
|
মক্তব-মাদরাসাকে স্বকীয়তা বজায় রেখে চলতে দিন
প্রকাশ:
১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:৩৪ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
|| মুফতি আরশাদ রহমানী || একটি শৃঙ্খল জাতি ও রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো সুনাগরিক। ইসলামি শিক্ষা মানুষকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অনন্য মাধ্যম। বিশ্ব মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ওপর ইলমে দীনের যে নূর নাজিল করেছেন, আসহাবে রাসুলের মাধ্যমে উক্ত নূর পুরো বিশ্ববাসীর মাঝে বণ্টন করেছেন স্বয়ং তিনি। এই নূরের আলোকেই বিশ্ব মানবতা পেয়েছে স্থায়ী মুক্তি ও শান্তির প্রকৃত সন্ধান। এর অনুশীলন ও চর্চার মাধ্যমে মানুষ মনুষ্যত্বের গুণে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে শিখেছে। সত্যবাদী, সৎ ও সুনাগরিক হতে শিখেছে। দুনিয়া-আখেরাতে সাফল্যের ও মুক্তির সন্ধান পেয়েছে। এই মহান নিয়ামতের রক্ষণাবেক্ষণ আল্লাহ তা’আলা নিজ দায়িত্বে রেখেছেন। কিয়ামত অবধি এই নিয়ামত মানুষ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই নিয়ামত রক্ষার যে পদ্ধতি সুফফা শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে করে দিয়েছেন, আজ অবধি তা প্রকৃত পদ্ধতিতে দেওবন্দি মাদরাসা রূপে সারা দুনিয়ায় প্রচলিত রয়েছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে এরূপ প্রতিষ্ঠানগুলো নিঃস্বার্থ খুলুসিয়্যাত ও তাকওয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। এ দেশে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকেই দেওবন্দি মাদরাসা হিসেবে চেনা হয়। দেওবন্দি মাদরাসাগুলোতে রাত-দিন আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসুল (সা.) কর্তৃক প্রচারিত সেই বাণী উচ্চারিত হয়। এক এক করে হাতে-কলমে ইলমে দ্বীনের যাবতীয় বিষয় শিক্ষা দেওয়া হয়। নীতি-নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনে অর্জনীয় ও বর্জনীয় সিফাতগুলোর বাস্তব প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই শিক্ষার একটি মৌলিক দিক তথা আদর্শ নাগরিক গঠনে এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাত-দিন যে মেহনত করে যাচ্ছে তার ন্যূনতম অন্য কোথাও নেই। এ কারণে এসব মাদরাসা সমাজের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক। তাদের বিশ্বাস, মাদরাসা শিক্ষার্থীরা আদর্শ সমাজ ও আদর্শ জাতি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। ইতিহাস এবং বাস্তবতা এর স্পষ্ট সাক্ষী। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে রক্তস্নাত আজাদি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। শাহ অলিউল্লাহ (রহ.)-এর চিন্তাধারায় শাহ আব্দুল আজিজ (রহ.)-এর হাতে সূচিত হয় ঐতিহাসিক আজাদি আন্দোলন। কিছুদিন পর দারুল উলূম দেওবন্দের কৃতী সন্তান শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান (রহ.) ও হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) প্রমুখের হাতেই স্বাধীনতার পূর্ণতা লাভ হয়। আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের রক্তস্নাত আন্দোলনের ফসল পাকিস্তানের সোপান বয়েই আজকের স্বাধীন-সার্বভৌম দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশ। ড. ইকবাল (রহ.) বলেন, ان مکتبوں اور مدرسوں کو اسی حالت میں رہنے دو، غریب مسلمانوں کے بچوں کو انہیں مدر سوں میں پڑھنے دو۔اگر یہ ملا درویش نہ رہے تو جانتے ہو کیا ہوگا؟ جو کچھ ہو گا میں اپنی آنکھوں سے دیکھ آیا ہوں۔ اگر ہندوستانی مسلمان ان مدرسوں کے اثر سے محروم ہو گئے تو بالکل اسی طرح ہو گا جس طرح اندلس(اسپین) میں مسلمانوں کی۸ سو برس کی حکو مت کے با وجود آج غرناطہ اور قرطبہ کے کھنڈرات اور الحمراء کے نشانات کے سوا اسلام کے پیروؤں اور اسلامی تہذیب کے آثار کا کوئی نقش نہیں ملتا۔ہندوستان میں بھی آگرہ کے تاج محل اور دہلی کے لال قلعہ وغیرہ کے سوا مسلمانوں کی۸سو سا لہ حکو مت اور ان کی تہذیب کا کوئی نشان نہیں ملے گا۔ ‘এই মক্তব-মাদরাসাগুলোকে তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দাও। গরিব মুসলমানদের ছেলেরা এগুলোতে পড়ছে, পড়তে দাও। এই মোল্লা ও দরবেশরা যদি না থাকে তবে কী হবে, জানো? যা হবে তা আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছি। ভারতবর্ষের মুসলিমরা যদি এই মুক্ত মাদরাসাগুলোর প্রভাব থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে, ফলাফল ঠিক তা-ই হবে, যা হয়েছিল স্পেনে। সুদীর্ঘ ৮০০ বছরের মুসলিম শাসন সত্ত্বেও আজ কর্ডোভায় ধ্বংসাবশেষ এবং আলহামরার নিদর্শণ ছাড়া ইসলামের অনুসারীদের ও ইসলামি সভ্যতার অন্য কোনো নিদর্শন অবশিষ্ট নেই। মক্তব-মাদরাসাগুলো না থাকলে ভারতবর্ষেও আগ্রার তাজমহল এবং দিল্লির লালকেল্লা ছাড়া ৮০০ বছরের মুসলিম শাসন ও মুসলিম সভ্যতার কোনো নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ আদর্শ নাগরিক গড়ার এই সফল প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে এবং হচ্ছে। আমাদের কথা হলো, যেভাবেই হোক এই মাদরাসাগুলোকে স্বকীয় নীতি-আদর্শের ওপর টিকিয়ে রাখতে হবে। বাহ্যিক শুভ-অশুভ যাবতীয় প্রভাব থেকে কওমি মাদরাসাগুলোকে নিরাপদ রাখতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মূল নিয়ামক তাকওয়া, ইখলাস, লিল্লাহিয়াত ও ত্যাগ-তিতিক্ষার নীতিতে অবিচল থেকে উলামায়ে কেরামকেই উম্মাহকে সাথে নিয়ে যাবতীয় ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হবে। রাষ্ট্রের কর্তব্য হলো, এসব প্রতিষ্ঠানকে আপন গতি ও নীতি-আদর্শের ওপর চলতে দেওয়া। এর স্বকীয়তা রক্ষায় সহযোগিতা করা। কেউ যেন পার্থিব কোনো উদ্দেশে এসব প্রতিষ্ঠানকে নিশানা বানাতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। আল্লাহ তায়ালা তাওফিক দান করুন। আমিন। লেখক: মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস, মারকাজুল ফিকরিল ইসলামি বসুন্ধরা, ঢাকা আইও/ |