বললেন, প্রফেসর হযরত ছিলেন ইংরেজি শিক্ষিতদের সাথে আলেমদের সেতুবন্ধন। আমরা ইংরেজি শিক্ষিতরা যত শিখি তত আলেমদের থেকে দূরে সরি এবং পেরেশানিতে পড়ি। অথচ পেরেশানি দূর হয় আলেমদের সোহবতে। মাগরিবের আজান হল। নামাজে ইমাম সাহেবের চমৎকার কন্ঠে 'সূরা মুনাফিকুন' এর শেষ রুকুর তেলাওয়াত মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনলাম। রুকুর প্রতিটি আয়াত ও শব্দ যেন প্রফেসর হযরতের কারনামা-কীর্তি তুলে ধরছিল। তরজমা: মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবেঃ হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন। - সূরা মুনাফিকুন - ৯-১১ পবিত্র কুরআন অনুযায়ী নিজে আমল করা এবং অন্যদের উৎসাহ প্রদান, প্রচার প্রসারে হযরত রহ. ছিলেন প্রবাদতুল্য। মুফতী মনসুরুল হক দাবা. এর ভাষ্যে 'সাচ্চা আশিকে কুরআন'। আর মুফতী উবায়দুল্লাহ দাবা. এর ভাষ্যে, 'হযরতের পুরো জীবনটা "তোমরা ইসলামে প্রবেশ কর পরিপূর্ণরূপে" আয়াতের বাস্তব নমুনা'। মাগরিব শেষে মুনাজাতে হাত তুললাম। হঠাৎ করেই মুখে দোয়া এলো, অর্থ: 'হে আল্লাহ তোমার ভালোবাসা চাই, তোমাকে যারা ভালোবাসে তাদের ভালোবাসা চাই এবং এমন আমলের ভালোবাসা চাই যা আমাকে তোমার কাছে পৌঁছে দিবে'। কাকতালীয় ভাবে মুফতী মনসুরুল হক দাবা. খুতবায় এ দুআটি পড়লেন। চমৎকৃত হলাম। প্রায় আড়াই হাজারেরও বড় মজমা। অধিকাংশ ই আলেম। কি জীবন গড়েছিলেন হযরত রহ.! আলেমদের ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। মাগরিবের পর সর্বপ্রথম বয়ানটি করলেন মুফতী মনসুরুল হক দাবা.। আলোচনার ঝাঁপি খুলে বসেছিলেন মনে হয়। অনুষ্ঠান চলবে ইশা পর্যন্ত। মুফতী সাহেবের আলোচনা আমরা শুনলাম প্রায় আধাঘণ্টা। তবুও না আমাদের আশ মিটেছে, না মুফতী সাহেবের। মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ দাবা. উপস্থাপনার এক ফাঁকে বললেন, 'আজ যারা বলবেন এবং শুনবেন সবার অতৃপ্তি থেকেই যাবে'। শরীফ হুজুর আরো বলেন, 'সাধারণ জীবনী গ্রন্থের চেয়ে স্মারক গ্রন্থে একজন মানুষকে আরো বেশি বিস্তৃতভাবে চেনা যায়'। তো মুফতি মনসুর দাবা. যে কথাগুলো বলছিলেন- আড়াই বছরের অল্প সময়ে এত বড় একটি স্মারকগ্রন্থ মাকতাবাতুল আশরাফ আমাদেরকে উপহার দিয়েছে। এটি নিশ্চয়ই হযরত রহ. এর কারামত। তিনি অনেক ইংরেজদের চাইতেও ভালো ইংরেজি জানতেন। দুই পরশ পাথরের স্পর্শ তাঁকে মহীরুহে পরিণত করেছিল। প্রথমজন মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ., দ্বিতীয়জন মুহীয়ুস সুন্নাহ আবরারুল হক রহ.। এই দুজনের বুকভরা দুআ পেয়েছিলেন তিনি। সদর সাহেব রহ. বলতেন, 'সংগ গুণে রঙ্গ ধরে'। আসলে প্রফেসর সাহেকে এত অল্প সময়ে শব্দের মালায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য বিষয়। তিনি যে কি ছিলেন - قدر نعمت بعد زوال নেয়ামত চলে যাওয়ার পর মানুষ সেটা বুঝতে পারে। ইংরেজি শিক্ষিত হয়েও কুরআন হাদিস বুঝার গ্রামার আয়ত্ত করেছিলেন ওলামা কেরামের সোহবতে। ইলমের গভীরতা ছিল তাঁর। এক প্রসংগে প্রফেসর সাহেব হাদিস পড়েছিলেন, " بَدَأَ الإِسْلَامُ غَرِيبًا، وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا، فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ অর্থ "ইসলাম শুরু হয়েছে গরীবে (অপরিচিত বা নিঃসঙ্গ অবস্থায়), আর অচিরেই তা সেভাবেই ফিরে যাবে যেভাবে শুরু হয়েছিল। সুতরাং সুসংবাদ (বা মোবারকবাদ) ঐ সকল ‘গরীব’ বা অপরিচিতদের জন্য।