
|
‘বাবরি মসজিদ রায়ে মন্দির ভাঙার প্রমাণ মেলেনি’
প্রকাশ:
১৭ মে, ২০২৬, ০৮:৪৬ সকাল
নিউজ ডেস্ক |
বাবরি মসজিদ রায় ও ‘প্লেসেস অব ওয়ারশিপ অ্যাক্ট-১৯৯১’ নিয়ে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাবরি মসজিদ নির্মাণে কোনো মন্দির ভাঙার চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষায় ‘প্লেসেস অব ওয়ারশিপ অ্যাক্ট-১৯৯১’ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। শনিবার (১৬ মে) নয়া দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়ার ডেপুটি স্পিকার হলে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অধীনস্থ সংস্থা ‘জাস্টিস অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট অব মাইনরিটিজ’ এবং সাউথ এশিয়ান মাইনরিটিজ লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (সামলা)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা মাহমুদ আসাদ মাদানি। এতে দেশটির খ্যাতিমান সিনিয়র আইনজীবী, সাবেক বিচারপতি, আইনি বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদরা অংশ নেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯১ সালের উপাসনালয় আইন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়—বিশেষ করে ‘ইসমাইল ফারুকি মামলা’ (১৯৯৪) ও ‘এম. সিদ্দিকি-আযোধ্যা রায়’ (২০১৯)-এর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইসমাইল ফারুকি মামলায় “মসজিদ ইসলাম ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়” — এমন পর্যবেক্ষণ পরবর্তী মামলাগুলোতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তব্যে মাওলানা মাহমুদ আসাদ মাদানি বলেন, বাবরি মসজিদ রায় নিয়ে একটি গভীর ও গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন ছিল, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে যে এ রায়কে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেও সাংবিধানিক ও বিদ্বৎসম্মতভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, বাবরি মসজিদ মামলায় কোথাও প্রমাণ হয়নি যে কোনো মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। বরং সুপ্রিম কোর্ট নিজেই রায়ের ৭৮৮ নম্বর অনুচ্ছেদ ও পরবর্তী অংশে বলেছে, এ দাবির পক্ষে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ নেই। তিনি আরও বলেন, রায়ের পর ভারতীয় মুসলমানরা ধৈর্য ও সাংবিধানিক আনুগত্যের পরিচয় দিলেও এখন জ্ঞানবাপী, মথুরা ঈদগাহ, কমাল মৌলা মসজিদসহ বিভিন্ন উপাসনালয় নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব শুধু মুসলমানদের বিষয় নয়; বরং ভারতের সাংবিধানিক পরিচয়, বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অনুষ্ঠানে সিনিয়র আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং বলেন, বাবরি মসজিদ রায় ও উপাসনালয় আইন কেবল একটি ধর্মীয় স্থানের বিতর্ক নয়; এটি ভারতের সাংবিধানিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন। তিনি বলেন, একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বিচারকের প্রধান দায়িত্ব হলো সংবিধান, আইন ও সমতার ভিত্তিতে রায় দেওয়া; ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়। প্রফেসর ফাইজান মুস্তাফা বলেন, ‘প্লেসেস অব ওয়ারশিপ অ্যাক্ট-১৯৯১’ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক অবস্থান সংরক্ষণের একটি সাংবিধানিক প্রচেষ্টা। তবে শুধু আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়; ধর্মীয় স্থাপনার নথি, ঐতিহাসিক দলিল ও আইনি অবস্থানও শক্তভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। সিনিয়র অ্যাডভোকেট সালমান খুরশিদ বলেন, ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের (এএসআই) প্রতিবেদনে কোথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই যে কোনো মন্দির ভেঙে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। সিনিয়র আইনজীবী এম আর শামশাদ সতর্ক করে বলেন, উপাসনালয় আইনকে দুর্বল করা বা এএসআই আইনের মাধ্যমে নতুন বিরোধ তৈরির চেষ্টা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক কাঠামোর জন্য হুমকি হতে পারে। অ্যাডভোকেট নিজাম পাশা বলেন, “মসজিদ কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এটি মুসলমানদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের প্রতীক।” তিনি দাবি করেন, বাবরি বিতর্ক মূলত “স্থান বনাম স্থান”-এর বিরোধ ছিল, “বিশ্বাস বনাম বিশ্বাস”-এর নয়। সাবেক বিচারপতি ইকবাল আহমদ আনসারি বলেন, বাবরি মসজিদ মামলায় যা হয়েছে তা কেবল একটি “ডিসিশন”, পূর্ণাঙ্গ অর্থে “জাজমেন্ট” নয়। তার মতে, প্রকৃত বিচারিক রায়ের জন্য শক্তিশালী ও যৌক্তিক ভিত্তি প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট এজাজ মকবুল, অ্যাডভোকেট ফিরোজ গাজী, গবেষক নিজামুদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেট রউফ রহিম ও অ্যাডভোকেট তাহির এম হাকিম। এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ হাকিমুদ্দীন কাসেমী, মাওলানা নিয়াজ আহমদ ফারুকী, রুবিনা জাভেদ, জেএইচ জাফরি, ফুজাইল আইয়ুবী, রুখসানা চৌধুরী, এ সিরাজুদ্দীন, প্রফেসর হাসিনা হাশিয়া, প্রফেসর মুজিবুর রহমান, তৈয়্যব খান ও মোহাম্মদ নূরুল্লাহসহ দেশের বিভিন্ন খ্যাতিমান আইনজীবী ও শিক্ষাবিদরা। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন মন্সুর আলী খান এবং সঞ্চালনা করেন সামলার সভাপতি নাসির আজিজ। জেডএম/ |