
|
দেওবন্দে আল্লামা কাশ্মীরি সেমিনারে অংশগ্রহণ, টুকরো কিছু স্মৃতি
প্রকাশ:
১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ০৯:২২ সকাল
নিউজ ডেস্ক |
|| মাওলানা মাহফুয আহমদ || গেল ডিসেম্বরে দারুল উলুম ওয়াকফ দেওবন্দের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হুজ্জাতুল ইসলাম একাডেমির ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হলো একটি ঐতিহাসিক সেমিনার। ‘আল্লামা মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি: জীবন, কর্ম ও অবদান’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী সেই সেমিনারটি দলমত নির্বিশেষে সব ঘরানার আলেম ও শিক্ষাবিদদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। হুজ্জাতুল ইসলাম একাডেমির সম্মানিত ডাইরেক্টর, মুহতারাম মাওলানা ড. মুহাম্মাদ শাকিব কাসেমী সাহেব হাফিযাহুল্লাহ অনুগ্রহ করে আমাকেও একজন প্রাবন্ধিক হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাঁর আন্তরিক দাওয়াত এবং যাবতীয় অফিসিয়াল প্রসেসিংয়ে মহব্বতপূর্ণ সহযোগিতা আমাকে সেমিনারে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। বস্তুত, এমন একটি ঐতিহাসিক সেমিনারে অংশগ্রহণ আমার জন্য সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয় ছিল। এখানে প্রথমেই কয়েকটি টুকরো স্মৃতি উল্লেখ করতে চাই। এক. হজরত মাওলানা সায়্যিদ আহমদ খিজির শাহ সাহেব হাফিযাহুল্লাহ হলেন আল্লামা মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহর সুযোগ্য নাতি এবং দারুল উলূম ওয়াকফ দেওবন্দের স্বনামধন্য শায়খুল হাদীস। হযরতের সঙ্গে আমার পরিচয় ‘আল-ফাওয়াইদুল মুনতাকাহ’ (প্রথম প্রকাশ: ২০১৯) গ্রন্থ থেকেই। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সময়ে হযরতের স্নেহধন্য হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ২০২৩ সালে দেওবন্দের ইলমি রিহলার সময় হযরত অধমকে তাঁর বুখারির দরসে তালিবুল ইলম সাথীদের সামনে বসিয়ে কথা বলতে নির্দেশ দিয়ে নিজের মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছিলেন—যে সম্মানের আমি কোনোভাবেই যোগ্য ছিলাম না। যাই হোক, এবার আল্লামা কাশ্মীরি সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে যখন ইন্ডিয়ায় পৌঁছাই, দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে দেখি—হযরতের একান্ত খাদেম হযরতের নিজস্ব প্রাইভেট কার নিয়ে হাজির। আরও বড় কথা হলো, গতবার আমি ওয়াকফ দেওবন্দের বিশেষ মেহমানখানায় অবস্থান করেছিলাম; কিন্তু এবার সরাসরি হযরতের দৌলতখানায় মেহমান হয়ে গেলাম। হযরত বললেন, “সেমিনারে শতশত মেহমান এসেছেন। ভাবলাম, এত দূর সফর করে আপনি এসেছেন; এখন যদি মেহমানদের ভিড়ে থাকেন, তাহলে যথাযথ বিশ্রাম নাও হতে পারে। তাই আপনি যতদিন দেওবন্দে থাকবেন, আমার ঘরেই অবস্থান করবেন। সেমিনারে মেহমানদের সঙ্গে শুধু দুপুরের খাবারে শরিক হবো; তবে সকালের নাশতা এবং রাতের খাবারের দাওয়াত আমার ঘরেই।” সুবহানাল্লাহ! হযরতের এমন আদর-আপ্যায়নে সত্যিই অভিভূত হলাম। প্রথম দিন ফজরের সময় হযরত জিজ্ঞেস করলেন, “ওজুর জন্য বাথরুমে গরম পানি ঠিকঠাক ছিল তো? কোনো পেরেশানি হয়নি তো?” দেওবন্দে আমি যে তিন দিন ছিলাম, প্রতিদিন সকালে হযরতের সঙ্গে বসে নাশতা করেছি। তিনি নিজ হাতে বিভিন্ন আইটেম আমার প্লেটে তুলে দিচ্ছিলেন। ফেরার দিন হযরত আমার হাতে একটি ব্যাগ ধরিয়ে দিলেন। বললেন, “এই ব্যাগে সামান্য কিছু হাদিয়া আছে—আমার আহলিয়ার পক্ষ থেকে আপনার আহলিয়ার জন্য এক জোড়া কাপড়, আর আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য এই খাস মিষ্টি হাদিয়া।” হযরতের বাসভবনে অবস্থান করব—আগে থেকে জানা ছিল না। ফলে ঘরের জন্য কোনো উপঢৌকন কেনা হয়নি। কিছুটা লজ্জিত হলাম। হযরতের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন বের হচ্ছি, সালাম ও মুসাফাহা করতে করতে হযরতের হাতে সামান্য কয়েক হাজার রুপি হাদিয়া হিসেবে দিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু হযরত দৃঢ়ভাবে নিষেধ করলেন। আমি পীড়াপীড়ি