
|
‘প্রশিক্ষণে হাজিদের অনীহা, এতে পদে পদে বিপদে পড়েন তারা’
প্রকাশ:
১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৩৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
শুরু হচ্ছে হজের মৌসুম। এক দুদিনের মধ্যে সৌদি আরবের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবেন বাংলাদেশি হাজিরা। চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এবার আগেভাগে প্রস্তুতি সম্পন্ন করায় হজযাত্রা নির্বিঘ্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে হজের সফর বরাবরই একটি কষ্টের ও কঠিন সফর। এই সফরের জন্য প্রশিক্ষণ একটি জরুরি বিষয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশি হজযাত্রীদের একটি বড় অংশের হজের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে অনীহা রয়েছে। এজন্য তাদের সৌদি আরবে গিয়ে পদে পদে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। হজযাত্রার প্রস্তুতির নানা বিষয়ে আওয়ার ইসলামের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন আল ওয়াসি ট্রাভেলস অ্যান্ড হজ গ্রুপের স্বত্বাধিকারী মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আওয়ার ইসলামের সহ-সম্পাদক ইমরান ওবাইদ। আওয়ার ইসলাম: আগামীকাল থেকে হজের ফ্লাইট শুরু হচ্ছে। এই শেষ সময়ে প্রস্তুতি কেমন? মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান: আলহামদুলিল্লাহ, হজের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। হোটেল এগ্রিমেন্ট নিয়ে সামান্য জটিলতা ছিল। তবে তা সমাধানের পথে। ফ্লাইট শুরুর আগেই সমস্ত কাজ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আওয়ার ইসলাম: এ বছর হজযাত্রীরা কতটা নির্বিঘ্নে হজ পালন করতে পারবেন বলে আপনি মনে করছেন? মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান: আমরা আশাবাদী সবকিছু ভালোভাবে সম্পন্ন হবে। তবে মিনা এবং আরাফায় তাঁবু ব্যবস্থা নিয়ে কিছুটা সমস্যা হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। সৌদি সরকার এ বছর তাঁবু বণ্টনের যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, তা এজেন্সি এবং হাজিদের জন্য অনেক কষ্টকর। আওয়ার ইসলাম: মিনা, আরাফায় তাঁবু বণ্টনের কী পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং তাতে কী কী সমস্যা হতে পারে বলে আপনি মনে করছেন? মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান: এ-বছর একটি এজেন্সির তাঁবু চার-পাঁচ ব্লকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে এজেন্সির পক্ষে একই সময় কয়েক জায়গায় ছড়িয়ে থাকা হাজিদের খাবার সরবরাহ করা, মিনা, আরাফা এবং মুজদালিফায় স্থানান্তরের সময় মনিটরিং করা বেশ কঠিন হবে। আওয়ার ইসলাম: ওই সমস্যা মোকাবেলায় আপনারা কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন? মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান: পরিস্থিতি সামাল দিতে অধিকাংশ এজেন্সি গাইডের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরবে দীর্ঘদিন বসবাসরত অভিজ্ঞ বাংলাদেশিদের গাইড হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। যাতে সেবা নিশ্চিত করা যায়। এতে এজেন্সির খরচ বাড়লেও হাজিদের সুবিধার্থে এটি করা হচ্ছে। আওয়ার ইসলাম: হজযাত্রীদের জন্য মাসয়ালা-মাসায়েল জানা ও হজের প্রশিক্ষণ নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ? মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান: হ্যাঁ, মাসয়ালা-মাসায়েল জানা ও প্রশিক্ষণ নেওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেকেই হজের প্রধান দোয়া ‘তালবিয়া’-ই ঠিকমতো বলতে পারেন না। এর প্রধান কারণ হলো—প্রশিক্ষণে হাজিদের অনীহা। তারা মনে করেন প্রশিক্ষণে কেবল সাধারণ কিছু কথা বলা হয়, তাই তারা আসতে চান না। ফলে সৌদিতে গিয়ে পদে পদে বিপদে পড়েন। আওয়ার ইসলাম: প্রশিক্ষণ না নেওয়ার ফলে হাজিরা সাধারণত কী সমস্যার সম্মুখীন হন? মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান: প্রথমত, তারা বিমানে কী নেওয়া যাবে আর কী নেওয়া যাবে না—তা জানেন না। ফলে বিমানবন্দরে গিয়ে ব্যাগ তল্লাশিতে পান, জর্দা, গুল বা সিগারেট পাওয়া যায়, যা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। দ্বিতীয়ত, ওষুধ নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা নিয়ম মানেন না। প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিপুল পরিমাণ ওষুধ নেওয়ায় সেগুলো বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয়। পরে সৌদি আরবে গিয়ে ১০-১৫ গুণ বেশি দামে ওষুধ কিনতে