মুফতি আহমদ আলী: দায়, দরদ ও দায়িত্বের জায়গায় তিনি অবিচল
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০৬:২৮ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

মুফতি এনায়েতুল্লাহ

আমি ধন্য। আমি কৃতজ্ঞ। ক্ষুদ্র জীবনে আমি এমন শিক্ষকদের ছায়া পেয়েছি, যাদের কারণে জাতি হাজার হাজার যোগ্য মানুষ পেয়েছে।

সমাজে শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই হয়ে ওঠেন আদর্শ ও অনুপ্রেরণা। আর এ কারণেই শিক্ষককে বলা হয়- মানুষ গড়ার কারিগর।

আমার উস্তাদ, শায়খুল হাদিস মুফতি আহমদ আলী এমনই একজন শিক্ষক। শিক্ষা জীবনের শুরুতে তার কাছে পড়ার সুযোগ হয়েছে ময়মনসিংহ জামিয়া ইসলামিয়ায়।

সাধারণত মিজান-নাহবেমীর জামাতের এক ছাত্রকে বড় মাদরাসায় আলাদাভাবে চেনার কোনো কারণ নেই। কিন্তু না, তিনি আমাকে শুধু চিনতেনই না, নিয়মিত খোঁজ-খবরও নিতেন। তার নজরের বাইরে চলা ছিল অসাধ্য।

তিনি জামিয়া ইসলামিয়া থেকে চলে যাওয়ার বছর খানেকপর আমিও ঢাকা চলে আসি। কিন্তু হুজুরের সঙ্গে যোগাযোগটা থেকে যায়। তিনি সেই সময় থেকে সন্তানসম মহব্বত করেন, যা এখনও চলমান।

একজন দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক হিসেবে তার তুলনা তিনিই। তিনি অন্য শিক্ষকদের জন্য অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব। তার মায়াভরা মুখ, ছাত্রদের প্রতি আন্তরিক পরামর্শ, ভালোবাসা এবং অভিভাবকত্ব আমাদের পাথেয়।

কাপাসিয়ার দেওনা মাদরাসায় বসে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি যে ছাত্রদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়, এর মূলমন্ত্র কী? প্রশ্ন শুনে হুজুর বলেন, কই? এটা তুমিই প্রথম বললা। তবে আমি ভাবি, ‘ছাত্ররা আমার নিজের সন্তানের মতো। তাই শুধু পড়াশোনা নয়, ওদের যেকোনো সমস্যায় পাশে থাকার চেষ্টা করি।’ আর হুজুরের পাশে বসে, বন্ধুবর মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী বলেন, আমি উত্তরটা দেই। মাওলানা আইয়ূবীর ভাষায়, ‘তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠদানকে ঘরসংসার মনে করার মতো শিক্ষক। তাই তিনি জনপ্রিয়।’ আমরাও খুব কাছে থেকে দেখেছি, ‘শিক্ষকতাই তার ধ্যানজ্ঞান। ছাত্র অন্তপ্রাণ শিক্ষক।’

মুফতি আহমদ আলী এক ঈর্ষণীয় ও বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। ১৯৬৩ সালের ৩ অক্টোবর হবিগঞ্জের কাটাখালি গ্রামে জন্ম। শিক্ষাজীবনের শুরুতে ইলমে অহির প্রতি অপরিসীম ভালোবাসায় তার পিতা তাকে জামিয়া ছাদিয়া রায়ধর হবিগঞ্জ মাদরাসায় ভর্তি করেন। এখান থেকেই তার ইলম অন্বেষণকালের সূচনা। এরপর তিনি জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া উমেদনগর-হবিগঞ্জে শরহে বেকায়া শেষ করে জামিয়া ছাদিয়া রায়ধর মাদরাসায় জালালাইন থেকে তাকমিল সম্পন্ন করেন। পরে হাটহাজারী মাদরাসায় ১৯৮০ সনে পুনরায় তাকমিল অধ্যয়ন করেন এবং ওই সময় মাদরাসার প্রধান মুফতি আহমদুল হকের নিকট ইফতা অধ্যয়ন করেন। মেধাবী হিসেবে তার ব্যাপক সুনাম রয়েছে। আর ছাত্রজীবনে তিনি এক অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তাহলো- শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো একটি ক্লাসেও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন না।

১৯৮১ সালে মুফতি আহমদ আলীর কর্মজীবন শুরু হয় বোখারি আওয়ালের দরস দিয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় জামিয়া নিযামিয়া বানূরগাছীতে (মধুপুর, টাঙ্গাইল) দরস প্রদান করেন। পরে আমার আরেক উস্তাদ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাহেবের মাধ্যমে ময়মনসিংহের প্রাচীন মাদরাসা জামিয়া ইসলামিয়া চলে আসেন। ১৯৮৫-৯৩ সন পর্যন্ত এখানে শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। এখানেই আমি হুজুরের কাছে পড়ার সুযোগ পাই। যা আমার জীবনের বাঁক পরিবর্তনকারী ঘটনা।