করলে তিনি স্পষ্ট করে বললেন, “দেখুন মাওলানা! আমাদের নীতি হলো—মেহমান থেকে কখনো হাদিয়া নিই না।” এরপর আর জোর করতে পারিনি। দুই. সেমিনারের প্রথম দিন বাদ মাগরিবের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে অধমের প্রবন্ধের সারনির্যাস কয়েক মিনিটের আরবি বক্তব্যে উপস্থাপন করি। অধিবেশন শেষে দারুল উলূম ওয়াকফ দেওবন্দের সম্মানিত মুহতামিম, হযরত মাওলানা সুফিয়ান কাসিমী সাহেব হাফিযাহুল্লাহ অধমকে মোবারকবাদ জানিয়ে বললেন, “আপনার আরবি বক্তব্য খুব মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। আল্লাহ তায়ালা আপনার ইলম ও আমলে ভরপুর বারাকাত নসিব করুন।” অন্যদিকে, ওই রাতেই আমার মোবাইলে একটি মেসেজ এলো। কে পাঠিয়েছেন? আমাদের শায়খ—শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ সালীম দহুরাত সাহেব হাফিযাহুল্লাহ (লেস্টার, ইউকে)। হয়তো কেউ তাঁর কাছে আমার সংক্ষিপ্ত আরবি বক্তব্যের অডিও/ভিডিও পাঠিয়ে দিয়েছিল। হযরত এই বান্দার জন্য উৎসাহমূলক বাক্য লিখলেন এবং অনেক দোয়া করলেন। ছোটদের সামান্য কাজের ওপর বড়দের এমন প্রেরণা জোগানো সত্যিই তাঁদের মহানুভবতার পরিচয়। তিন. সেমিনারের দ্বিতীয় দিন বাদ যোহর আবার সাক্ষাৎ হলো বিদগ্ধ গবেষক আলেম, হযরত মাওলানা নুরুল হাসান রাশিদ কান্ধলবী সাহেব হাফিযাহুল্লাহর সঙ্গে। হযরত এবারও বুকে টেনে নিয়ে বললেন, “মাওলানা! গতরাত আপনি যে কিতাব (দারসুল বুখারি লি সালাফিনাল আকাবির) দিয়েছিলেন, ঘরে পৌঁছে রাতেই সেটার সিংহভাগ পড়ে শেষ করেছি। আল্লাহ তায়ালা আপনার খেদমতগুলো কবুল করুন। আজ আমিও আপনার জন্য সদ্য প্রকাশিত আমার কয়েকটি রিসালা হাদিয়া এনেছি।” হযরতের এমন আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা সত্যিই অনুপ্রেরণা জাগিয়েছে। চার. সেমিনারের দুই দিন শেষে আরও এক দিন দেওবন্দে অবস্থানের সুযোগ হলো। দারুল উলূম দেওবন্দের সম্মানিত মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা নিয়ামুল্লাহ আযমী সাহেব, মুফতী আবদুল্লাহ মারুফী সাহেব, ‘আদ-দাঈ’ সম্পাদক মাওলানা আরিফ জামিল মোবারকপুরী সাহেবসহ একাধিক আহলে ইলমের সান্নিধ্যে কিছু সময় যাপন করার সৌভাগ্য হলো। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ঝুলি আরও সমৃদ্ধ হলো। পাঁচ. এই পুরো সেমিনারের মূল আয়োজক, হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ শাকিব কাসেমী সাহেব হাফিযাহুল্লাহর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ হলো শেষ দিন দুপুরে। হযরত বললেন, “অনুষ্ঠিতব্য ইমাম কাসিম নানুতবী রাহিমাহুল্লাহ সেমিনারের জন্য অগ্রিম দাওয়াত দিয়ে রাখছি। আপনার সরব উপস্থিতির অপেক্ষায় থাকব। আর আজ রাতে দিল্লিতে আপনার জন্য হোটেল বুকিং করে রেখেছি; বিকেলে আমাদের একজন ভাই আপনাকে দেওবন্দ থেকে দিল্লির হোটেলে পৌঁছে দেবেন। আগামীকাল ভোরে আপনার ফ্লাইট; সেজন্য রাতেই দিল্লি পৌঁছানো মুনাসিব হবে।” এরপর হযরত মাওলানা কিতাবভর্তি একটি ল্যাগেজ হাদিয়া দিয়ে বললেন, “এগুলো আমাদের হুজ্জাতুল ইসলাম একাডেমি থেকে সদ্য প্রকাশিত কিছু গ্রন্থ। নতুন ল্যাগেজসহ এগুলো সকল মেহমানের জন্য হাদিয়া হিসেবে দেওয়া হয়েছে।” সুবহানাল্লাহ! হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ শাকিব কাসেমী সাহেব হাফিযাহুল্লাহর ব্যবস্থাপনা, আয়োজন ও পরিকল্পনা দেখে সত্যিই অভিভূত হলাম। সেমিনারের দুই দিনে শত শত মেহমানের মেহমানদারি—তবু কোনো শোরগোল নেই, ঝক্কি-ঝামেলার লেশমাত্র নেই। তাছাড়া পুরো ইন্ডিয়ার প্রায় সব ঘরানার আলেমদের একই মঞ্চে সমবেত করাও চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু মাশাআল্লাহ! তিনি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সবকিছু আঞ্জাম দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে উত্তম বিনিময় দান করুন। এই সফর শুধু একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ ছিল না; বরং এটি ছিল ইলম, আদব ও মহব্বতের এক অনন্য শিক্ষা। লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী দাঈ, লেখক ও স্কলার জেডএম/ |