
|
বিধর্মীর নামে কুরবানির পশুর নামকরণ: ইসলাম কী বলে?
প্রকাশ:
১৬ মে, ২০২৬, ০৬:২২ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
ওলিউল্লাহ মুহাম্মাদ কুরবানি কেবল একটি পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি ইসলামের অন্যতম একটি ‘শিআরুল্লাহ’ বা মহান আল্লাহর দ্বীনের অন্যতম নিদর্শন। এই ইবাদতটির মূল লক্ষ্য হলো তাকওয়া অর্জন এবং ইব্রাহিমী ত্যাগের মহিমায় নিজেকে আল্লাহর রাহে সমর্পণ করা। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, পশুহাটে কিছু পশুর নাম রাখা হচ্ছে কুখ্যাত কাফের, জালেম বা ইসলামবিদ্বেষী নেতাদের নামে। আপাতদৃষ্টিতে এটি ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ বা হাস্যরসের ছলে করা হলেও, ইসলামি শরিয়াহর গভীর বিশ্লেষণে এটি ইবাদতের মর্যাদা ও আকিদাগত চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামে নামের একটি নিজস্ব প্রভাব ও মহিমা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বদা মন্দ ও কুৎসিত নাম পরিবর্তন করে সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, রাসূল ﷺ অপছন্দনীয় নাম পরিবর্তন করে উত্তম নাম রাখতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৩৯)। এই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিমের জবান এবং চিন্তা যেন সর্বদা পবিত্র ও ইতিবাচক বিষয়ের সাথে যুক্ত থাকে। কুরবানির মতো একটি পবিত্র ইবাদতের সাথে এমন কোনো নাম যুক্ত করা যা ঘৃণা, জুলুম বা কুফরি প্রতীকের প্রতিনিধিত্ব করে, তা ইবাদতের আধ্যাত্মিক শুভ্রতাকে কলুষিত করে। পশুর নামকরণ ইসলামে বৈধ, কারণ নবী করিম ﷺ নিজেই তাঁর উটের নাম ‘কাসওয়া’ এবং ঘোড়ার নাম ‘সাকব’ ও খচ্চরের নাম রেখেছিলেন ‘দুলদুল’ (যাদুল মাআদ, ইবনুল কায়্যিম)। তবে সেই নামগুলো ছিল মার্জিত এবং অর্থহীন বিতর্ক থেকে মুক্ত। যখন কোনো মুসলিম কুরবানির পশুর নাম ‘ট্রাম্প’ বা ‘নেতানিয়াহু’ বা মোদীর মতো ব্যক্তিদের নামে রাখে, তখন সে অজ্ঞাতসারেই ইবাদতকে একটি তামাশার বস্তুতে পরিণত করে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “এটাই হলো বিধান; আর কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করলে তা তো তার হৃদয়ের তাকওয়া থেকেই উদ্ভূত।” (সূরা আল-হাজ্জ: ৩২)। পশুর নাম নিয়ে হাস্যরস বা ভাইরাল হওয়ার প্রচেষ্টা আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের নামান্তর। অনেকে দাবি করেন, কাফের নেতাদের প্রতি ঘৃণা থেকেই তারা এমন নাম রাখছেন। কিন্তু ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে একটি ইবাদতকে বেছে নেওয়া শরীয়তসম্মত নয়। ইবাদত হতে হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, সেখানে রাজনৈতিক বিদ্বেষ বা বিদ্রূপের মিশ্রণ ইখলাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফিককি মূলনীতি অনুযায়ী, ইবাদতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণকারী যেকোনো কাজ থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। ইমাম ইবনে হাজর হাইছামি রহ. উল্লেখ করেছেন যে, ইবাদতকে খেল-তামাশার বিষয়ে পরিণত করা কবিরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে (আয-যাওয়াজির আন ইক্তিরাফিল কাবায়ির)। অধিকন্তু, কাফেরদের নাম বারবার মুখে নেওয়া বা সেগুলোকে একটি ইবাদত সংশ্লিষ্ট পশুর সাথে যুক্ত করা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়। রাসূল ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৩১)। যদিও পশুর নাম রাখা সরাসরি কুফরি নয়, কিন্তু কাফের নেতাদের নামকে সাধারণ আলোচনা বা বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা মুসলিম সংস্কৃতির স্বকীয়তার পরিপন্থী। এটি ধীরে ধীরে মুসলিমদের বিশেষত শিশুদের মনোজগতে এসব অশুভ নামের প্রতি এক ধরনের অভ্যাস বা স্বাভাবিকতা (Normalization) তৈরি করে দেয়। পরিশেষে বলা যায়, কুরবানি একটি আধ্যাত্মিক সফর যা বান্দাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে। এখানে লৌকিকতা, সস্তা প্রচার বা বিদ্রূপের কোনো স্থান নেই। পশুর নাম যদি রাখতেই হয়, তবে তা সুন্দর ও মার্জিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। ইবাদতের মাহাত্ম্য রক্ষা করা এবং কাফের-মুশরিকদের কুরুচিপূর্ণ সংস্কৃতি ও প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা প্রত্যেক মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭)। সুতরাং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত তাকওয়া অর্জন, সস্তা জনপ্রিয়তা বা বিতর্কিত রুচির চর্চা নয়। লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও প্রবন্ধকার আরএইচ/ |