- সহীহ মুসলিম: ১৪৫ নবীজির ভাষ্য অনুযায়ী আলেমরা হচ্ছেন গুরাবা- অপরিচিত। বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করার মাধ্যমে তারা যদি 'ওরাফা' পরিচিত হয়ে উঠেন তাহলে গুরাবা কারা থাকবে"? মুফতী সাহেব বলেন, প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থটি প্রফেসর রহ. এর স্মৃতি আমাদের মাঝে সংরক্ষণ করবে এবং যারা তাঁকে পাননি তাদের জন্য উত্তম পাথেয় হবে। হে আল্লাহ, তোমার ভালোবাসা চাই, তোমাকে যারা ভালোবাসে তাদের ভালোবাসা চাই এবং এমন আমলের ভালোবাসা চাই যা আমাকে তোমার কাছে পৌঁছে দিবে। আল্লাহকে যারা ভালোবাসে তাদের ভালোবাসা নবীজি সাল্লাল্লাহু সাল্লাম মহান আল্লাহর কাছে কামনা করেছেন। মহান আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সাদিকিন নেককারদের সাথে থাকো। একা একা আসলে আগানো যায় না। ধুপি যেমন কাপড়ের ময়লা দূর করে আল্লাহওয়ালারাও তেমন আল্লাহতালার পক্ষ থেকে আমাদের অন্তরের ময়লা দূর করার চেষ্টা করেন। হাজারো মানুষ প্রফেসর সাহেবের সোহবতে এসে নিজেকে দ্বীনের লাইনে নিয়ে এসেছিলেন এবং সন্তানদেরকেও মাদ্রাসায় দিয়েছেন। আপনাদের দায়িত্ব হলো শায়েখের হায়াতে চলা কাজগুলো ধরে রাখা। এক কথায় যদি বলি, প্রফেসর সাহেব ছিলেন- কুরআনের আশেক, সুন্নতের আশেক, আলেমদের আশেক এবং আখেরাতের আশেক। দুনিয়ার কোন কিছু কামান নাই। দুনিয়া তো হলো আখেরাতের ছায়া। আসল ঠিক হয়ে গেলে ছায়াও ঠিক হয়ে যায়। সন্তানদেরকে আল্লাহর হাওলা করে দিয়ে গিয়েছেন। এরপর আলোচনা করেন জামিয়াতুল উলুমুল ইসলামিয়া এর শাইখুল হাদিস আবম সাইফুল ইসলাম দাবা.। আলেমদের এই মিলন মেলায় তিনি উপস্থিত হতে পেরে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন এবং বলেন, স্মারকগ্রন্থের প্রচ্ছদটি চমৎকার হয়েছে। গ্রামদেশে বটগাছের নিচে প্রথমে একটি দোকান বসে। সেটাকে কেন্দ্র করে আরেকটি দোকান বসে এভাবে বাজার-হাট গড়ে ওঠে। বট গাছের সাথে কত মানুষ কত রকমের আচরণ করে, কিন্তু বটগাছ কাউকে তাড়িয়ে দেয় না। আমাদের প্রফেসর হযরত রহ.ও এমনই ছিলেন। আমরা কত রকমের বেয়াদবি করেছি, কিন্তু কোন সময় দেখি নাই যে, তিনি কাউকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। বিরক্তিকর মানুষ থেকে আমরা দূরে থাকতে চাই, কিন্তু বিরক্তিকর মানুষকে তিনি বুকে জড়িয়ে নিতেন। মুফতী মনসুরুল হক দাবা. ও আবম সাইফুল ইসলাম দাবা. এর আলোচনায় চেয়ারে নামাজ সংশ্লিষ্ট একটি মাসআলার প্রতি ইঙ্গিত ছিল। বিস্তারিত ও সঠিক মাসআলাটি নিচে কমেন্টে দেওয়া লিঙ্ক থেকে দেখে নেওয়া