
|
দ্বিচারিতা নয়, প্রকৃত ইসলামি রাজনীতিই কাম্য
প্রকাশ:
২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৩৯ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া || ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দিকনির্দেশনা প্রদান করে। আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন: ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।’ (সূরা মায়িদা: ৩) এই আয়াত প্রমাণ করে যে, ইসলাম কোনো অপূর্ণ জীবনব্যবস্থা নয়। সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, ব্যবসা-বানিজ্য, অর্থনীতি, আচার-আচরণ সবকিছু সম্পর্কে রয়েছে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধিবিধান। ইসলাম যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা তাই রাজনীতিও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রাজনীতি হলো দেশ ও সমাজ পরিচালনার সেই নীতি বা কৌশল, যার মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা, ক্ষমতার বিন্যাস এবং জননিরাপত্তা বা জনকল্যাণ নিশ্চিত করার একটি প্রক্রিয়া হলো রাজনীতি। বিভিন্ন মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে মানুষ রাজনীতি চর্চা করে থাকে। ইসলাম ব্যতীত সকল মতাদর্শই হলো মানব তৈরি এগুলোর কোনোটিই মানবের ইহজাতিক কল্যাণ এবং পারলৌকিক মুক্তি নিশ্চিত করে না। কেবল ইসলামী জীবনব্যবস্থাই উভয় জাগতিক কল্যাণের নিশ্চয়তা প্রদান করে। মানব কল্যাণের রাজনীতিও হতে হবে ইসলামী দিকনির্দেশনার আলোকে। এর বিপরীত কিছু করার অর্থই হলো ইসলামকে অপূর্ণাঙ্গ মনে করা, শূন্যতা পূরণে ভিন্ন মতাদর্শ থেকে ধার নেয়া। যা ইসলাম কায়েমের দাবীদারদের নীতি হতে পারে না। রাজনীতিকে যদি সত্যিকার অর্থে ইসলামীকরণ করতে হয়, তাহলে শুধু নামে ‘ইসলাম’ লিখলেই হয় না, নীতি, প্রতি পদক্ষেপ, প্রতিটি কর্মপদ্ধতি ও প্রত্যেক সিদ্ধান্তে শরয়ি নীতিমালার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে। সবই করতে হবে ইসলামের নির্দিষ্ট বৃত্তে থেকে। ইসলামের সীমারেখা কোনো অবস্থাতেই অতিক্রম করা যাবে না। এই পরম সত্যটি জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। ব্যবসা যদি সুদভিত্তিক হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের নামের সাথে ‘ইসলামি’ শব্দ বসালেও তার স্বরূপ বদলায় না। মদের কারবার ইসলামী মোড়কে হলেও তা হারাম ব্যবসা হিসেবেই গণ্য হবে। কখনো হালাল ব্যবসার বৈধতার ‘সার্টিফিকেট’ লাভ করতে পারবে না। শিক্ষাক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা সুস্পষ্ট। ইসলামি শিক্ষার নিজস্ব কাঠামো ও লক্ষ্য আছে। সেই কাঠামো উপেক্ষা করে কেবল ইসলামি নামের বিদ্যালয় থেকে ইসলামি জ্ঞান ও বিজ্ঞান অর্জন করা যায় না। পারিবারিক জীবন সম্পর্কেও একই কথা। বিবাহ ও তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় আইন শরিয়া আইনের খেলাফ। শরিয়তের বিধান মেনে চলাই একজন মুসলিমের ঈমানের প্রধান দাবি। বিয়ে তালাকসহ সকল ক্ষেত্রেই শরিয়তের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী সেই বিধান অবশ্যই সকলকে পালন করতে হয়। বর্তমান বিশ্বে শাসনব্যবস্থাকে ইসলামিকরণ করতে নির্বাচনি রাজনীতি একটি অনিবার্য বাস্তবতা। লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হওয়া চাই ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এই নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে গিয়ে যদি ইসলামের কথা বলা না হয়, তাহলে সেই রাজনীতি যতই ইসলামি নাম বহন করুক না কেন, মূলত তা হবে ভোগবাদী বুর্জোয়া রাজনীতির ইসলামি ভার্সন। তা হবে একান্তই নাতিশীতোষ্ণ সংসদালয়ের আরামদায়ক কেদারায় আসন গ্রহণের একটি সিঁড়ি মাত্র। ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখানো হবে আত্মপ্রবঞ্চনা ও মানুষকে বিভ্রান্ত করারই নামান্তর। ইতিহাস এই সত্যের সাক্ষী। মুসলিম লীগ মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করলেও নেতাদের জীবনব্যবস্থায় ইসলাম ছিল অনুপস্থিত। ফলে সেই দল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। আজও যে দলের নেতা-কর্মীদের জীবনপদ্ধতি ইসলামের আলোকে সজ্জিত নয়, সে দলের মাধ্যমে প্রকৃত ইসলাম প্রতিষ্ঠা কেবল দিবাস্বপ্ন। দলের নামে ইসলাম থাকলেও কর্ম হবে ইসলাম শূন্য। পারিবারিক জীবন গড়ে উঠবে ওয়েস্টার্ন কালচারে। অনশন হারাম বলার পর আবার অনশন মঞ্চে গিয়ে সংহতি প্রকাশ করা, বেদিতে পুষ্পতোড়া নিবেদন করা, মন্দিরে উপস্থিত হয়ে শিরকি মন্ত্র গাওয়া, মুখে এক কথা, কর্মে আরেক, এ সবই স্পষ্ট দ্বিচারিতা বৈ কিছু নয়। এ চরিত্র ইসলাম অনুমোদিত নয়। এমন চরিত্রের দ্বারা ইসলাম কায়েম আদৌও সম্ভব নয়; কেবল প্রবৃত্তির চাহিদাই পূরণ হবে। যদি এমনটিই হয়, তাহলে ইসলামি দলের বিশেষত্ব কী রইল? রাজনীতিতে ইসলামের যে সীমারেখা আছে, সেগুলোকে কি চরমভাবে উপেক্ষা করা হয় না? নাকি ইসলামের রাজনৈতিক নির্দেশনা বর্তমানে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে? ইসলামের নাম লাগিয়ে যদি গতানুগতিক রাজনীতির চরিত্র ধারণ করতে হয়, তাহলে তো জনগণ ইসলামি রাজনীতিকে উপেক্ষা করবে, গতানুগতিক রাজনীতিকেই গ্রহণ করবে, ইসলামি রাজনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্ম নেবে। তাই দ্বিচারিতা বাদ দিয়ে প্রয়োজন হলো প্রকৃত ইসলামি রাজনীতির চর্চা করা, উলামায়ে হক্কানির নেতৃত্ব সুসংহত করা। লেখক: মুহতামিম, জামিয়া হোসাইনিয়া আরজাবাদ; যুগ্ম মহাসচিব, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম জেডএম/ |