কর্মজীবনের নানা ধাপে মুফতি আহমদ আলী মিফতাহুল উলুম মাদরাসা মাসকান্দা, জামিয়া আশরাফিয়া খাগডহর ময়মনসিংহে শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রায় ১৬টির অধিক মাদরাসায় নিয়মিত বোখারি শরিফের দরস প্রদান করে যাচ্ছেন। শিক্ষকতার লম্বা সময়ে দরসে নেজামির সকল কিতাব তিনি পাঠদান করেছেন এবং দীর্ঘ ৪০ বছর যাবৎ বোখারি শরিফের দরস দিয়ে আসছেন।

সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশ তিনি সফর করেছেন। তার ঐতিহাসিক ভ্রমণ হলো- বোখারা ও সমরকন্দ। সেখানে তিনি ইমাম বোখারি (রহ.)-এর দরসগাহে বসে বোখারির দরস প্রদান করেন এবং হাদিসশাস্ত্রের মহান ব্যক্তিদের মাকবারা জিয়ারত করেন।

মুফতি আহমদ আলী আরিফ বিল্লাহ অধ্যক্ষ মো. মিযানুর রহমান চৌধুরীর খলিফা। এছাড়া মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা শিহাব উদ্দিন ও মাওলানা আব্দুল মজিদ (পীর সাহেব কালিশিরী রহ.)-এর কাছ থেকেও খেলাফত পেয়েছেন।

চার সন্তানের জনক মুফতি আহমদ আলী ওয়ায়েজ হিসেবেও অনন্য। আলোচনায় অসাধারণ উপস্থাপনশৈলী তাকে জনপ্রিয় করেছে। চমৎকার উপমা দিয়ে তিনি বয়ান করেন, যাতে শ্রোতারা মুগ্ধ হয় খুব দ্রুত। ব্যক্তি জীবনে তিনি সহজ-সরল চলাফেরায় অভ্যস্থ।

মুফতি আহমদ আলী সদালাপী ও মিষ্টভাষী। বিশাল মনের অধিকারী। তিনি মেধার মূল্যায়ন করেন। বিশেষ করে একটু চঞ্চল শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে গড়ে তুলতে ফিকির করেন, তাদের স্নেহ করেন। অল্প সময়েই তিনি সবাইকে কাছে টেনে নেন। প্রথম পরিচয়ে কারও মনে হবে না, আলাপে আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল। যেকোনো বিষয়ে মতামত প্রদানে তিনি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেন। বর্তমানে তিনি হজের সফরে পবিত্র মক্কায় অবস্থান করছেন।

মক্কায় এক বর্ণচোরা মুফতি হুজুরের সঙ্গে সাক্ষাত করে বিভ্রান্তিমূলক ঘটনার অবতারণা করেছেন। এটা রীতিমতো বিরক্তিকর ঘটনা। তবে আমার এই লেখা ওই বর্ণচোরার সাক্ষাতকে কেন্দ্র করে নয়, তার কথা কিংবা অপপ্রচারে আমার উস্তাদের কিছু যায় আসে না। আমার উস্তাদ সমুদ্রসম ব্যক্তিত্ব। এখানে এক নুরুজ্জামান কেন হাজারও নুরুজ্জামান লবণের মতো গলে ক্ষয় হতে বাধ্য। তারপরও যেহেতু কথা উঠেছে, তাই তর্কের খাতিরে কথাটা বলা।

লেখার শুরুতেই বলেছি, আমি ধন্য, আমি কৃতজ্ঞ। হ্যাঁ, আবারও বলছি, আমি ধন্য। আমার সুযোগ হয়েছে মুফতি আহমদ আলীর ছাত্র হওয়ার। তার ছাত্র হওয়ার সুবাধে তাকে চিনি, অন্যায়কে তিনি কতটা ঘৃণা করেন, বাতিলের প্রতি তার কঠোর মনোভাব সম্পর্কে। সুতরাং কথিত মুফতির কথায় বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

তার পরও মুফতি আহমদ আলী এ বিষয়ে জানিয়েছেন, "নুরুজ্জামান নুমানী সাহেবকে আজ থেকে প্রায় ১৫ বৎসর পূর্বে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদায় বিশ্বাসী ও ওলামায়ে দেওবন্দের মাসলাকের উপর ঠিক থাকার শর্তে খেলাফত দিয়েছিলাম। এখন তিনি সেই শর্তের উপর নাই।

ফেইসবুকে তাঁর একটি স্বপ্নের কথা দেখতে পেয়ে তাকে আমার মক্কার হোটেলে ডেকে এনেছিলাম এ বিষয়ে কথা বলার জন্য। কিছু কথা হয়েছে আরো কথা বলব তার সাথে- ইনশাআল্লাহ।

সুতরাং এ বিষয়ে ভুল বুঝার কোনো অবকাশ নেই। আল্লাহ পাক সকলকে সহিহ বুঝার তওফিক দান করুন।"

লেখা শেষ করি একটি শক্ত কথা বলে, মুফতি আহমদ আলী একটি সাহসী কণ্ঠ। দায়, দরদ ও দায়িত্বের জায়গা থেকে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার নৈতিক অবস্থান সম্পর্কে বিন্দুমাত্র বিচলিত হওয়ার সুযোগ নেই। আল্লাহ আমার উস্তাদকে নিরাপদে রাখুন, হিংসুকদের হিংসা থেকে মুক্ত রাখুন। আমিন।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

আরএইচ/