যেতে পারে। আলোচনা করেছেন মাওলানা মিজানুর রহমান সাঈদ দাবা.। বললেন, এত আলেমের সামনে আমি কথা বলার ভার গ্রহণ করতে পারছি না। শুধু এতটুকু বলি, সুফিয়ান বিন উয়াইনা রহ. বলেছেন, এ ধরনের মজলিসে রহমত নাযিল হয়। আর হাদিসে এসেছে, তোমরা তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের উত্তম গুণাবলী আলোচনা করো। আমাদেরকে সে সুযোগ করে দেওয়ায় আমরা কর্তৃপক্ষের শুকরিয়া আদায় করছি। মুফতি মাহমুদুল হাসান (মুহতামিম জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া) বলেন, প্রফেসর হযরতের আখলাক-চরিত্রে যে কেউ মুগ্ধ হতো। বিপদগ্রস্তকে তিনি সর্বোচ্চ সহায়তা করার চেষ্টা করতেন। হজের সফরে হারিয়ে যাওয়া, বিপদে পড়া মানুষকে ৬/৭ ঘণ্টা ব্যয় করে আপন গন্তব্যে পৌঁছে দিতেন, বিপদ থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করতেন। তিনি আল্লাহর অলি ছিলেন। এজন্য অতীত-ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর তেমন কোন পেরেশানি বা ভয় ছিল না। أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ তরজমা: "জেনে রেখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।" : সূরা ইউনুস, আয়াত নং: ৬২ একই মাদ্রাসার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা আব্দুল গাফফার দাবা. বলেন, তাহাজ্জুদ পড়লে অনেকের পা মাটিতে পড়তে চায় না, কিন্তু মানুষের সাথে ব্যবহারে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্গাল। আমাদের প্রফেসর হযরত আখলাক চরিত্রে ছিলেন অনন্য। তিনি নিজে খুব তেলাওয়াত করতেন, অন্যের কাছে তেলাওয়াত শুনতে পছন্দ করতেন। আমি স্মারকগ্রন্থটি পড়া শুরু করেছি। এখানে হযরতের নাতি ওসমানের লেখাটি আমাকে খুব মুগ্ধ করেছে। ও লিখেছে, শেষবার দাদা যখন আমার কাছে তেলাওয়াত শুনতে চাইলেন আমি তাঁকে তেলাওয়াত শোনানোর আগেই দাদা বিদায় নিলেন। ইনশাআল্লাহ, একদিন আসবে যেদিন তেলাওয়াত শোনানো শুরু করবো আর সে দিনটি শেষ হবে না। এ কথাটি বলার সময় মাওলানা আব্দুল গাফফার দাবা.র কন্ঠ জড়িয়ে আসে, উপস্থিত সকলে হুহু করে কেঁদে ফেলে। মারকাযুদ দাওয়ার সম্মানিত মুদীর উস্তাদে মুহতারাম মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ দাবা.ও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সাধারণত তিনি বাইরের কোন মজলিসে যান না। এ মজলিস তাঁকে ঘরে বসে থাকতে দেয়নি। প্রফেসর হযরত রহ. এর উপরে প্রথম কাজটি তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক আল কাউসারের। ইন্তিকালের পরের মাসেই মাসিক আল কাউসার প্রফেসর হযরত রহ. এর উপর একটি বিশেষ সংখ্যা বের করেছিল। অল্প সময়ে মুদীর হুজুর হৃদয়ছোঁয়া কিছু কথা বলেন। বলেন, আমাদেরকে প্রফেসর হযরত রহ. এর জীবন থেকে গ্রহণ করতে হবে। তিনি তো চলে গেছেন। তারু আদর্শ আমাদেরকে আঁকড়ে ধরতে হবে। দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করা, স্রোতের বিপরীতে চলার মত মানুষ এখন খুব দরকার। নিজেকে সেভাবে গড়ে