
|
যুদ্ধবিরতি: স্বাগত জানাচ্ছে বিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার তাগাদা
প্রকাশ:
০৮ এপ্রিল, ২০২৬, ০৫:৪৭ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
দুই সপ্তাহের এ-বিরতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যেন পুরোপুরি মেনে চলে সে আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব। পাশাপাশি অনেক দেশই বিবদমান দুই পক্ষকে রাজি করানোর সফলতায় প্রশংসা করছে পাকিস্থানের। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে এবং শুক্রবার (১০ এপ্রিল ২০২৬) পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শুরু করতে যাচ্ছে চূড়ান্ত শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা। ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সন্ধ্যার দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, এ-যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। দুই পক্ষের সমঝোতার ফলে ইরান হরমুজ প্রণালিও পুরোপুরি খুলে দেবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সঙ্কীর্ণ এ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল গন্তব্যে যায়। ট্রাম্পের টুইট ও ইরানের সংঘাত বন্ধের ঘোষণার পর, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অনেক অঞ্চলের দেশ যুদ্ধবিরতিকে দু-হাত খুলে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের অনেকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে। ইরাক ইরানের প্রতিবেশী এ দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুদ্ধবিরতির খবরে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছে, একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়কেই এ যুদ্ধবিরতি সমঝোতা পুরোপুরি মেনে চলার আহ্বান। সঙ্কট নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন এবং সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়ায় সমর্থন ব্যক্ত করে মন্ত্রণালয়টি যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি মেনে চলার এবং উত্তেজনা থেকে বিরত থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এ-যু্দ্ধে ইরাকও একভাবে ঢুকে পড়েছিল। দেশটিতে তেহরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মার্কিন বাহিনী একে অপরের ওপর দফায় দফায় হামলাও চালিয়েছে। মিশর মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুদ্ধবিরতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, একে অবশ্যই আলোচনা, কূটনীতি ও গঠনমূলক সংলাপের জায়গা করে দিতে কাজে লাগানো দরকার। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে ‘পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে’ মিশরও তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে জানিয়ে তারা বলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় ‘উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগকেও’ অবশ্যই রাখতে হবে। ইসরায়েল ইরানে হামলা স্থগিত রাখার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পক্ষে এক্সে দেওয়া পোস্টে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরান যেন আর যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরানের সব আরব প্রতিবেশী ও বিশ্বের জন্য পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র বা সন্ত্রাসী হুমকি না হয়ে ওঠে তা নিশ্চিতে মার্কিন প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন রয়েছে। তিনি জানান, এ যুদ্ধবিরতিতে ‘লেবানন অন্তর্ভুক্ত থাকবে না’। প্রতিবেশী এ দেশটিতে ইসরায়েলি বাহিনী স্থল অভিযান চালাচ্ছে, কোথাও কোথাও ইরানঘনিষ্ঠ হিজবুল্লাহ’র সঙ্গে তাদের তুমুল লড়াইও চলছে। ওমান ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে স্বাগত এবং ‘পাকিস্তান ও যুদ্ধ বন্ধের ডাক দেওয়া সব দেশের প্রচেষ্টাকে’ সাধুবাদ জানাচ্ছে। ওমান বলেছে, ‘এখন সঙ্কটের মূল কারণ দূর করে সমাধানে পৌঁছাতে এবং এই অঞ্চল থেকে যুদ্ধ ও বৈরিতার স্থায়ী অবসান ঘটাতে সমাধান খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা জোরদারের গুরুত্ব তুলে ধরছি আমরা,’।
জাতিসংঘ বৈশ্বিক এ সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে চলতে আহ্বান জানিয়েছেন, যেন ওই অঞ্চলে ‘স্থায়ী ও সর্বাত্মক শান্তির পথ প্রশস্ত হয়। যুদ্ধবিরতি অর্জনে চেষ্টা করা পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে গুতেরেস বলেছেন, বেসামরিক জনগণের প্রাণ বাঁচাতে এবং মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সংঘাত থামানো জরুরিভিত্তিতে দরকার। জাপান জাপানের মুখ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির খবরকে ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে টোকিও। তারা এখন ‘চূড়ান্ত চুক্তির’ অপেক্ষায় রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে বৈরিতা কমিয়ে আনা এখনও জাপানের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার, মিনোরু এমনটাই বলেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা কিয়োডো। ইন্দোনেশিয়া জাকার্তা যুদ্ধবিরতির সমঝোতাকে স্বাগত জানাচ্ছে এবং ‘একে অপরের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও কূটনীতির’ প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভোন মেওয়েংকাং এ কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। তিনি মার্চের শেষদিকে হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনীর লড়াই চলাকালে বিস্ফোরণে নিহত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর তিন ইন্দোনেশীয় সদস্যের মৃত্যু নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তেরও আহ্বান জানিয়েছেন।
