
|
মহাকবি আল্লামা ইকবাল আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক
প্রকাশ:
২২ এপ্রিল, ২০২৬, ০৯:০২ সকাল
নিউজ ডেস্ক |
|| খন্দকার মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ || উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে মুসলিম উম্মাহ যখন এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন দিগন্তের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল। ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর বর্তমান পাকিস্তানের শিয়ালকোটে এক ধর্মপ্রাণ পরিবারে ইকবালের জন্ম। তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন না, ছিলেন এক যুগান্তকারী দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তাঁর প্রতিটি পঙক্তি ছিল ঘুমন্ত এক জাতিকে জাগিয়ে তোলার বলিষ্ঠ আহ্বান। জন্ম ও শিক্ষা: ইকবালের শিক্ষাজীবনের শুরু হয় প্রথাগত ইসলামি শিক্ষার মাধ্যমে, তবে মেধার স্বাক্ষর রেখে তিনি আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায়ও সমান পারদর্শী হয়ে ওঠেন। লাহোরের সরকারি কলেজে পড়াশোনা শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপ পাড়ি দেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন ও অর্থনীতিতে ডিগ্রি এবং মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এই জ্ঞানের সমন্বয়ই পরবর্তীকালে তাঁর চিন্তাচেতনাকে ঋদ্ধ করেছিল। কোরআন-সুন্নাহর নির্যাস ও কাব্য: ইকবালের কাব্য কেবল নিছক কল্পনা নয়; বরং তা ছিল পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর গভীর নির্যাস। তিনি তাঁর দর্শনের রসদ সংগ্রহ করেছেন ওহীর আলো থেকে। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘বাং-ই-দারা’, ‘বাল-ই-জিব্রিল’ কিংবা ‘আসরার-ই-খুদি’র দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত শৈল্পিক পন্থায় কোরআনি হাকিকত ও হাদিসের মর্মবাণী প্রচার করেছেন। তাঁর কবিতায় মারেফত ও ইশকে রসূলের এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়। তিনি মনে করতেন, অন্তরে গভীর খোদাভীতি এবং নবীর প্রতি ভালোবাসা ছাড়া কোনো জাতির জাগরণ সম্ভব নয়। খুদি দর্শন ও আত্মপরিচয়: ইকবালের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো 'খুদি' বা আত্মপরিচয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যদি তার নিজের সত্তাকে চিনতে পারে এবং নিজের ভেতরের ঐশ্বরিক শক্তিকে জাগ্রত করে, তবে সে অসাধ্য সাধন করতে পারে। তাঁর মতে, খুদির উন্নয়নই হলো খোদাকে পাওয়ার মূল পথ। খুদি নিয়ে তাঁর সেই অমর পঙক্তিটি আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত: خودی کو کر بلند اتنا کہ ہر تقدیر سے پہلے خدا بندے سے خود پوچھے بتا تیری رضا کیا ہے (খুদি কো কর বুলন্দ ইতনা কে হর তকদীর সে পহেলে খোদা বন্দে সে খুদ পুছে বাতা তেরি রাজা কেয়া হ্যায়) অনুবাদ: নিজের খুদি বা ব্যক্তিত্বকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাও যেন ভাগ্য লিপি লেখার আগে খোদা স্বয়ং বান্দাকে জিজ্ঞেস করেন—বলো, তোমার ইচ্ছা কী? ভূখণ্ড ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন উম্মাহ: আল্লামা ইকবাল তাঁর চিন্তার পরিক্রমায় এক সময় আধুনিক ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদের অসারতা উপলব্ধি করেন। তিনি পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের ধারণা থেকে সরে এসে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বা প্যান-ইসলামিজমের প্রতি রুজু করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলমানরা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়; বরং কালিমা ও আদর্শের ভিত্তিতে তারা একটি অভিন্ন জাতি। জাতীয়তাবাদের মোহে বিভক্ত মুসলিমদের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছিলেন: ان تازہ خداؤں میں بڑا سب سے وطن ہے جو پیرہن اس کا ہے وہ مذہب کا کفن ہے (ইন তাজা খোদাউঁ মে বড়া সব সে ওয়াতান হে জু পাইরাহান উস্কা হে ওহ মাজহাব কা কাফান হে) অনুবাদ: এই যুগের নতুন উপাস্যদের মধ্যে ‘স্বদেশ’ বা ভূখণ্ডগত জাতীয়তাবাদই সবচেয়ে বড়; আর এর পোশাকটি হলো ধর্মের কাফন। অর্থাৎ, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ধর্ম ও উম্মাহর ঐক্যকে ধ্বংস করে দেয়। মহাপ্রয়াণ ও চিরস্থায়ী প্রভাব: ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল লাহোরে এই জ্ঞানতাপস শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। লাহোরের বিখ্যাত শাহি মসজিদের প্রবেশদ্বারের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর সেই সাদামাটা অথচ গাম্ভীর্যপূর্ণ মাজার আজও হাজারো অনুরাগী ও জ্ঞানপিপাসুর জন্য এক তীর্থস্থান। আল্লামা ইকবালের 'খুদি'র দর্শন এবং ঐক্যের আহ্বান বর্তমানের অস্থির সময়ে আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে হীনম্মন্যতা ঝেড়ে ফেলে আত্মবিশ্বাসের সাথে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহান দার্শনিকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মাক্বামে আসীন করুন। আমিন। লেখক: আলেম, কথাশিল্পী ও চিন্তক জেডএম/ |