তুলতে হবে এবং অন্যদেরকেও সেভাবে গড়ে তোলার মেহনত করতে হবে। মজলিসে প্রধান অতিথি হিসেবে নাম লেখা ছিল জাতীয় মসজিদের খতিব উস্তাদে মুহতারাম মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব হাফিজাহুল্লাহু এর। তিনি এটা দেখে প্রথমে ই বলেন, প্রধান অতিথি আবার কী? এখানে এত বড় বড় ওলামায়ে কেরাম যারা এসেছেন, সবাইই তো আমন্ত্রিত অতিথি। আমি তো তাঁদের একজন নগন্য খাদেম। এরপর বলেন, প্রফেসর হযরতের মজলিসে অসংখ্যবার যাওয়ার তাওফীক হয়েছে। প্রত্যেকবারই সাক্ষাৎ ও মজলিস থেকে কিছু না কিছু শেখার, সবক গ্রহণ করার সুযোগ হয়েছে। আমি হযরতকে বলে রেখেছিলাম, আপনার যে কোনো প্রয়োজনে আমাকে বলবেন, আমি আপনার কাছে চলে আসব। কিন্তু হযরতকে এ ব্যাপারে কখনোই রাজি করাতে পারতাম না। হযরত নিজেই চলে আসতেন। এক দুইবার হয়তো অনেক জোর করে হযরতের কাছে চলে গিয়েছিলাম। অথচ আমরা তো হযরতের কাছে সন্তানতুল্য একবার একটি স্পর্শকাতর মাসআলায় তাঁর ফায়সালা প্রয়োজন ছিল। তিনি বিষয়টি মুফতি আব্দুর রহমান সাহেব রহ. কাছেও জিজ্ঞাসা করেছিলেন। হযরত একটি রায় দিয়েছিলেন। এরপর আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম, ‘আপনার তো বড়দের সঙ্গে অনেক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আপনি কি এ ব্যাপারে মুফতি সাহেবের কাছে জিজ্ঞাসা করেননি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, জিজ্ঞাসা করেছি। তবে এখন তোমার কাছে জিজ্ঞাসা করছি। তুমি যে ফায়সালা দিবে, আমি সেটার ওপরই থাকব। আমি আবার মুফতি সাহেবের কাছে জিজ্ঞাসা করব না।’ ঘটনাটির উপর মন্তব্য করতে গিয়ে খতীব সাহেব বললেন, “অনেকেই আছেন, যারা একাধিক ব্যক্তির কাছে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করেন। একজনের কাছে জিজ্ঞাসা করে সেই ফতোয়া নিয়ে আবার আরেকজনকে বলেন, ‘অমুক তো এই বলেছেন, আর আপনি এরকম বলছেন!’ কিন্তু এ ব্যাপারে হযরতের আদব দেখুন—তিনি আগেই বলে দিচ্ছেন, ‘আমি এটা নিয়ে আবার মুফতি সাহেবের কাছে যাব না।’ স্মারকগ্রন্থ সম্পর্কে তিনি বলেন, “মুফতি তাকি উসমানি সাহেব দামাত বারাকাতুহুম আমাকে পাঠানো এক চিঠিতে লিখেছেন, কিতাব যেন শুধুমাত্র মজা নেওয়ার জন্য বা স্বাদ গ্রহণের জন্য পড়া না হয়; বরং এখান থেকে সবক নেওয়ার জন্য, ইলম অর্জনের জন্য এবং নিজের জীবনে আমলের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে পড়া হয়। কিতাব পড়ার একটা স্বাদ অবশ্য ই আছে, সে স্বাদ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দান করুন এবং আমলের তৌফিক দিন। প্রফেসর হযরত যে সকল আলেমেদ্বীনের সাথে সবচেয়ে বেশি ওঠাবসা করেছেন তাদের অন্যতম মুফতি উবায়দুল্লাহ দাবা.। তিনি বলেন, প্রফেসর সাহেবের জীবন থেকে আমরা যেভাবে ফায়দা গ্রহণ করেছি এবং এই স্মারক থেকে করব অনুরূপভাবে এখন তাঁকে আমাদের ফায়দা পৌঁছাতেও হবে। মৃত ব্যক্তিরা অপেক্ষায় থাকেন, তাঁর জন্য তাঁর ছেলে, আত্মীয়, ভক্ত অনুরক্তরা কি পাঠাচ্ছে। মৃত ব্যক্তির নেকি