মালয়েশিয়া মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমিয়ে আনা ও বহুল-আকাঙ্ক্ষিত শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরানোর ক্ষেত্রে এই যুদ্ধবিরতি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। তারা সব পক্ষের প্রতি ‘সদিচ্ছার সঙ্গে’ যুদ্ধবিরতির সব শর্ত মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে, যেন পুনরায় সংঘাত এড়ানো যায়। কোনো উসকানিমূলক কার্যক্রম বা একতরফা ব্যবস্থা—যা অঞ্চলটির ভঙ্গুর স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে কিংবা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে ওলট-পালক করে দিকে পারে, এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতেও সব পক্ষকে অনুরোধে করেছে মালয়েশিয়া। অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ও পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী পেনি ওং এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির খবরকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং এই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথে নিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ‘’হরমুজ প্রণালি ইরান কার্যত বন্ধ করে রাখায়, পাশাপাশি বাণিজ্যিক নৌযান, বেসামরিক স্থাপনা, তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রে তাদের হামলা জ্বালানি সরবরাহে নজিরবিহীন সঙ্কট সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব পড়েছে তেল ও জ্বালানির দামে। ‘আমরা স্পষ্টভাষায় বলে আসছিলাম—যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব এবং মানবিক ক্ষতিও তত বাড়বে,’ বলেছেন তারা।
নিউজিল্যান্ড নিউ জিল্যান্ডের পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও ‘এখনও অনেক কিছু করা বাকি’ বলে সতর্ক করেছেন। “এটি আশাব্যঞ্জক খবর বটে, তবে টেকসই যুদ্ধবিরতি নিশ্চিতে আসছে দিনগুলোতে করতে হবে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি কাজ বাকি রয়েছে। কেননা এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্য এবং তার বাইরেও ব্যাপক প্রভাব ও বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে,” বলেছেন পিটার্স। জার্মানি জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস যুদ্ধবিরতির খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখায় পাকিস্তানকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনাই আসছে দিনগুলোতে লক্ষ্য হওয়া উচিত, বলেছেন তিনি। ইউক্রেইন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি মুক্ত হওয়ার খবরকে স্বাগত জানিয়ে ইউক্রেইন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা তার দেশে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের এমন ‘দৃঢ়তা’ দেখতে চেয়েছেন। “যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ়তা কাজে দিয়েছে। মস্কোকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করতে ও ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে যদ্ধ থামাতে যথার্থ দৃঢ়তার এখনই সময় বলে আমরা মনে করি,” এক্সে এমনটাই লিখেছেন সিবিহা।
সৌদি আরব যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে ‘স্বাগত’ জানিয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের ওপর হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে এবং বলেছে, হরমুজ প্রণালি মুক্ত থাকা উচিত। “যুদ্ধবিরতি একটি বিস্তৃত ও টেকসই শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে নিয়ে যাবে বলে সৌদি আরব আশাবাদী,” বিবৃতিতে বলেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশটির প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত সে যুদ্ধ ছাপিয়ে যেতে পেরেছে, যেটি এড়াতে তারা আন্তরিকভাবে চেয়েছিল। “এক মহাকাব্যিক জাতীয় প্রতিরক্ষার মাধ্যমে আমরা এই সময়টি পার হতে পেরেছি, যা সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করেছে এবং বিশ্বাসঘাতক আগ্রাসনের মুখেও আমাদের অর্জনগুলিকে সুরক্ষিত রেখেছে,” এক্সে দেওয়া পোস্টে এমনটাই বলেছেন তিনি।
“আজ আমরা আরও বেশি প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা, তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি ও ভবিষ্যৎ গঠনে আরও দৃঢ় সামর্থ্য নিয়ে জটিল এক আঞ্চলিক বাস্তবতা মোকাবেলায় এগিয়ে যাচ্ছি,” আমিরাতের ‘নবজাগরণের মডেল’ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন গারগাশ। তুরস্ক ইরান যুদ্ধে দুই সপ্তাহের বিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বুধবার তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা ইসলামাবাদে হতে যাওয়া ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনায় সহযোগিতা করবে। যুদ্ধের ময়দানে বিরতি যেন পুরোপুরি কার্যকর হয় এবং সব পক্ষই যেন যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে চলে সে বিষয়েও জোরাল আহ্বান জানিয়েছে তারা। ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে ভারত সংঘাত থামাতে উত্তেজনা প্রশমন, সংলাপ ও কূটনীতি যে অপরিহার্য তা মনে করিয়ে দিয়েছে। “এই সংঘাত এরই মধ্যে লোকজনের ব্যাপক দুর্ভোগের কারণ হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবাহ বহাল থাকবে বলেই আমরা আশা করছি,” বিবৃতিতে বলেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জেডএম/ |