হয় তাদের। আওয়ার ইসলাম: হাজিদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী থাকবে? মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান: প্রথমত, প্রত্যেক হাজির উচিত তাদের এজেন্সির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণগুলোতে অবশ্যই অংশ নেওয়া। এছাড়া নিজ এলাকার ইমাম বা খতিবদের কাছ থেকে হজের প্রাথমিক নিয়মগুলো আগেভাগেই জেনে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, অনেকেই গাইডদের কাজ সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। তারা মনে করেন গাইড তাদের সকল কাজ করে দেবেন। আসলে গাইডের কাজ হলো, দিকনির্দেশনা দেওয়া। কিন্তু তারা নিয়ম না জানার কারণে শেষ মুহূর্তে এমন সমস্যার সম্মুখীন হন, যা তাৎক্ষণিকভাবে মেটানো সম্ভব নয়। ফলে অনেক সময় অনেকের হজ আদায় করাই সম্ভব হয় না। আওয়ার ইসলাম: আপনাদের এজেন্সির মাধ্যমে যারা হজে যাচ্ছেন, তাদের প্রশিক্ষণ কেমন হয়েছে বা সার্বিক প্রস্তুতি কেমন? মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান: আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের আল ওয়াসি ট্রাভেলস অ্যান্ড হজ গ্রুপের সাথে যারা হজ আদায়ের নিয়ত করেছে, তাদের এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ দিন প্রশিক্ষণ হয়ে গেছে। সর্বশেষ প্রশিক্ষণ ২৫ এপ্রিল হবে। আশা করি আমরা নির্বিঘ্নে হজ সম্পন্ন করতে পারব। এখনকার সময়ে হাজি সাহেবদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘নুসুক কার্ড’। এই কার্ড সৌদি আরব গিয়ে হাজি সাহেবদের পেতে অনেক কষ্ট হয়। তাই এ বছর আমরা এই নুসুক কার্ডটি বাংলাদেশেই হাজিদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য সৌদি আরবের ‘রাওয়াফ মিনা’র ভাইস চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলেছি। আমরা আমাদের এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে হাজি সাহেবদের কাছে নুসুক কার্ড পৌঁছে দেব। এ-বছর এটা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি যে, সৌদি আরবের কাজ আমরা বাংলাদেশেই সম্পন্ন করতে পারছি। ফলে এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে কোথাও কোনো পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হবে না। সবকিছু অনলাইন করা থাকবে। এবং এটিই আমাদের সার্ভিসের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। আওয়ার ইসলাম: এই শেষ সময়ে হাজি সাহেবদের কী কী করণীয় আছে বলে আপনি মনে করেন? মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান: শেষ মুহূর্তে হাজিদের প্রথম কাজ হলো শারীরিক চেকআপ করিয়ে নেওয়া। কোনো অসুস্থতা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শে প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, এজেন্সির সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখা। সফরের জন্য তার কী কী প্রয়োজন, এজেন্সি তাকে বলে দেবে। এবং আনুমানিক খরচ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা উচিত। যাতে সেখানে গিয়ে ঋণ করতে না হয়। তৃতীয়ত, প্রয়োজনীয় মালপত্রের একটি তালিকা করে সেগুলো ব্যাগে ঠিকঠাক নিয়েছে কি না তা মিলিয়ে নেওয়া। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের সুস্থতার দিকে খেয়াল রাখা এবং আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা। আল্লাহ যেন তাকে মেহমান হিসেবে কবুল করেন এবং ‘হজ্জে মাবরুর’ নসিব করেন। এবং সফরের আগে দেশের ভেতরে অপ্রয়োজনীয় ছোটাছুটি থেকে নিজেকে বিরত রাখা উচিত। আওয়ার ইসলাম: হজ ট্রাভেলসের মালিক এবং মোয়াল্লেমদের জন্য এই সময়ে কী করণীয় আছে? মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান: এজেন্সির মালিক বা গাইডের দায়িত্ব হলো হাজি সাহেবকে সফরের আগেই সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়া। হোটেলগুলোর কী অবস্থা, হোটেল থেকে হারামের দূরত্ব কতটুকু, যাতায়াতে কেমন কষ্ট হতে পারে—এসব বিষয়ে হাজিদের আগেভাগেই মানসিকভাবে প্রস্তুত করা উচিত। খাবার-দাবার বা অন্যান্য সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে হাজিদের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করা উচিত, কোনো কিছু গোপন না রাখা। তাহলে, পরবর্তীতে সমস্যা হবে না। এবং প্রতিটি এজেন্সির উচিত অভিজ্ঞ এবং যোগ্য গাইড নির্বাচন করা। দায়সারাভাবে কাউকে গাইড হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশে প্রায় ৮০% এজেন্সিই ভালো এবং তারা নিয়ম মেনেই কাজ করে থাকেন। আশা করি সবাই নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করবেন। আইও/ |