যত থাকুক তাঁর হক আছে আমাদের কাছ থেকে পাওয়ার। থানবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন, আমার মৃত্যুর পর আমার কথা যদি তোমাদের মনে পড়ে তাহলে তিনবার সূরা ইখলাছ পড়ে পাঠিয়ে দিও। অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে এসে উপস্থিত হন দেওনার পীর সাহেব অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান দাবা.। তিনি বলেন, আমি যখন প্রফেসর হযরতের ইন্তেকালের খবর পাই তখন ছিলাম দিল্লি এয়ারপোর্টে। ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমে সরাসরি তাঁর জানাজায় চলে আসি। সেই সময় থেকে এক রকমের শূন্যতা অনুভব করছি। বুয়েটকে তিনি মাদ্রাসায় পরিণত করেছিলেন। স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ এবং অন্যান্য খেদমতের মাধ্যমে মুফতি হাবিবুর রহমান খান জামাই হিসেবে শ্বশুরের প্রতি যে সম্মান দেখালেন সত্যিই তা বিরল। আল্লাহ তাঁকে উত্তম বিনিময় দান করেন। প্রফেসর সাহেব ছিলেন এই জামানার খাজা আজিজুল হাসান মাজযুব ও ডাক্তার আব্দুল হাই আরিফী রহ. এর বাস্তব নমুনা। আল্লাহ তাআলা তাদের সকলকে উত্তম জাযায়ে খাইর দান করেন। সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর হযরত রহ. এর বড় ছেলে ও খলিফা মুফতি রেজওয়ানুর রহমান দাবা. সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং মুনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি করেন। ইশার নামাজের সময় হয়ে এলো। মাইক থেকে ঘোষণা এল, সামনে থাকা মুরুব্বিদের জন্য প্রথম কাতারে ব্যবস্থা করে দেওয়া হলে ভালো হয়। মুহূর্তের মধ্যে জায়গা খালি হয়ে গেল। উস্তাদে মুহতারাম মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব দামাত বারকাতুহুম ছিলেন মিহরাবের কাছে। মুরব্বিদের জন্য জায়গা করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি তৎক্ষণাৎ মিহরাবের পার্শ্ববর্তী দরজা দিয়ে বের হয়ে দ্বিতীয় তলায় চলে গেলেন এবং সেখানে নামাজ আদায় করলেন। অথচ জায়গা তাঁর জন্য খালি ছিল মিহরাবের কাছে সামনের কাতারেই। দু তলায় উস্তাদে মুহতারাম মাওলানা সাঈদ বিন গিয়াস দাবা. এর সাথে দেখা হল। চিরচেনা হাসিমাখা চেহারাসহ মুসাফাহার জন্য আগেই হাত বাড়িয়ে দিলেন। পরিবার ও কর্মক্ষেত্রের হালপুরসি করলেন বেশ আন্তরিকতা ও স্নেহের সাথে। বের হওয়ার মুহূর্তে ধরে বসলেন হাফেজ মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান বিন প্রফেসর হযরত। হাত ধরে আটকে রাখলেন কিছুক্ষণ। না খেয়ে যেতে দিবেন না কিছুতেই। খুব কষ্টে পালাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। প্রফেসর হযরতের এক ভক্ত ও বুয়েটের প্রফেসর আটকে ফেললেন। মনে হল, প্রফেসর হযরত বলছেন, আমার এলাকায় এসেছো, না খেয়ে চলে যাবে! শুভ্রতার মিলনমেলা থেকে ফেরার পথে সারাটা পথ জুড়ে নিজেকে আগের চেয়ে আরেকটু শুভ্র শুভ্র মনে হচ্ছিল। ধরে রাখতে পারব তো এ শুভ্রতা। লেখক: স্বত্বাধিকারী, মাকতাবাতুল আশরাফ জেডএম/ |